পাহাড়ি কন্যা খাগড়াছড়ির প্রবেশমুখে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে আলুটিলা পাহাড়। এই পাহাড়ের নাম বললেই চোখে ভেসে ওঠে এক পুরাতন ও রহস্যময় গুহার ছবি। প্রকৃতির নিজ হাতে তৈরি এই গুহা শুধু খাগড়াছড়ি নয়, পুরো বাংলাদেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এক রোমাঞ্চের নাম।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় অবস্থিত এই গুহা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচুতে এই পর্যটনকেন্দ্র অবস্থিত। যার মূল আকর্ষণ প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট পাথুরে গুহা। এটিকে রহস্যময় গুহাও বলা হয়। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এটি দেবতার বাসস্থান বা দেবতার গুহা নামেও পরিচিত।
আলুটিলা পাহাড়ের চূড়া থেকে চারপাশের আকাশ আর সবুজের সৌন্দর্য উপভোগ করার পর মূল রোমাঞ্চের খোঁজে পর্যটকদের নামতে হয় পাহাড়ের গভীরে। প্রায় ২৬৬টি সিমেন্টের সিঁড়ি ভেঙে নিচের দিকে নামতে নামতে চারপাশের গাছপালার ঘনত্ব বাড়তে থাকে এবং একসময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে গুহার প্রবেশমুখ। এটি মূলত একটি ভূগর্ভস্থ পাথুরে সুড়ঙ্গ। অনেকের মতে এটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮২ ফুট। গুহার ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। চারপাশ নিরেট ও নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা, উপরিভাগ এবং দেয়ালগুলো সব পাথর দিয়ে তৈরি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো গুহাটির ভেতর দিয়ে একটি শীতল পানির ঝরনা প্রবহমান।
গুহাটির তলদেশজুড়ে ছোট-বড় হাজারো পিচ্ছিল পাথর বিছানো, আর তার ওপর দিয়ে কোথাও গোড়ালি আবার কোথাও হাঁটুসমান ঠান্ডা জল বয়ে চলে। গুহার এক মাথা দিয়ে ঢুকে অন্য মাথা দিয়ে বের হতে সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ মিনিট; কিন্তু এই অল্প সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত আপনাকে উপহার দেবে আজীবন মনে রাখার মতো এক অনুভূতি। গুহায় প্রবেশের মূল শিহরণ শুরু হয় প্রবেশমুখ থেকেই। বর্তমান যুগে অনেকের হাতেই স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশলাইট বা অত্যাধুনিক টর্চ থাকে; কিন্তু মশালের জ্বলন্ত লালচে আলো, আগুনের উত্তাপ আর ধোঁয়া গুহার ভেতরের পরিবেশকে যে পরিমাণ রহস্যময় করতে পারে তা অন্য কিছুতে পাওয়া অসম্ভব।
যেভাবে যাবেন
যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে আলুটিলা যাওয়া এখন অত্যন্ত সহজ। ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে খাগড়াছড়িগামী যেকোনো দূরপাল্লার বাসে চড়ে সরাসরি আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের সামনেই নেমে যাওয়া যায়। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি শহর থেকে সিএনজি বা লোকাল বাসে চড়ে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটেই আলুটিলা পৌঁছানো সম্ভব।
সতর্কতা
গুহার ভেতরের পাথরগুলো জলমগ্ন এবং শ্যাওলার কারণে অত্যন্ত পিচ্ছিল। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে গ্রিপ ভালো এমন স্যান্ডেল বা রাবারের জুতা পরা উচিত। যেহেতু সুড়ঙ্গের নিচে পানি থাকে এবং কোথাও কোথাও পানি হাঁটুর কাছাকাছি পৌঁছায়, তাই ভ্রমণের সময় সহজে গুটিয়ে নেওয়া যায় এমন পোশাক পরা শ্রেয়। গুহার ভেতরে একা না ঢুকে কয়েকজন মিলে ঢুকলে ভালো। এতে অন্ধকার বা পিচ্ছিল পথে একে অপরকে সাহায্য করা যায়। নিজের সাবধানতার পাশাপাশি প্লাস্টিকের বোতল বা চিপসের প্যাকেট ফেলে এই প্রাচীন প্রাকৃতিক গুহার পরিবেশ নষ্ট করা থেকে সবার বিরত থাকা উচিত।
নাগরিক জীবনের কোলাহল, কৃত্রিমতা আর একঘেয়েমি রুটিন কাটাতে আলুটিলার এই রহস্যময় সুড়ঙ্গ এক অনবদ্য গন্তব্য। প্রাচীন দেয়াল আর পায়ের নিচে বয়ে চলা শীতল স্রোতের এই মিশ্র আয়োজন ভ্রমণপ্রেমীদের আজীবন বহন করার মতো এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি উপহার দেয়।
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়