অদৃশ্য রেডিও তরঙ্গ কীভাবে খুঁজে পায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র
পৃথিবীতে মানুষ যখন প্রথম আকাশে ওড়তে শিখল, তখন থেকেই আকাশের তথ্য জানার প্রয়োজনবোধ মনে করল। সময়ের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিশ্ব গড়ে তোলার সম্ভাবনা অনুভূত হয়। সেই কল্পনা, আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে ঊর্ধ্বাকাশ বা বিশ্বপরিমণ্ডলের তথ্য, চিত্র, নক্ষত্র ও গ্রহ-উপগ্রহের ধারণা পেতে রাডার আবিষ্কৃত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে।
১৯৩৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিগন্যাল কোর দ্বারা ‘রাডার’ শব্দটির উৎপত্তি। শব্দটি এসেছে ইংরেজি রেডিও ডিটেকশন অ্যান্ড র্যাঙ্গিং থেকে, যা বাংলায় রেডিও তরঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে বস্তু শনাক্ত ও তার দূরত্ব নির্ণয়। রাডার এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে তড়িৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে চলমান কিংবা স্থির থাকা বস্তুর অবস্থান, দূরত্ব, উচ্চতা ও দিক নির্ণয় করা হয়। যেমন শত্রুর বিমান কোন দিক থেকে আসছে, তার গতি কত—এসব জানার প্রয়োজন থেকেই রাডারের আবিষ্কার। বর্তমানে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস থেকে শুরু করে বিমান চলাচল, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং শত্রু বিমান, জাহাজ ও মিসাইল শনাক্তকরণসহ নানা কাজে এটি প্রচুর ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন গাড়িতেও রাডার সিস্টেম ব্যবহৃত হয়।
রাডার আবিষ্কারের ধারণা ও প্রাথমিক রূপ
রাডার আবিষ্কার কোনো একক ব্যক্তি বা প্রচেষ্টার ফল নয়, বরং এটি ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে আবিষ্কৃত অনেক বিজ্ঞানীর গবেষণা ও প্রচেষ্টার ফসল। রাডারের ইতিহাস শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। তবে এর আগে বিখ্যাত বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল গাণিতিকভাবে ধারণা দিয়েছিলেন, আলো একধরনের তড়িৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ। এ ছাড়া প্রকৃতিতে আরও অনেক অদৃশ্য তরঙ্গ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
১৮৮৭ সালে বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিদ হাইনরিশ হার্টজ তাঁর ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম সেই অদৃশ্য রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, রেডিও তরঙ্গ ধাতব বস্তু দ্বারা প্রতিফলিত হতে পারে। পরবর্তীকালে জার্মান উদ্ভাবক ও পদার্থবিদ ক্রিশ্চিয়ান হুইলসমেয়ার (যাঁকে রাডারের আদি পিতা হিসেবে মনে করা হয়) ১৯০৪ সালে একটি জাহাজ শনাক্তকারী টেলিমোবিলোস্কোপ নামের যন্ত্র তৈরি করেন, যা কুয়াশায় জাহাজের সংঘর্ষ এড়াতে ব্যবহৃত হতো। এটিই ছিল রাডারের প্রাথমিক রূপ।
আধুনিক রাডারের উৎপত্তি
প্রথম আধুনিক রাডারের বিকাশ ঘটে ১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে। ব্রিটেনের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূলজুড়ে প্রায় ২৪০ ফুট বা ৭৩ মিটার উঁচুতে বিশাল সব স্টিল ও কাঠের তৈরি অ্যানটেনা টাওয়ারে আবিষ্কৃত হয় বিশ্বের প্রথম আধুনিক রাডার ‘চেইন হোম’, যা ব্রিটেনের মূল প্রতিরক্ষাপ্রাচীর হিসেবে বিবেচিত। তৎকালীন সময়ে জার্মানির যুদ্ধবিমানগুলো ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর অনেক আগেই চেইন হোম রাডারটি ২০০ থেকে ২৫০ মাইল দূর থেকে শত্রু বিমানকে শনাক্ত করতে সক্ষম হতো। এই চেইন হোম ছিল বিশ্বের প্রথম আগাম সতর্কীকরণ রাডার নেটওয়ার্ক এবং প্রথম কার্যকর সামরিক রাডারব্যবস্থা। এটির প্রধান পরিকল্পনাকারী ও উদ্ভাবক ছিলেন বিখ্যাত পদার্থবিদ স্যার রবার্ট ওয়াটসন-ওয়াট। তিনি চেইন হোম রাডারে ১৯৩৫ সালে দূর থেকে শত্রু বিমান শনাক্তকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিখ্যাত মার্কিন প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক পার্সি স্পেন্সার ‘রেথিয়ন’ কোম্পানিতে রাডার প্রযুক্তির প্রধান উপাদান ‘ম্যাগনেট্রন’ নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ করেন, রাডারের ম্যাগনেট্রন থেকে নির্গত মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গের কারণে তাঁর পকেটে থাকা একটি চকলেট গলে গেছে। এ ঘটনা থেকেই তিনি খাবার গরম করার জন্য মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ধারণা পান। এ ঘটনা থেকেই পার্সি স্পেন্সার মাইক্রোওয়েভ ওভেন আবিষ্কার করেন। তিনি রাডারের মূল যন্ত্র ‘ম্যাগনেট্রন’ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলেন। যেখানে দিনে মাত্র ১৭টি ম্যাগনেট্রন তৈরি হতো, সেখানে তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে দিনে ২ হাজার ৬০০টির বেশি ম্যাগনেট্রন তৈরি করেছিলেন।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে রাডার প্রযুক্তির ব্যবহার মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যাপোলো ১৭ মিশনে চাঁদের কক্ষপথ এবং ১৯৭৮ সালে সি-স্যাট নামের বেসামরিক উপগ্রহের মাধ্যমে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণে রাডার ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও উন্নত প্রযুক্তির রাডার ব্যবহার করা হচ্ছে।
রাডার যেভাবে দূরের বস্তু শনাক্ত করে
রাডার মূলত রেডিও তরঙ্গের প্রতিফলন ব্যবহার করে বস্তু শনাক্ত করে। প্রথমে রাডার অ্যানটেনা থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে উচ্চগতির রেডিও তরঙ্গ পাঠানো হয়। তরঙ্গগুলো আলোর গতিতে ছুটে চলে। এই অদৃশ্য তরঙ্গগুলো যখন সামনে থাকা কোনো বস্তু যেমন বিমান, যুদ্ধজাহাজ, মিসাইল বা মেঘের সঙ্গে বাধার সম্মুখীন হয়, তখন সেই বস্তুর পৃষ্ঠ থেকে অদৃশ্য তরঙ্গের একটি ক্ষুদ্র অংশ প্রতিফলিত হয়ে আবার রাডারের দিকে ফিরে আসে। তরঙ্গটি পাঠাতে এবং আবার ফিরে আসতে মোট কত সময় লেগেছে, তা পরিমাপ করে বস্তুর নিখুঁত দূরত্ব, অবস্থান ও গতি নির্ণয় করতে সক্ষম হয় রাডার।
সিগন্যালের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু নির্ণয়
রাডার যখন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সিগন্যাল পাঠায়, তখন আশপাশের অন্যান্য প্রাকৃতিক সৃষ্ট আবহাওয়া, মেঘ, পাহাড়, গাছপালা, মানবসৃষ্ট দালানসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধক থেকেও সিগন্যাল প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। এই অপ্রয়োজনীয় সিগন্যালগুলোকেই রাডারের ভাষায় ক্লাটার বা একধরনের ভিজ্যুয়াল নয়েজ বলা হয়।
রাডারের সিগন্যাল পাহাড়, পর্বত, বহুতল ভবন, গাছপালা বা মাটির উঁচু স্তম্ভে আঘাতের কারণে স্থির বা অচল হয়ে থাকার সংকেত পেলে তা ভূপৃষ্ঠের ক্লাটার হিসেবে বিবেচিত হয়। আর সমুদ্রের ঢেউ, জলতরঙ্গ বা ফেনা থেকে প্রতিফলিত হওয়া সিগন্যাল রাডার স্ক্রিনে জটলা বা বিভ্রান্তি তৈরি করলে তখন তাকে সামুদ্রিক ক্লাটার বলা হয়। এটি বাতাসের কারণে প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন করতে পারে। এ ছাড়া বিশাল পাখির ঝাঁক এবং একসঙ্গে ওড়াউড়ি করা লাখ লাখ পঙ্গপাল ও পোকামাকড়ের দল রাডারের সিগন্যাল প্রতিফলিত করলে স্ক্রিনে বড় কোনো লক্ষ্যবস্তুর মতো বিভ্রম সৃষ্টি হয়, যাকে জৈবিক ক্লাটার বলা হয়। অন্যদিকে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ভারী কুয়াশা বা তুষারপাতের কারণে সিগন্যাল বাধা পেয়ে ফিরে এলে আবহাওয়াজনিত ক্লাটার হিসেবে ধরা হয়।
রাডারের ভেতরে থাকা কম্পিউটার অত্যন্ত জটিল গাণিতিক অ্যালগরিদমের সাহায্যে আসল লক্ষ্যবস্তুকে আলাদা করে চিনতে পারে। রাডার অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময়ের জন্য রেডিও তরঙ্গের একটি সিগন্যাল ছুড়ে দেয়। সিগন্যালটি পাঠানো শেষ হওয়ামাত্রই ডুপ্লেক্সার সুইচটি ট্রান্সমিটারের পথ বন্ধ করে প্রতিফলনের পথ খুলে দেয়। একে বলা হয় লিসেনিং মোড। এই শূন্য সময়ে রাডার শান্ত হয়ে প্রতিধ্বনির জন্য অপেক্ষা করে। তারপর সিগন্যালটি দূরের বস্তুতে বাধা পেয়ে ফিরে এসে লক্ষ্যবস্তুকে নির্ণয় করার সুযোগ প্রদান করে।
• বস্তুর দূরত্ব: ছুড়ে দেওয়া সিগন্যালটি আলোর গতিতে পৌঁছে আবার ফিরে আসতে ঠিক কত মাইক্রোসেকেন্ড সময় নিল, সেই সময়কে হিসাব করে কম্পিউটার বলে দেয় বস্তুটি কত কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে।
• বস্তুর গতি: চলমান কোনো বস্তুর গায়ে ধাক্কা খেয়ে সিগন্যাল ফিরে এলে, তার ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক সামান্য বদলে যায়। ফিরে আসা সিগন্যালের ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তনের বার্তা থেকে রাডার বুঝতে পারে বস্তুটি কত স্পিডে রাডারের দিকে ধেয়ে আসছে, নাকি দূরে সরে যাচ্ছে।
• অবস্থান: ছুড়ে দেওয়া সিগন্যালটি অ্যানটেনার ঠিক কোন কোণ থেকে সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে ফিরে এসেছে, সেই দিক ও উচ্চতার বার্তা থেকে বস্তুর ত্রিমাত্রিক অবস্থান নির্ণয় করা যায়।
• বস্তুর আকার: ফিরে আসা সিগন্যালের তীব্রতা বা শক্তি দেখে রাডার বুঝতে পারে, বস্তুটি আকার কত বড় হয়ে থাকে। আধুনিক আবহাওয়াভিত্তিক ক্লাটার রাডারে ফিরে আসা তরঙ্গের অভিমুখ দেখে মেঘের ভেতরে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, নাকি বরফ জমছে—সেই উপাদানগত বার্তাও নির্ণয় করা যায়।
গোলাকৃতির পৃথিবীর বাঁক শনাক্তকরণ
সাধারণত রাডার সিগন্যাল সোজা পথে চলে, তাই পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির কারণে অনেক দূরের নিচু বস্তু দেখতে পায় না। আধুনিক যুগের ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার পৃথিবীর বাঁক বা বক্রতাকে অতিক্রম করে দিগন্তের ওপারে থাকা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের বস্তু শনাক্ত করতে পারে। আন্তর্জাতিক সামরিকবিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, সাধারণত রাডার মাত্র ১০০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তু নির্ণয় করতে সক্ষম। আর ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার এক হাজার থেকে চার হাজার কিলোমিটার বা তার চেয়ে বেশি দূরত্বে অবস্থান করা বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও জাহাজ নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে পারে। এটি বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ার থেকে সিগন্যাল প্রতিফলিত করে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিজ্ঞানী উইলিয়াম জে থ্যালার ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার আবিষ্কার করেন। তিনি ১৯৫০-এর দশকে নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় প্রজেক্ট টিপি পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমেই তিনি প্রথম প্রমাণ করেন, আয়নোস্ফিয়ারের প্রতিফলন ব্যবহার করে দিগন্তের ওপারে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ বা পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্ত করা সম্ভব।
আধুনিক পৃথিবীতে রাডারের মাধ্যমে যেকোনো রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আবহাওয়া পূর্বাভাস সম্পর্কে আগে থেকে জানার এবং সচেতন হওয়ার ইতিবাচক দিক তৈরি করেছে। এর সাহায্যে মানুষ দূরের যেকোনো বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এই আবিষ্কারের দ্বারা পৃথিবীর মানুষ নিঃসন্দেহে অনেক উপকৃত হয়েছে। বর্তমান আধুনিক যুগেও রাডারের মাধ্যমে আরও নতুন নতুন উদ্ভাবনী যন্ত্র আবিষ্কৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার যেমন পৃথিবীকে আধুনিকতায় রূপান্তর করেছে, তার চেয়ে বেশি মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।
বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল অনবিক রিসার্চ হাব