কেন গ্রিনল্যান্ডে ‘গ্রিন’ কম, আইসল্যান্ডে ‘বরফ’ কম

আইসল্যান্ডে এমন সুন্দর সুন্দর অনেক ঝরনা রয়েছেছবি: ফ্রিপিক
জলবায়ু এবং ভূখণ্ডের বৈচিত্র্যের বাইরেও দেশ দুটির নামকরণের পেছনে রয়েছে বিশাল ইতিহাস ও উপাখ্যান।

গ্রিনল্যান্ড নামটি মাথায় এলে প্রথমেই চোখে ভাসে সম্পূর্ণ সবুজে আবৃত একটি দেশের চিত্র। অন্যদিকে আইসল্যান্ড নাম শুনলে মনে হয় বরফে আবৃত কোনো দেশ হবে! বাস্তবে পুরোপুরি বিপরীত চিত্র। গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ অঞ্চল (প্রায় ৮০%) বরফে আবৃত থাকে। সবুজ প্রকৃতি এই দেশে খুবই কম। আর আইসল্যান্ডের অধিকাংশ অঞ্চল সবুজে ঢাকা, বরফ মাত্র ১১ শতাংশ এলাকায়। এখন প্রশ্ন হলো কেন এই বিপরীত নামকরণ?

জলবায়ু এবং ভূখণ্ডের বৈচিত্র্যের বাইরেও দেশ দুটির নামকরণের পেছনে রয়েছে বিশাল ইতিহাস ও উপাখ্যান। যে উপাখ্যানের পেছনে রয়েছে নরওয়েজিয়ান ভাইকিংসদের নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের নেশা, বসতি স্থাপন নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং অভিবাসীদের আকৃষ্ট করতে ব্যতিক্রমী প্রচারণার কৌশল। বিষয়টি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক হাজার বছর আগে। ‘ভাইকিংস’ নামের একটি বিখ্যাত টিভি সিরিজ রয়েছে। যাঁরা সিরিজটি দেখেছেন, তাঁদের জন্য বিষয়টি বুঝতে কিছুটা সুবিধা হবে।

সিরিজে দেখে থাকবেন ভাইকিংসদের অন্যতম নেশা নতুন নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার করা। মূলত পুরুষদের ভাইকিংস বলে সম্বোধন করা হয়। এই দলে নারীরাও থাকত। নারীদের বলা হতো শিলমেইডেন। গ্রীষ্মে যখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকত, তখন তারা নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের নেশায় বিশেষভাবে নির্মিত নৌকায় করে সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করত। নতুন ভূখণ্ড পাওয়ার পর সেখানে তারা প্রথমে লুটপাট করত এবং লুটপাট করা সম্পদ নিজ দেশে নিয়ে আসত। সেই সম্পদ দিয়ে তাদের দেশ চলত। আর কিছু লোক ছিল যারা উন্নত জীবনের আশায় নতুন ভূখণ্ডে বসতি গড়ে তুলত।

গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের আবিষ্কার, বসতি স্থাপন এবং নামকরণ এই ভাইকিংসদের হাত ধরেই শুরু হয়। তাদের একটা অলিখিত প্রথা ছিল, কোনো একটা নতুন ভূখণ্ডে গেলে যা প্রথমে দৃষ্টিগোচর হবে, সেই অনুসারে স্থানের নাম এবং শেষে ল্যান্ড যুক্ত করে দেওয়া। এভাবেই নামকরণ হতো।

গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ অঞ্চল (প্রায় ৮০%) বরফে আবৃত থাকে
ছবি: ফ্রিপিক

ভৌগোলিক দিক
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড। শীতকালে দেশটির তাপমাত্রা সাধারণত শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকে এবং গ্রীষ্মকালে থাকে ১০-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের উপসাগরীয় স্রোত উষ্ণ জল ও বাতাস বয়ে আনে, যা দ্বীপটিকে অস্বাভাবিকভাবে মৃদু রাখে। এই স্রোত মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা বাতাস এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের উষ্ণ বায়ুর সঙ্গে মিশে ঘন ঘন আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটায়। এ কারণে দেশটির দক্ষিণ উপকূল উষ্ণ ও আর্দ্র, উত্তর অপেক্ষাকৃত শুষ্ক ও শীতল থাকে। আবার অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বেশি হয়।

অন্যদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত। তবে এটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইউরোপিয়ানদের হাতে। দেশটির বেশির ভাগ অংশ আর্কটিক সার্কেলের ওপরে হওয়ায় তা মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা বাতাস ও কম সূর্যালোকের কারণ। গ্রীষ্মকালে সাধারণ তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয় না আর শীতকালে তা নেমে হয় মাইনাস ২০ ডিগ্রি থেকে মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ভেতরের বরফের চাদরের তাপমাত্রা সারা বছর হিমাঙ্কের নিচে থাকে।

আরও পড়ুন

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
লোককথায় প্রচলিত আছে, যখন নরওয়েজিয়ান ভাইকিংসদের প্রথম দলটি আইসল্যান্ড আবিষ্কার করে, তখন ওই স্থানে প্রবল তুষারপাত হচ্ছিল। এ কারণে নাম রাখা হয় ‘স্নো ল্যান্ড’। পরে সুইডিশ ভাইকিং গারোর সভাভারোসন গিয়ে সেটির নামকরণ নিজের নামে করেন ‘গারোর ল্যান্ড’। পরে ফ্লোকি নামে আরও এক ভাইকিংস সেখানে বসতি স্থাপন করতে যান। কিন্তু তাঁর ভাগ্য এতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। নৌকা দিয়ে যাওয়ার সময় সমুদ্রপথে তাঁর মেয়ে ডুবে মারা যায়, সঙ্গে থাকা সব পশুপাখিও মারা যায়। এ কারণে ওই ভূখণ্ডে পৌঁছে চরম হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। সেখানে দেখতে পান এক বিশাল বরফখণ্ড। সেটি দেখেই আইসল্যান্ড নামকরণ করেন।

ধারণা করা হয়, ফ্লোকি চাননি এই ভূখণ্ডে কেউ বসবাস করুক। এ জন্য নরওয়ে ফিরে গিয়ে প্রচারণা চালাতে থাকেন যে দ্বীপটি বরফে ঢাকা এবং বসবাসের অনুপযোগী। তবে তাঁর এক সঙ্গী প্রচারণা চালান যে দ্বীপটি দারুণ উর্বর এবং সবুজে ভরপুর। সেই থেকে মানুষের বসতি বাড়তে থাকে।

আরও একটি লোককাহিনি আছে। যেখানে বলা হয়, আইসল্যান্ড আবিষ্কার করতে গিয়ে সেখানের জায়গা দখল নিয়ে ভাইকিংসদের দুই গ্রুপে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। তখন একদল নতুন ভূখণ্ডের বেরিয়ে যান। তাঁরা পরে যে ভূখণ্ডটি আবিষ্কার করেন, সেটি বরফে আচ্ছাদিত থাকলেও নতুন বসতি স্থাপন করার জন্য মানুষকে আকৃষ্ট করতে গ্রিনল্যান্ড বলে প্রচারণা চালাতে থাকে। এভাবেই দ্বীপটির নাম মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে যায়।