অতীতে ফিরে গেলে কি সত্যিই বর্তমান বদলানো সম্ভব

প্রতীকীছবি: এআই/বন্ধুসভা

কল্পনা করুন, সকালে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন যে আজকের দিনটি গতকালের মতোই মনে হচ্ছে। মানুষজন যেসব কথা বলছে, সবকিছুই একদম হুবহু এক। কিংবা চিন্তা করুন, কোনো এক বিশেষ যন্ত্রের বোতামে চাপ দিয়ে ১৯৪৭ সালে গিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ হওয়া দেখছেন।

অবাক হচ্ছেন! ভাবছেন এটা কি কখনো সম্ভব নাকি। হ্যাঁ, সম্ভব নয়। এমনকি আগামীতে কখনো সম্ভব হবে কি না, তা বলা মুশকিল। তবে এই অবাস্তব পদ্ধতির গবেষণা চলতেই আছে এবং বিভিন্ন সিনেমার কাহিনিগুলোতে টাইম বা সময় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

সময়ের এই অদম্য গতিকে জয় করার জন্য বৈজ্ঞানিক ফ্যান্টাসি থেকে কাল্পনিক সাহিত্যে জন্ম নিয়েছে অত্যন্ত জনপ্রিয় দুটি ধারণা। একটি হলো টাইম ট্রাভেল এবং অন্যটি টাইম লুপ। কল্পবিজ্ঞানের বইয়ের পাতা থেকে রুপালি পর্দা হয়ে পদার্থবিজ্ঞানের জটিল গবেষণাগার—সবখানেই এই বিষয় দুটি মানুষকে যুগে যুগে ভাবনার মধ্যে রেখেছে।

টাইম ট্রাভেল ও টাইম লুপের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর এক পার্থক্য রয়েছে। টাইম ট্রাভেল হলো সময়ের সরলরেখা ধরে অতীত বা ভবিষ্যতে যাতায়াত করা। অন্যদিকে টাইম লুপ হলো সময়ের একটি নির্দিষ্ট খণ্ডাংশে বা চক্রে বারবার আটকে থাকা।

১৮৯৫ সালে এইচ জি ওয়েলসের লেখা উপন্যাস ‘দ্য টাইম মেশিন’ প্রথম মানুষকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সময় ভ্রমণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে হলিউডের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’-এ ডক্টর এমেট ব্রাউন ও মার্টি ম্যাকফ্লাইয়ের কাল্পনিক গাড়িতে চড়ে অতীত-ভবিষ্যতে ঘুরে বেড়ানো দর্শকদের হৃদয় জয় করে। আধুনিক যুগের জনপ্রিয় সিরিজ ‘ডার্ক’ কিংবা মার্ভেলের ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’-এ সময় ভ্রমণকে আরও জটিল ও গাণিতিক মাত্রায় তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশেও সময়কে নিয়ে ‘কালপুরুষ’ নামের একটি সিরিজ বানানো হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রতিটি সিরিজই দেখেছি। এগুলো আমাকে ভাবিয়েছে। আসলেই কি অতীতে গিয়ে কোনো কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব? আর যদি পরিবর্তন করা যায়, তাহলে বর্তমান সময়ে কি পরিবর্তন হতে পারে? এসব বিষয় অনেক ভাবিয়েছে।

আরও পড়ুন

সময় চক্রের কথা বললে ১৯৯৩ সালের সিনেমা ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’র নাম প্রথমে আসবে, যেখানে মূল চরিত্রটি একটি নির্দিষ্ট দিনেই বারবার আটকে যায়। এ ছাড়া টম ক্রুজের সাই-ফাই সিনেমা ‘এজ অব টুমরো’তে এলিয়েনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রতিবার মারা গিয়ে একই দিনের শুরুতে ফিরে আসার গল্প দেখা যায়। ‘বডিজ’ সিরিজে দেখা যায়, ডেফো নামের এক বিজ্ঞানী অতীতে ভ্রমণ করতে গিয়ে চারটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে চলে যায়। একজন মানুষ চারটি ভিন্ন সময়ে চলে গেল! এটা কি আদৌ সম্ভব! এলোমেলো গল্প ছাড়া আপনার কাছে কিছুই মনে হবে না। কিন্তু পরিচালক এতটাই নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন যে আপনি ভুলেই যাবেন, এটা বাস্তবে অসম্ভব।

টাইম ট্রাভেলের আলোচনা এলে দুটি বিখ্যাত যৌক্তিক গোলকধাঁধা বা ‘প্যারাডক্স’ উঠে আসে। একটি গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স ও আরেকটি বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স

গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স: আপনি যদি অতীতে গিয়ে আপনার দাদা-দাদির অথবা নানা-নানির বিয়ে বন্ধ করে দেন, তবে আপনার মা–বাবার জন্ম হবে না। ফলে আপনারও জন্ম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সমস্যা ঘটে এ জায়গাতেই। আপনার জন্মই যদি না হয়, তবে অতীতে গিয়ে তাদের বিয়ে বন্ধ করল কে? কী, মাথা ঘুরে যাচ্ছে? ঘুরাটা স্বাভাবিক।

বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স: ধরা যাক, আপনি ভবিষ্যৎ থেকে শেক্‌সপিয়ারের একটি নাটকের বই কিনে অতীতে গিয়ে তরুণ শেক্‌সপিয়ারকে দিলেন এবং তিনি সেটি হুবহু দেখে নিজের নামে প্রকাশ করলেন। এখন প্রশ্ন হলো, নাটকটির আসল লেখক কে? নাটকটি প্রকাশের সত্যিকারের তারিখ কোনটি হবে? এমন অনেক প্রশ্ন আসবে মাথায়। আসাটাও স্বাভাবিক।

বাস্তব জগতে কি সময় ভ্রমণ সম্ভব? পদার্থবিজ্ঞানের মতে সম্ভব। তবে সেটা শুধু ভবিষ্যতের দিকে। আইনস্টাইনের ‘আপেক্ষিকতার তত্ত্ব’ অনুযায়ী, সময় কোনো স্থির বিষয় নয়; গতি ও মহাকর্ষের প্রভাবে সময়ের গতি ধীর বা দ্রুত হতে পারে। একে বলা হয় টাইম ডাইলেশন।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীরা প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। ফলে পৃথিবীতে থাকা মানুষের তুলনায় তাদের সময় কিছটা ধীরগতিতে চলে। রাশিয়ার প্রখ্যাত নভোচারী সার্গেই ক্রিকালিয়েভ মহাকাশে মোট ৮০৩ দিন কাটানোর পর যখন পৃথিবীতে ফেরেন, গাণিতিকভাবে তিনি পৃথিবীর সাধারণ মানুষের চেয়ে শূন্য দশমিক শূন্য ২ সেকেন্ড ভবিষ্যতে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এটি হয়তোবা আপনার কাছে গল্প মনে হতে পারে, তবে এটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে সত্য।

তবে অতীতে যাত্রা করা বা কোনো সময়ের চক্রে (টাইস লুপ) আটকে পড়া বাস্তবে অত্যন্ত জটিল। মহাবিশ্বে ‘ওয়ার্মহোল’ নামের মহাজাগতিক সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে অতীতে যাওয়ার তাত্ত্বিক ধারণা থাকলেও বাস্তবে তা অসম্ভব বলেই মনে করেন বিজ্ঞানীরা। বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং প্রস্তাব করেছিলেন ‘ক্রোনোলজি প্রটেকশন কনজেকচার’। তাঁর মতে, অতীত ভ্রমণের ফলে তৈরি হওয়া বিভাজনে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা যেন ভেঙে না পড়ে, সে জন্য প্রকৃতি নিজেই পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়ে অতীতে যাওয়া রোধ করে রেখেছে।

টাইম ট্রাভেল ও টাইম লুপ কেবল সিনেমা বা কল্পকাহিনির অনুষঙ্গ নয়; এগুলো মানুষের অস্তিত্ব, ভুল শোধরানোর আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেও মূল্য নিয়ে ভাবায়। অতীতে ফিরে গিয়ে ভুল শুধরে নেওয়া কিংবা ভবিষ্যৎকে আগে থেকেই বদলে ফেলার এই আদিম চাওয়া হয়তো বাস্তবে অপ্রাপ্য। কিন্তু কল্পনা ও বিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন মানব মস্তিষ্ককে চিরকালই রোমাঞ্চিত করে রাখবে।

সহকারী শিক্ষক, বাবুডাইং আলোর পাঠশালা