দেশ ছাড়লেও স্মৃতি ছাড়ে না

প্রবাসে প্রতিদিনের রুটিনমাফিক জীবন, প্রিয়জনদের অনুপস্থিতি আর পরিচিত আড্ডার অভাব ধীরে ধীরে হৃদয়ে জমায় শূন্যতাছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

পৃথিবীর কোনো কিছুই চিরস্থায়ী হয় না। সময়কে কখনোই থামিয়ে রাখা যায় না। জীবনের গতি সব সময় এগিয়ে চলে, মানুষকে টেনে নিয়ে যায় অচেনা পথে। কেউ দেশান্তরি হয় স্বপ্নের টানে, কেউ প্রয়োজনের তাগিদে। কিন্তু দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থেকে যায় এক অমূল্য বোঝা—স্মৃতি।

দেশান্তরি হওয়ার পর সময় যত এগোয়, ততই মনে পড়ে ফেলে আসা দিনগুলো। শহরের অলিগলির চায়ের টং, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, নিরন্তর খুনসুটি যেন জীবনের অমূল্য সম্পদ। দিনের ক্লান্তি মুছে যেত কয়েক কাপ চায়ের ভাপে আর বন্ধুদের গল্পে। সেখানে অর্থ, প্রাপ্তি কিংবা ভবিষ্যতের হিসাবনিকাশের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল মুহূর্তের হাসি আর হৃদয়ের টান।

বিদেশের ব্যস্ত নগরীতে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে এক বিকেলে টংয়ের টেবিলে জমে ওঠা হইচই, বন্ধুদের অনর্থক তর্কবিতর্ক, আবার মিলেমিশে হাসিতে ফেটে পড়া। এখন বুঝি, সেই সময়গুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, অথচ সেগুলো ফেলে আসতে হয়েছে পেছনে।

দেশান্তর জীবনের বাস্তবতা অন্য রকম। এখানে আছে একাকিত্ব, আছে নিঃশব্দ ব্যস্ততা। প্রতিদিনের রুটিনমাফিক জীবন, প্রিয়জনদের অনুপস্থিতি আর পরিচিত আড্ডার অভাব ধীরে ধীরে হৃদয়ে জমায় শূন্যতা। আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে দূরত্ব কমলেও, আড্ডার উষ্ণতা কিংবা বন্ধুত্বের প্রাণবন্ততাকে হাতে থাকা স্ক্রিনে বন্দী করা যায় না।

আরও পড়ুন

তবু জীবন থেমে থাকে না। নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। স্বপ্নের পেছনে ছোটা মানুষ হয়তো সফলতার পথে হাঁটে, কিন্তু গভীর রাতের নীরবতায় মনের ভেতর থেকে ভেসে আসে সেই প্রশ্ন—যদি ফিরে যেতে পারতাম!

পৃথিবীতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু স্মৃতি? স্মৃতিই একমাত্র স্থায়ী সঙ্গী, যা মানুষকে অতীতের সেরা মুহূর্তগুলোর সঙ্গে বেঁধে রাখে। তাই দেশান্তরিত জীবনের মধ্যেও সেই টংদোকানের চা আর বন্ধুত্বের হাসি আজীবন হৃদয়ে বেঁচে থাকে।

দিন শেষে ভালো থাকার কারণ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকি, জানি না হয় কি না! বারবার মনের কোণে প্রশ্ন উঁকি দেয়—আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে?

হেলসিঙ্কি, ফিনল্যান্ড