কেন আজও মানুষ ছুটে যায় বিউটি বোর্ডিংয়ে
পুরান ঢাকার পুরোনো অলিগলির ভেতর দিয়ে হাঁটলে সময় যেন পিছিয়ে যায় অনেক বছর। রিকশার টুংটাং শব্দ, ইলিশ ভাজার গন্ধ আর ইটের পুরোনো বাড়ির ভিড়ে হঠাৎ চোখে পড়ে একটা হলুদ রঙের জীর্ণ দোতলা বাড়ি। কারুকাজ করা কাঠের জানালা, লম্বা বারান্দা। নীল রঙে মলিন হয়ে লেখা ‘বিউটি বোর্ডিং’। মনে হয় কোনো পুরোনো কবিতার বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে বাড়িটি। মহাদেব সাহা ঠিকই বলেছিলেন, ‘যেন পুরোনো দিনের কোনো গান, শ্রাবণের বৃষ্টিধারা যেন নির্জন একটি বাড়ি বিউটি বোর্ডিং’।
বাড়িটা শুধু ইট-কাঠ নয়। ভোজনরসিকদের জন্য এখানে আছে নানা রকম স্বাদের সমারোহ। বিউটি বোর্ডিংয়ে ঢুকলেই প্রথমে সুস্বাদু খাবারের সমারোহ দেখে মন ভরে যায়। এখানকার রান্না মানে পুরান ঢাকার আসল স্বাদ। সারা বছর এখানে পাওয়া যায় গরম গরম ভাতের সঙ্গে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী টাটকা শর্ষে ইলিশ, আলু ভর্তা, ডাল। বিকেলের আড্ডার বিশেষ খাবার গরম গরম শিঙাড়া আর চা। আরও রয়েছে মাটির হাঁড়ির টক দই। একটা সময় ছিল যখন সাহিত্যিকেরা এখানে আড্ডার ফাঁকে চায়ের কাপ হাতেই কবিতা লিখতেন।
ঢাকার সেই ঐতিহ্য আজও আছে। পেট ভরে খেয়ে দোতলায় ২০০-২৫০ টাকায় রাতও কাটানো যায়। খাবারের সঙ্গে মিশে আছে গ্রামবাংলার ঘরোয়া স্বাদ আর পুরান ঢাকার খানদানি রান্নার গন্ধ।
এ স্বাদের পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় শতবর্ষ পুরোনো ইতিহাস। একসময় বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। ১৯৪৭ সালের আগে এখানে ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার অফিস ছিল। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা এখানেই ছাপা হয়। পরে ১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা ১১ কাঠা জমির ওপর এ বাড়ি ভাড়া নিয়ে ‘বিউটি বোর্ডিং’ প্রতিষ্ঠা করেন। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে ‘বিউটি’র নামেই এর নামকরণ। চল্লিশের দশক থেকে এখানে আড্ডা বসাতেন বাংলা সাহিত্যের সব দিকপাল। কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা—এনাদের পায়ের ছাপ লেগে আছে এ বারান্দায়।
আজও এখানে সেই বিখ্যাত চেয়ার রাখা আছে, যে চেয়ারে বসে নাগরিক কবি শামসুর রাহমান কবিতা লিখতেন। সাহিত্যপ্রেমীরা দূরদূরান্ত থেকে আসেন শুধু চেয়ারটা একবার ছুঁয়ে দেখতে।
এখানে বসেই আবদুল জব্বার খান লিখেছিলেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’। সুরকার সমর দাস এখানে বসে সুর করেছেন। ১৯৫৭ সালে এখান থেকে প্রকাশিত হয় ‘কবিকণ্ঠ’, ১৯৫৯ সালে ‘স্বদেশ’।
তাজউদ্দীন আহমদও এসে বসেছেন এই চায়ের টেবিলে। কিন্তু এ আড্ডাই ছিল পাকিস্তানিদের চক্ষুশূল। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ তাদের হামলায় শহীদ হন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭–১৮ জন। পরে প্রহ্লাদ চন্দ্রের পরিবার ভারতে গমন করে।
আজ আর আগের মতো আড্ডা নেই। ঘরগুলো ফাঁকা। তবু দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে শুধু একবার ছুঁয়ে দেখতে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রীমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে আবার বিউটি বোর্ডিং চালু করেন। ১৯৯৮ সালে হয়েছে ‘আড্ডা পুনর্মিলনী’, ২০০০ সালে গঠিত হয়েছে ‘বিউটি বোর্ডিং সুধী সংসদ’। তাঁরাই আজও লোকসান দিয়ে হলেও ঐতিহ্যটা ধরে রেখেছেন। মুখর আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো খদ্দেরের ভিড় লেগেই থাকে।
এই ঐতিহ্যবাহী স্থানে আসার রাস্তা খুবই সহজ। গুলিস্তান বা সদরঘাট থেকে একটা রিকশা নিয়ে বাংলাবাজারে যাবেন। শ্রীশচন্দ্র লেনের মুখে নেমে যেকোনো দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হলুদ বাড়ি বিউটি বোর্ডিং।
বিউটি বোর্ডিং শুধু একটি হোটেল নয়। এটি আমাদের হারিয়ে যাওয়া আড্ডা, আমাদের প্রতিবাদ আর আমাদের স্বাদের স্মারক। ফুল ঝরে যাক, পাখি উড়ে যাক, তবু বিউটি বোর্ডিং বেঁচে থাকুক। বিউটি বোর্ডিং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত আঁতুড়ঘর। নতুন প্রজন্মের সদস্য হিসেবে আমাদের উচিত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বিউটি বোর্ডিংয়ের গল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখা।
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়