লেখকসত্তাকে আবিষ্কার করার এক অনন্য যাত্রা

কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের সঙ্গে।

লিখতে শুরু করার পর থেকে শব্দের সঙ্গে কতটা পথ পেরিয়ে এসেছি, তার হিসাব কখনো রাখিনি। কত লেখা এসেছে, হারিয়ে গেছে; কত শব্দ আপন হয়েছে, কত অনুভূতি কাগজে জায়গা পায়নি—তারও হিসাব নেই। তবু পথ চলতে চলতে বুঝেছি, লেখালেখি আসলে নিজেকে খুঁজে ফেরারই আরেক নাম। সেই খোঁজার পথেই গত ২৮ আগস্ট ঢাকার কারওয়ান বাজারে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সকালে গুটিগুটি পায়ে প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’-এ উপস্থিত হওয়া।

কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন উৎসবস্থলে পৌঁছালাম, মনে হচ্ছিল এতদিন যাঁদের লেখা পড়েছি, তাঁদের কাউকে কাউকে এবার খুব কাছ থেকে দেখব, শুনব। লেখক, সম্পাদক, কবি, অনুবাদক, প্রকাশকদের সান্নিধ্যে তাঁদের কথা শোনা, প্রশ্নোত্তর পর্বে নিজের কৌতূহল মেটানো—এক অন্য রকম আবহ। এর আগে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে অনলাইনে বেশ কিছু সেশন পরিচালিত হলেও সামনাসামনি তাঁদের কথা ও অভিজ্ঞতা শোনার অনুভূতি ছিল এই প্রথম।

জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মিলিয়ে সুন্দর দিনটির সূচনা। সম্মেলনকক্ষে প্রবেশ করেই কথাসাহিত্যিক ও শব্দঘর সম্পাদক মোহিত কামাল জানতে চাইলেন, সবচেয়ে দূর থেকে কে এসেছে। ‘আমি কুড়িগ্রাম থেকে এসেছি’ বলতেই উঠে এল তাঁর হোমটাউন সন্দ্বীপের কথা। খুব সাধারণ একটি কথোপকথন, অথচ মুহূর্তটিই যেন আপন করে নিল পুরো পরিবেশটাকে। এরপর তাঁকে যখন অতি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার জন্য বলা হলো, তিনি খুব সংক্ষিপ্তভাবেই বললেন, ‘সবার জন্য ভালোবাসা।’ আর উপস্থিত সবার প্রাণখোলা হাসি।

আলোচনা শেষে মোহিত কামাল তাঁর ‘ফ্ল্যাশফিকশন পঁচিশ তারার ঝলক’ বইটি উপহার দেন। ইচ্ছে থাকলেও সময় সুযোগের অভাবে অটোগ্রাফটি নেওয়া হয়নি—আক্ষেপটা হয়তো রয়েই যাবে। তবে উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে না পেরে ফিরতি ট্রেনেই কুড়িগ্রাম ফিরতে ফিরতে স্বয়ং লেখকের কাছ থেকে উপহার পাওয়া বইটির বেশ কিছু অংশ ইতিমধ্যেই পড়া শেষ করে ফেলেছি। ফ্ল্যাশফিকশন নামক সাহিত্যের এই টার্ম তথা ‘ঝলক গল্প’-এর সঙ্গে আমার পূর্ণাঙ্গ পরিচয়ও হয় সেদিন।

অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীনের আলোচনায় অনুবাদ ও ভ্রমণ নিয়ে অনেক নতুন কথা জানলাম। তাঁর একটি কথা বিশেষভাবে মনে গেঁথে রইল—‘প্রতিটি মানুষ অনুবাদক।’ নিজের অনুভূতি কিংবা উপলব্ধি অন্যের কাছে তার মতো করে বোধগম্য করে তোলাও তো একপ্রকার অনুবাদ। কথাটি শুনে মনে হলো, লেখালেখির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একজন লেখক নিজের ভেতরের অনুভূতিকে অন্যের অনুভবের ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিশ্বসাহিত্য যেমন বাংলায় পৌঁছে যাচ্ছে, তেমনি বাংলাসাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। কে কতগুলো অনুবাদ করলেন, সেই সংখ্যা বিচার না করে গুণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং অনুবাদে যেন মূল লেখার স্বকীয়তা হারিয়ে না যায়—এসব কথাও জানলাম। পাশাপাশি জানা হলো ভ্রমণসাহিত্যের কথাও।

সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ এবং বাতিঘরের সিইও অ্যান্ড চিফ এডিটর জাফর আহমদ রাশেদের সঙ্গে লেখক-প্রকাশক-সম্পাদক আলাপচারিতায় নতুন লেখকের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে জানলাম। প্রকাশক ও বইকর্মী হিসেবে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম। অতীতের বই প্রকাশের ইতিহাসও উঠে এল আলোচনায়।
‘এক পারসেন্ট সম্ভাবনা যেকোনো মুহূর্তে এক শ পারসেন্ট হতে পারে’—জাফর আহমদ রাশেদের বলা এই কথা ভীষণ ভালো লেগেছে। লেখালেখির মতো দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যাত্রায় হয়তো এমন একটি বাক্যই কখনো কখনো অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেয়।

সংবাদ কিংবা ফিচার বরাবরই আমার ভীষণ আগ্রহের বিষয়। প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীনের সান্নিধ্যে সংবাদ ও ফিচারবিষয়ক কর্মশালাটি বিশেষ আকর্ষণের ছিল। তথ্যের সঠিক ব্যবহার, ফাইভ ডব্লিউ, পাঠক আসলে কী চায়, অতিরিক্ত বিমূর্ত শব্দের ব্যবহার না করা, শিরোনাম ও ইন্ট্রো—এসব বিষয়ে ধারণা দেন তিনি।
তবে সুমনা শারমীনের একটি কথা সবচেয়ে বেশি মনে রয়ে গেল—‘তুমি যেটাকে ভালো মনে করছ, অন্যেরা সেটা না–ও করতে পারেন।’ বিষয়টি বোঝাতে একই ব্র্যান্ডের একই সাইজের পাঁচ জোড়া জুতার উদাহরণ দেন তিনি। পায়ে দিলেই আমরা বুঝতে পারি কোনটি আমাদের। শুধু নিজেরটা বুঝলে হবে না, অন্যের জুতায় পা গলিয়ে দিয়ে বোঝার চেষ্টাও করতে হবে। এমপ্যাথি তথা সমানুভূতি রাখতে হবে। লেখালেখির ক্ষেত্রেও কথাটি কতটা সত্যি, তা সেদিন নতুন করে উপলব্ধি করলাম। একজন লেখক শুধু নিজের অনুভূতির কথাই বলবেন না; পাঠক কীভাবে সেটিকে গ্রহণ করছেন, অন্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে সেটিকে কেমন দেখা যায়—সেটিও ভাবতে হবে।

লেখক হতে গেলে ভীষণ সংবেদনশীল মানুষ হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি নিজেও গভীরভাবে উপলব্ধি করি। কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনও একই কথা বললেন—‘স্পর্শিত হওয়া জরুরি।’ ফিকশন ও নন-ফিকশন আলোচনার বিষয় থাকলেও একে একে লেখক-পাঠকের প্রশ্নোত্তর, কথোপকথন, মতামত ও অনুভূতির প্রকাশে সেশনটি ভীষণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্লট নির্বাচন, দীর্ঘ উপন্যাস নির্মাণ, কবিতা—নানাবিধ বিষয় উঠে আসে আলোচনায়। ফটোগ্রাফি দিয়ে শুরু, তারপর ছোটবেলার ভাবনা থেকে জীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতার কথা। যেমন ভালো লেখেন, তেমনি গুছিয়ে বলেনও। কিছু কবিতার লাইনে অনেকের চোখও ভিজে ওঠে। কী নির্মল সময়—আহা!

কবি সাজ্জাদ শরিফের কবিতাবিষয়ক আলোচনাটিও ছিল অন্য রকম। ‘ভাষার সীমাবদ্ধতাই শিল্পের কাজ’—বলেন তিনি। বিভিন্ন চিত্রকর্ম ও ভিডিওচিত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে ব্যতিক্রমী কৌশলে উপস্থিত লেখকদের ভাবনার দুয়ার উন্মোচনের চেষ্টা করেন। সময়কে ভাস্কর্যে পরিণত করার পাঠ দেন। বুদ্ধির ফাঁদ কিংবা বুদ্ধির ধোঁকা সম্পর্কে বলেন। তাঁর আলোচনা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, কবিতা বোধ হয় শুধু শব্দের কারুকাজ নয়; বরং দেখার একটি ভিন্ন চোখ। একই পৃথিবীকে অন্যভাবে অনুভব করার ক্ষমতাও একধরনের কবিতা।

এরপর আসে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকা একটি বিশেষ মুহূর্ত। ২০২০ সালে করোনা মহামারির লকডাউনের ঘরবন্দী সময়গুলোতে বই হয়ে উঠেছিল অন্যতম সঙ্গী। সে সময়ে আনিসুল হকের ‘মা’ বইটি পড়ে ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। তখন বন্ধুসভার বুক রিভিউ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীও হয়েছিলাম। এরপর লেখকের আরও অনেক লেখা পড়া হয়েছে। তবে সেই থেকে সামনাসামনি একবার দেখা করার একটি সুপ্ত ইচ্ছা মনে গেঁথে গিয়েছিল। এতদিনে সেই সুযোগ করে দিল ‘লেখক বন্ধু উৎসব’। লেখকজীবনের সংগ্রাম নিয়ে বলতে গিয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘শিল্প মানেই ব্যর্থতা, শিল্পী মানেই ব্যর্থ।’ আরও বলেন, ‘আপনি যখন ব্যর্থ হবেন তখনই সফল হবেন।’

আরও পড়ুন

লেখালেখি নিঃসঙ্গ কাজ। লেখকজীবনের সংগ্রাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাস, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, টলস্টয়, দস্তয়েভস্কিসহ আরও অনেকের কথা উঠে আসে। লেখালেখি করে উপার্জন এবং জীবনের নির্মম বাস্তবতা হিসাব করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন আনিসুল হক। নীরদ সি. চৌধুরীর বয়ানে ছাগল লেখক ও পাগল লেখকের উদাহরণও টানেন। শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, লেখালেখির যে পথটিকে বাইরে থেকে কখনো খুব সুন্দর ও সহজ মনে হয়, তার ভেতরে কতটা নিঃসঙ্গতা, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রাম লুকিয়ে থাকে!

দিনের শেষপর্যায়ে সনদ নেওয়ার সুবাদে আনিসুল হকের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়। কুশল বিনিময় ও পরিচয় দেওয়ার পর হঠাৎ তিনি বললেন, ‘কুড়িগ্রামের নুসরাত জাহান তো আমার বই রিভিউ করেছিল?’
‘জ্বি স্যার, আমিই সেই নুসরাত জাহান।
‘বাহ, অনেক ভালো লিখেছিলে। (হাসি দিয়ে) ভালো ভালো লেখকের আগমন ঘটেছে তো এবার!’
স্বভাবতই লজ্জাসূচক হাসি দিই।

কথোপকথন খুব অল্প সময়ের। কিন্তু একজন পাঠক হিসেবে আমার জন্য মুহূর্তটি ছিল ভীষণ আলাদা। আমার পড়া অন্যতম পছন্দের একটি উপন্যাস ‘মা’-এর লেখকের সঙ্গে প্রথমবার সামনাসামনি কথা বলা। আর তিনি আমার লেখা কোনো এক সময় পড়েছেন—এই অনুভূতিটুকু নিশ্চয়ই অনেক দিন মনে থাকবে।

এর ফাঁকে বন্ধুসভার ওয়েবসাইটে লেখা প্রকাশের দায় ও দায়িত্বের জায়গা সম্পর্কে কথা বলেন তাহসিন আহমেদ ও শাকিব হাসান। বুশরা আপু, বন্ধু মাহফুজ, তৌহিদ ভাইদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লেগেছে। ভীষণ টাইট শিডিউলে পরিচিত অনেকের সঙ্গে চোখাচোখি হলেও কথা বলা হয়ে ওঠেনি। আবার অপরিচিত অনেকের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেও ভালো লেগেছে। সব মিলিয়ে দিনটি যেন একসময় অজান্তেই নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনে পরিণত হলো।

নতুন অনেক কিছু শিখেছি, জেনেছি, সমৃদ্ধ হয়েছি। একই সঙ্গে নিজের লেখালেখির পথটাকেও যেন একটু দূর থেকে ফিরে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এতদিন শব্দের সঙ্গে যে পথ চলেছি, সেই পথ কতটা দীর্ঘ কিংবা কতটা ছোট—সেদিন তার হিসাব করার প্রয়োজন বোধ করিনি। মনে হয়েছে, পথটা আসলে চলার জন্যই।

কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা—এই সুদীর্ঘ যাত্রা এবং ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ আমার কাছে তাই কেবল একটি আয়োজন নয়; বরং নিজেকে, নিজের লেখকসত্তাকে এবং শব্দের সঙ্গে এত দিনের সম্পর্ককে নতুন করে আবিষ্কার করার এক অনন্য যাত্রা। হয়তো এই ফিরে আসাটুকুই লেখালেখির সবচেয়ে সুন্দর অংশ। হয়তো এ আয়োজনের রেশ হৃদয়ে থেকে যাবে বহুদিন, তারপর স্মৃতিতে।

অংশগ্রহণকারী, লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬