আলাদা বাসেই কি নিরাপদ নারী, নাকি বদলাতে হবে মানসিকতা

নারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পিংক বাস সার্ভিস চালু করেছে সরকারছবি: তানভীর আহাম্মেদ

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম আলোচনার বিষয় পিংক বাস। এ নিয়ে পক্ষে–বিপক্ষে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। নারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ বাসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নারীদের সুবিধার্থে এমন ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

তবে এই বাসকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরছে—আমরা কি সত্যিই আধুনিক হয়ে উঠতে পেরেছি? আমরা নিজেদের আধুনিক বলি, প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে আধুনিকতার জায়গায় কতটা পৌঁছাতে পেরেছি?

এখনো অনেক ক্ষেত্রে আমরা নতুনকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। নতুনকে আহ্বান জানাতে পারি না। প্রগতিশীল চিন্তাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। ফলে একদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া, অন্যদিকে চিন্তাচেতনায় যেন মধ্যযুগীয় মানসিকতা। এই দ্বৈত অবস্থার মধ্যেই বসবাস করছি।

পিংক বাস নিয়ে অনেকের মন্তব্য, ‘তুমি মেয়ে, তুমি বাসে কেন? তোমাদের তো কর্মক্ষেত্র সংসার!’ কিন্তু নারী কেন বাস চালাতে পারবে না? কেন সে নিজের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো পেশা বেছে নিতে পারবে না? নারী-পুরুষ সমান। আমাদের সংবিধানও সেই সমতার কথাই বলে। একজন নারী তাঁর ইচ্ছা, যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার রাখেন। বেগম রোকেয়ার ভাবধারায় বলা যায়, একটি গাড়ি যেমন দুটি চাকার ওপর নির্ভর করে এগিয়ে চলে, তেমনি সমাজও নারী ও পুরুষ—এই দুই অংশের সমান অংশগ্রহণ ছাড়া এগিয়ে যেতে পারে না। সমাজের এক অংশকে মুক্ত রেখে অন্য অংশকে বদ্ধ রাখলে প্রকৃত উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। নারীকে মুক্ত আকাশে বিচরণের সুযোগ দিতে হবে। সেই মুক্ত আকাশকে নিরাপদ ও সুন্দর রাখার দায়িত্বও সবার।

আরও পড়ুন

আজ যে উদ্যোগকে ঘিরে এত উচ্ছ্বাস, এত আনন্দ, এত আশাবাদ—তা যেন সময়ের সঙ্গে বিবর্ণ ও ফিকে হয়ে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আরও একটি বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি—কোনোভাবেই যেন এই বাস নারীর নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়ে ওঠে। কোনো দিন যেন পত্রিকার পাতায় এমন খবর না ভেসে ওঠে যে পিংক বাসে চলাচলের সময় কোনো নারী দুর্বৃত্তের হাতে হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নিরাপত্তার জন্য যে উদ্যোগ, সেটিই যেন কখনো নারীর বিপদের কারণ না হয়।

নারী তখনই আরও এগিয়ে যেতে পারবে, যখন পুরুষ তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, সহযাত্রী হিসেবে দেখবে। নারীর এগিয়ে যাওয়া মানে পুরুষের পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং নারীর অগ্রযাত্রা মানেই সমাজের অগ্রযাত্রা। তাই পরিবর্তনটা আগে আনতে হবে আমাদের মানসিকতায়। চিন্তা, চেতনা ও জ্ঞানের পরিধি প্রসারিত করতে হবে।

পিংক বাস শুধু একটি বাস নয়; এটি আমাদের সমাজের মানসিকতারও একটি দর্পণ। আমরা এই আয়নায় বা দর্পণে নিজেদের কতটা আধুনিক, কতটা মানবিক এবং কতটা প্রগতিশীল হিসেবে দেখতে চাই—সিদ্ধান্তটা আমাদেরই।

শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়