সাহিত্য, সৃজনশীলতা, অনুবাদ, সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার নানা অনুষঙ্গ ঘিরে এক প্রাণবন্ত ও মননশীল দিন কাটল ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’–এ। প্রথম আলো বন্ধুসভার এই বিশেষ সাহিত্য আয়োজন ২৮ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নানা পর্বে সাজানো উৎসবটি হয়ে উঠেছিল সাহিত্যপ্রেমী, লেখক ও বন্ধুসভার বন্ধুদের এক আন্তরিক মিলনমেলা।
নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনব্যাপী এই আয়োজন। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী একের পর এক সেশনে দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রকাশকেরা তাঁদের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার নানা দিক তুলে ধরেন। আয়োজনজুড়েই ছিল শেখা, জানা, ভাবা ও নতুন করে লেখালেখির অনুপ্রেরণা পাওয়ার সুযোগ।
দিনের প্রথম সেশনেই কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল আলোচনা করেন ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন নিয়ে। ডিজিটাল যুগে মানুষের মনোযোগের ধরন এবং দীর্ঘ লেখা পাঠের অভ্যাস পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তিনি তুলে ধরেন। স্বল্প পরিসরে কীভাবে একটি তীক্ষ্ণ অনুভূতি, ঘটনা কিংবা বক্তব্যকে শক্তিশালী শিল্পরূপ দেওয়া যায়, সে বিষয়ে তাঁর আলোচনা ছিল সময়োপযোগী ও ভাবনাজাগানিয়া। তাঁর বক্তব্যের সারকথা যেন এমন—শব্দের পরিসর ছোট হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের প্রভাব কখনো ছোট হতে হয় না।
অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দিন কথা বলেন ভ্রমণ ও অনুবাদের মেলবন্ধন নিয়ে। ভ্রমণসাহিত্য আমাদের পরিচিত ভূগোলের সীমানা পেরিয়ে অন্য মানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। অন্যদিকে অনুবাদ এক ভাষার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেয় অন্য ভাষার পাঠকের কাছে। ভ্রমণ ও অনুবাদের এই আন্তসম্পর্ক এবং সম্ভাবনার নানা দিক তাঁর আলোচনায় উঠে আসে।
আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল লেখক-সম্পাদক-প্রকাশক আলাপচারিতা পর্ব। প্রকাশনা জগতের অভিজ্ঞতা, বই প্রকাশের বাস্তবতা এবং সাহিত্যচর্চার নানা দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় এই পর্বে। উপস্থিত ছিলেন বাতিঘরের সিইও অ্যান্ড চিফ এডিটর জাফর আহমদ রাশেদ এবং সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রকাশনা জগতের বাস্তব চিত্র নিয়ে আলোচনা লেখকদের জন্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন সংবাদ ও ফিচার লেখার সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে একটি প্রাণবন্ত সেশন পরিচালনা করেন। একটি বিষয়কে কীভাবে পাঠকের কাছে তথ্যবহুল, আকর্ষণীয় ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা যায়—তাঁর আলোচনায় উঠে আসে নানা কৌশল, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রয়োগের দিক।
দুপুরের বিরতির পর অনুষ্ঠিত হয় বন্ধুসভার বন্ধুদের পাঠ ও লেখালেখি নিয়ে মতবিনিময়। নিজেদের লেখা, সাহিত্যচর্চার অভিজ্ঞতা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বন্ধুদের আন্তরিক আলাপ আয়োজনটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
পরবর্তী সেশনে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন আলোচনা করেন ফিকশন ও নন-ফিকশন লেখার কৌশল ও সম্ভাবনা নিয়ে। একটি লেখা কীভাবে শুরু করা যায়, বিষয় নির্বাচন, ভাবনার বিস্তার, ভাষার ব্যবহার এবং পাঠকের কাছে লেখাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার বিভিন্ন দিক উঠে আসে তাঁর আলোচনায়। বিশেষ করে নতুন লেখকদের জন্য তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ বক্তব্য ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক।
এরপর কবিতা নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় একটি বিশেষ পর্ব। কবিতার অনুভব, নির্মাণ, ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি নিয়ে আলোচনা সেশনে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। শব্দের সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনুভূতির গভীরতা কীভাবে প্রকাশ পায়—কবিতা নিয়ে এই ভাবনাও হয়ে ওঠে আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
দিনের শেষভাগে কথাসাহিত্যিক ও কবি আনিসুল হক কথা বলেন লেখকজীবনের সংগ্রাম নিয়ে। একজন লেখকের জীবন যে কেবল খ্যাতি, পুরস্কার কিংবা বই প্রকাশের আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়—তার অন্তরালে থাকে দীর্ঘ পরিশ্রম, অপেক্ষা, প্রত্যাখ্যান, অনিশ্চয়তা এবং নানা প্রতিকূলতার গল্প; তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সেই বাস্তবতার নানা দিক। বিশেষ করে বইমেলাকে ঘিরে লেখকদের নানা অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের কথা তাঁর আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এত প্রতিকূলতার পরও লেখার প্রতি ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা ও গভীর প্যাশনই একজন লেখককে বারবার কলমের কাছে ফিরিয়ে আনে। তাঁর বক্তব্যে সেই সত্যটি গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
এ ছাড়া লেখক বন্ধুদের নিজেদের প্রকাশিত বইয়ের ডিসপ্লে, অটোগ্রাফ ও পারস্পরিক আলাপচারিতা ছিল আয়োজনের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক। বই, লেখক ও পাঠকের এই সরাসরি সংযোগ পুরো অনুষ্ঠানকে দিয়েছে এক প্রাণবন্ত সাহিত্যিক আবহ।
সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী ও পুরস্কার প্রদান পর্ব। নির্বাচিত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের সম্মাননা, শুভেচ্ছা ও ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনটি পায় আনন্দঘন পরিণতি। বিকেলের নাশতা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় লেখক বন্ধু উৎসব।
একটি দিন, অসংখ্য কথা, বহু অভিজ্ঞতা ও নতুন করে লেখার অনুপ্রেরণা—‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ তাই শুধু একটি আয়োজন নয়; এটি হয়ে রইল সাহিত্যপ্রেমী মানুষের জন্য স্মরণীয় এক সৃজনযাত্রা। সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা, সৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধতা আর শব্দের প্রতি অগাধ বিশ্বাস—এই তিনের মেলবন্ধনেই জন্ম নেয় এমন একটি সুন্দর দিন, যা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়।
অংশগ্রহণকারী, লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬