ফেসবুকের ফিড স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি খবর—টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। খবরটি দেখেই মনে খটকা লাগল। সত্যিই কি টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে?
কৌতূহল থেকেই পরদিন সকালে যোগাযোগ করলাম কয়েকটি পর্যটক গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে। জানতে পারলাম, খবরটি পুরোপুরি সত্য নয়। টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ বন্ধ হয়নি; বরং হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের জন্য আরও কিছু নতুন নির্দেশনা ও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
খবরটি সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো—কখনো টাঙ্গুয়ার হাওর যাইনি। ভবিষ্যতে যদি সত্যিই কোনো দিন সেখানে ভ্রমণে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের অনেকটাই হয়তো আমার অদেখা থেকে যাবে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই যাওয়ার ইচ্ছাটা আরও প্রবল হয়ে উঠল।
পরদিন সকালে অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলাম। আমরা সবাই ঢাকার কেরানীগঞ্জের নয়াবাজার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা মাত্র শেষ হয়েছে। সামনে খাতা দেখা, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের ব্যস্ততা। সব কাজ গুছিয়ে ফলাফল প্রকাশের পর ৬ তারিখ রাতে টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
ব্যস্ততা ও দায়িত্বের চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত হয়ে নিজেদের সময় দেওয়া, নতুন উদ্যমে কাজে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া এবং দীর্ঘদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে সহকর্মীদের সঙ্গে কিছু আনন্দঘন সময় কাটানো—এই ছিল আমাদের ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য।
আমার একটা অভ্যাস আছে, নতুন কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে জায়গাটি সম্পর্কে যতটা সম্ভব জেনে নেওয়া। কোথায় কী আছে, আশপাশে দর্শনীয় স্থান কোনগুলো, যাতায়াতব্যবস্থা কেমন, কোথায় কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে—এসব আগে থেকেই জানার চেষ্টা করি। বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপের ভিডিও দেখি, ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতা ও রিভিউ পড়ি। উদ্দেশ্য একটাই, ভ্রমণের সময় যেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়তে না হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো জায়গা যেন বাদ না পড়ে।
যাত্রার শুরুতেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা
অবশেষে এল কাঙ্ক্ষিত দিন। নয়াবাজার উচ্চবিদ্যালয়ের ২৬ জন শিক্ষক একসঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশে রওনা দিলাম।
ছাতা, রেইনকোট, লুঙ্গি, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ফার্স্ট এইড বক্স—বর্ষাকালের ভ্রমণ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আগেই গুছিয়ে নিয়েছিলাম।
কদমতলী পৌঁছে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কেউ হালকা নাশতা সেরে নিলেন, কেউ বাসে খাওয়ার জন্য খাবার কিনে নিলেন। কিছুক্ষণ পর বাস এল। সবাই যাঁর যাঁর নির্ধারিত আসনে বসে পড়লাম।
এরই মধ্যে আমাদের সঙ্গে আরও ১৪ জনের একটি দল যোগ দিল। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, তারা সবাই আমাদের নয়াবাজার উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি ২০২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মিলনে মুহূর্তেই বাসের পরিবেশ হয়ে উঠল প্রাণবন্ত।
হাসি-ঠাট্টা, স্মৃতিচারণা, গল্প আর হইহুল্লোড়ে বাস ছুটে চলল হাওরের পথে।
ট্রাফিক জ্যামে বাস থামলেও আড্ডা থামেনি। কিন্তু হঠাৎই আনন্দের পরিবেশে ছন্দপতন ঘটল।
বাসের ভেতর থেকে এক ছাত্র চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার, আমার মোবাইল!’
বুঝতে বাকি রইল না, সুযোগ বুঝে কেউ একজন তার মোবাইল নিয়ে পালিয়েছে। দ্রুত বাস থেকে নেমে ছিনতাইকারীকে ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।
ব্যর্থ হয়ে বাসে ফিরে ছেলেটিকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন মন খারাপ করে লাভ নেই; সামনে দীর্ঘ ভ্রমণ, আনন্দ করার চেষ্টা করো। তার বন্ধুরাও তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে স্বাভাবিক করা গেল না। একপর্যায়ে সে সবার চোখ এড়িয়ে বাস থেকে নেমে চলে গেল।
ছেলেটি চলে যাওয়ার পর পুরো বাসে নেমে এল নীরবতা। কিছুক্ষণ আগেও যে বাস হাসি-আনন্দে মুখর ছিল, সেখানে যেন হঠাৎ বিষণ্নতার ছায়া।
তবে পথ কারও জন্য থেমে থাকে না। সে চলে তার আপন গতিতে। আমাদের বাসও ছুটে চলল তার আপন গতিতে।
দীর্ঘ নীরবতার পর হঠাৎ রাশেদ উল হক স্যার গান গাইতে শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে ধীরে ধীরে অন্যরাও যোগ দিলেন। আবার শুরু হলো গান, গল্প, আড্ডা আর হাসি। একসময় বাস ফিরে পেল তার আগের প্রাণচাঞ্চল্য।
মাঝপথে যাত্রাবিরতি হলো। কেউ চা খেলেন, কেউ নাশতা করলেন, কেউ একটু হাঁটাহাঁটি করলেন। এরপর আবার সবাই বাসে উঠে বসলাম।
রাত তখন গভীর। জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আকাশের তারা দেখছিলাম। মৃদু বাতাস এসে শরীর-মন শীতল করে দিচ্ছিল। দূরপাল্লার বাসের একটানা ছুটে চলা, অন্ধকার পথ আর মাথার ওপর তারাভরা আকাশ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্য রকম এক আবেশ। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বুঝতেই পারিনি।
সকালে সুপারভাইজারের ডাকে ঘুম ভাঙল। নামাজের বিরতিতে বাস থামল। সবাই নামাজ আদায় করে আবার নিজ নিজ আসনে ফিরে এলাম। সকালের মিষ্টি রোদ উপভোগ করতে করতে চলতে লাগল বাস।
সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে দীর্ঘ যাত্রার অবসান হলো। পৌঁছে গেলাম সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের দ্বারপ্রান্তে।
দীর্ঘ পথের ক্লান্তি তখন আর কারও চোখেমুখে নেই। সামনে অপেক্ষা করছে জল, পাহাড়, মেঘ আর প্রকৃতির এক বিশাল বিস্ময়।
জল যেখানে আকাশের আয়না
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মপাশা অঞ্চলে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাভূমি। প্রায় ৯ হাজার ৫০০ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই হাওর ২০০০ সালে আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি হিসেবে রামসার সাইটের স্বীকৃতি পায়।
বর্ষা এলে টাঙ্গুয়ার হাওর যেন তার চেনা রূপ বদলে ফেলে। চারপাশের বিস্তীর্ণ জলাভূমি পানিতে ভরে ওঠে, দিগন্তজুড়ে তখন শুধু জল আর জল। নীল আকাশের মেঘের ছায়া এসে পড়ে সেই জলে, দূরের পাহাড়ের অবয়ব মিশে যায় পানির আয়নায়। কোথাও নৌকা ছুটে চলে, কোথাও জেলেরা মাছ ধরেন, আবার কোথাও বাতাসের দোলায় পানির ওপর তৈরি হয় ছোট ছোট ঢেউ।
মনে হয় আকাশ যেন নেমে এসেছে হাওরের জলে, আর সেই জলের বুকেই ভেসে চলেছে মেঘ, পাহাড় আর মানুষের জীবন।
আমরা ছিলাম ৪০ জনের একটি দল। সাহেববাড়ী ঘাট থেকে একটি হাউসবোট নিয়ে শুরু হলো আমাদের হাওর অভিযান।
আমাদের হাউসবোটটি পানির বুক চিরে এগিয়ে চলল। মনে হচ্ছিল এই যাত্রার কোনো নির্দিষ্ট রাস্তা নেই। সামনে শুধু জল, আর সেই জলের ওপরেই আমাদের পথ। দুই পাশে শুধু পানি। দূরে মেঘালয়ের পাহাড়। মাথার ওপর মেঘ। কখনো বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে সবাইকে, আবার কিছুক্ষণ পরই মেঘ সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে সূর্য।
নৌকাতেই সকালের নাশতা সেরে নিলাম। এরপর নৌকার ছাদে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চারপাশের প্রকৃতি দেখছিলাম। কেউ গল্পে মেতেছেন, কেউ প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করছেন। আর আমি ফাঁকে ফাঁকে প্রকৃতি, সহকর্মী ও ভ্রমণের মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় বন্দী করতে ব্যস্ত।
হাওরের আরও গভীরে পৌঁছাতেই চারপাশ যেন বদলে গেল। যত দূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কোথাও জেলে মাছ ধরছেন, কোথাও ছুটে চলছে নৌকা, কোথাও পানির ওপর ভেসে আছে জলজ উদ্ভিদ। কোথাও বালুচরে দাঁড়িয়ে আছে গাধা কিংবা গরু।
দূরে মেঘালয়ের পাহাড় কখনো মেঘে ঢাকা পড়ছে, আবার কখনো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নীল আকাশের নিচে পাহাড় আর জলরাশির এই মেলবন্ধন মনে হচ্ছিল প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা ছবি।
মনে হচ্ছিল আমরা নৌকায় বসে নেই—আকাশের নিচে বিশাল কোনো আয়নার ওপর ভেসে চলেছি।
ওয়াচ টাওয়ারে হাওরের অন্য রূপ
টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ওয়াচ টাওয়ার। বড় নৌকা থেকে নেমে স্থানীয় ছোট নৌকায় করে রওনা দিলাম সেখানে।
নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে যাঁরা সাঁতার জানেন না, তাঁদের লাইফ জ্যাকেট পরতে বলা হলো। নৌকা যখন ওয়াচ টাওয়ারের কাছে পৌঁছাল, তখন চারপাশের দৃশ্য আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠল।
টাওয়ারের ওপর উঠতেই হাওরকে মনে হলো একেবারে নতুন কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি।
নিচে নীলচে জলরাশি, তার ওপর ছুটে চলা নৌকা, চারপাশে সবুজের বিস্তার আর দূরে পাহাড়ের সারি। উঁচু থেকে নৌকাগুলোকে মনে হচ্ছিল পানির ওপর ভেসে থাকা ছোট ছোট বিন্দু।
কেউ পানিতে নামলেন, কেউ গাছে উঠে পানিতে ঝাঁপ দিলেন, কেউ আবার ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। স্থানীয় মাঝির সঙ্গে গল্প জমালেন অনেকে।
আমাদের মাঝিও আপন মনে হাওরের গল্প বলছিলেন। কথার ফাঁকে তিনি বললেন, ‘মামারা, নিচ থেইকা হাওর যেইরকম দেখা যায়, উঁচু থেইকা কিন্তু হেইরকম না। ওয়াচ টাওয়ারের ওপরে উঠলে চারদিকে খালি পানি আর পানি, দূরে পাহাড় আর আকাশ—দেইখা মনডাই জুড়াই যায়। বিশেষ কইরা বিকেলের দিকে যখন রোদডা পশ্চিমে হাইলা পড়ে, তহন হাওরের পানি আর আকাশের রং বদলাইয়া যায়।’
মাঝির কথাগুলো আমাদের পরিকল্পনাই বদলে দিল। সিদ্ধান্ত হলো বিকেলের শেষ আলোয় আবার ওয়াচ টাওয়ারে উঠব।
দুপুরের খাবার নৌকাতেই সেরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অবশেষে বিকেলের সেই মুহূর্ত এল।
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তেই জল আর আকাশের রং বদলে যেতে শুরু করল। কখনো নীল, কখনো সোনালি, আবার কখনো লালচে আভায় রাঙা হয়ে উঠল চারপাশ।
দূরের পাহাড়গুলো মনে হচ্ছিল ছবির ক্যানভাসে আঁকা কোনো নীরব দৃশ্য। বিশাল জলরাশি হয়ে উঠেছিল সেই ছবির আয়না।
ওয়াচ টাওয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কেউ কথা বলিনি। শুধু দেখছিলাম। সত্যিই, কিছু সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখা যায় না—হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।
হাউসবোটে রাত, আকাশভরা তারা
দিনভর হাওরের জল, পাহাড়, মেঘ আর প্রকৃতি ঘুরে সন্ধ্যা নামতেই আমাদের হাউসবোট যাত্রা শুরু করল টেকেরঘাটের উদ্দেশে।
দিনের শেষ আলো তখন পশ্চিম আকাশে মিশে যাচ্ছে। সূর্যের কমলা আভা পানির ওপর তৈরি করছিল আলোর চিকচিকে পথ। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল। দিনের আলোয় যে হাওর ছিল উচ্ছল ও বিস্তীর্ণ, অন্ধকার নামতেই সেটি হয়ে উঠল গভীর ও রহস্যময়। দূরের পাহাড়গুলো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। হাউসবোটের ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ আর পানিকে কেটে এগিয়ে যাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ ছাড়া চারপাশে তেমন কোনো শব্দ নেই।
একসময় মাঝি নিরাপদ জায়গায় হাউসবোট নোঙর করালেন। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই নীরবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল বিশাল জলরাশির মাঝখানে আমরা একটি ছোট্ট ঘরে ভেসে আছি।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলছিল অসংখ্য তারা। শহরের আলো থেকে বহু দূরে থাকায় সেদিন আকাশটাকে যেন একেবারেই নতুন মনে হচ্ছিল। কোথাও একা একটি তারা, কোথাও দল বেঁধে অগণিত আলোর বিন্দু। মনে হচ্ছিল কালো আকাশের বিশাল ক্যানভাসে কেউ মুঠো মুঠো রুপালি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।
হাউসবোটের ছাদে একে একে সবাই উঠে এলাম। কেউ গল্প করছেন, কেউ গান গাইছেন, কেউ ছবি তুলছেন। কেউ আবার নীরবে তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে।
তারাভরা আকাশ ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা চলল। কিন্তু যতবার ছবি তুলছিলাম, ততবারই মনে হচ্ছিল—এই বিশাল আকাশকে ছোট্ট একটি মোবাইলের ফ্রেমে বন্দী করা যায় না। কিছু দৃশ্য ছবি হয়ে ওঠে না। সেগুলো শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে।
এরপর শুরু হলো বারবিকিউয়ের আয়োজন। চারপাশের অন্ধকারের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠতেই পরিবেশ বদলে গেল। গ্রিলের ওপর মাংস সেঁকার ঘ্রাণ, ধোঁয়ার মৃদু গন্ধ, বন্ধুদের হাসি আর তারাভরা আকাশ—সব মিলিয়ে হাওরের নীরব রাতটাও যেন প্রাণ ফিরে পেল।
পরে হাউসবোটের ছাদেই রাতের খাবারের আয়োজন হলো। মাথার ওপর খোলা আকাশ, চারপাশে অন্ধকার হাওর আর নিচে পানির মৃদু ঢেউয়ে দুলতে থাকা হাউসবোট—এমন পরিবেশে সাধারণ খাবারও অসাধারণ মনে হচ্ছিল।
ডিনারের পর আবার শুরু হলো আকাশ দেখা। কেউ হেলান দিয়ে বসে, কেউ শুয়ে শুয়ে তারা দেখছে। কেউ গান গাইছে, বাকিরা তাতে সুর মিলিয়ে দিচ্ছে। কেউ–বা চা কিংবা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রকৃতি উপভোগ করছে। এসবের মধ্যে কখন যে ছাদেই ঘুমিয়ে যাই, টেরই পাইনি।
ভোরে দূর থেকে ভেসে আসা মুয়াজ্জিনের সুললিত আজানে ঘুম ভাঙল। নামাজ আদায় করে ফিরে দেখি সকালের নাশতা, চা ও কফি প্রস্তুত। সবাই একসঙ্গে নাশতা সেরে নিলাম। আর আমাদের হাউসবোটও তখন এগিয়ে চলেছে নতুন গন্তব্যের দিকে—টেকেরঘাট।
সেই রাতটি যেন আমাদের একটি ছোট্ট শিক্ষা দিয়ে গেল—জীবনে আনন্দ খুঁজে পেতে সব সময় অনেক কিছু দরকার হয় না। কয়েকজন প্রিয় মানুষ, একটি হাউসবোট, কিছু গল্প-হাসি, সামান্য খাবার আর তারাভরা একটি আকাশই কখনো কখনো যথেষ্ট।
টেকেরঘাটে পাহাড় ও জলের মেলবন্ধন
টাঙ্গুয়ার হাওরের জলপথ পেরিয়ে পৌঁছালাম সীমান্তবর্তী টেকেরঘাটে। একসময় চুনাপাথর উত্তোলনকে ঘিরে কর্মচঞ্চল ছিল এই এলাকা। সেই পুরোনো খনি এলাকার স্মৃতি এখনো ছড়িয়ে আছে। তবে শিল্পাঞ্চলের সেই ব্যস্ততা হারিয়ে গিয়ে প্রকৃতিই যেন জায়গাটির নতুন পরিচয় হয়ে উঠেছে।
টেকেরঘাটে দাঁড়ালে একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে জল—মাঝখানে মানুষ। পাহাড় আর হাওরের এই মেলবন্ধন জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা রূপ।
নীলাদ্রি লেকের নীল মায়া
টেকেরঘাটের পুরোনো চুনাপাথরের খনি এলাকায় অবস্থিত নীলাদ্রি লেক। স্থানীয়ভাবে এটি টেকেরঘাটের নীল পানির লেক নামেও পরিচিত। প্রথম দেখাতেই চোখ আটকে যায় পানির রঙে।
পাহাড়ের মাঝখানে নীলচে জল, ওপরে স্বচ্ছ আকাশ আর চারপাশে নীরব পাহাড়—মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের হাতে ছবি এঁকে রেখেছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বুঝলাম, সৌন্দর্য শুধু পানির রঙে নয়। পাহাড়, আকাশ, মেঘ ও পানির সম্মিলিত দৃশ্যই নীলাদ্রির আসল আকর্ষণ।
লাকমাছড়ায় পাহাড়ি জলের গান
নীলাদ্রি থেকে আমরা এগিয়ে গেলাম লাকমাছড়ার দিকে। বর্ষায় পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে যায়। চারপাশে সবুজ পাহাড়, পাথরের স্তর আর তার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ঠান্ডা পানি—সব মিলিয়ে এক অন্য রকম পরিবেশ।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে ঝরনার শব্দ। শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে শুধু পানির শব্দ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজের জন্য একটি সংগীত তৈরি করেছে।
পাথরের ওপর বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পরে ঝরনার পানিতে নেমে হাত-মুখ ধুয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। কখন যে ভ্রমণের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল, টেরই পেলাম না।
তবে বর্ষায় পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিও থাকে। পাথর পিচ্ছিল হয়ে যায়, পানির স্রোত হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। তাই আনন্দের পাশাপাশি সতর্কও থাকতে হয়।
লালঘাটে পাহাড়ের বুক চিরে জলধারা
লাকমাছড়া ঘুরে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য লালঘাট। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা জলধারা। পাথরের স্তর, সবুজ পাহাড় আর বয়ে চলা পানি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় নিরিবিলি এক পরিবেশ।
বর্ষায় পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে ঝরনাগুলো আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পাথরের ওপর স্রোতের ছুটে চলা আর পানির শব্দ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি এখানে কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই নিজের সৌন্দর্য সাজিয়ে রেখেছে।
বারেক টিলা—সীমান্তের ওপারে পাহাড়ের হাতছানি
টেকেরঘাটের পাহাড়ি সৌন্দর্য পেছনে ফেলে এবার আমাদের যাত্রা বারেক টিলার দিকে।
টিলায় উঠে চোখ আটকে যায় দূরের পাহাড়ের সারিতে। সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো নীলচে আবছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে বাংলাদেশের সবুজ সমতলভূমি, অন্যদিকে মেঘালয়ের পাহাড়। মাঝখানে যেন প্রকৃতি নিজেই টেনে দিয়েছে এক অদৃশ্য রেখা।
টিলার ওপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে পুরো দৃশ্যটিকে মনে হয় বিশাল এক ক্যানভাস—বিস্তীর্ণ মাঠ, ছড়িয়ে থাকা গ্রাম, সবুজের সমারোহ আর তার ওপরে নীল আকাশ।
বারেক টিলায় দাঁড়িয়ে তখন মনে হচ্ছিল, ভ্রমণ মানেই শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়; কখনো কখনো একটি জায়গা থেকে নিজের দেশকে নতুন করে দেখাও ভ্রমণের অংশ।
শিমুলবাগান—ফুল না থাকলেও সৌন্দর্য থাকে
বারেক টিলার মুগ্ধতা সঙ্গে নিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম শিমুলবাগানের দিকে। সারিবদ্ধ শিমুলগাছের কারণে জায়গাটির আলাদা পরিচিতি রয়েছে। শীতের শেষভাগ থেকে বসন্তের শুরুতে শিমুলফুল ফুটলে পুরো বাগান টকটকে লাল হয়ে ওঠে। যেহেতু আমাদের ভ্রমণের সময় ছিল বর্ষাকাল। তাই লাল ফুলের সেই কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য আমরা দেখতে পারিনি।
তবু হতাশ হওয়ার মতো কিছু ছিল না। সবুজে ঘেরা গাছ, নীল আকাশ, মেঘ আর বর্ষার স্নিগ্ধতা—ফুল না থাকলেও শিমুলবাগান তার সৌন্দর্য ধরে রেখেছে।
সেদিন বুঝলাম প্রকৃতি কখনো এক রূপে সুন্দর নয়। ঋতু বদলালে তার সাজও বদলায়, কিন্তু সৌন্দর্য থেকে যায়।
যাদুকাটা নদী—নামেই যার জাদু
শিমুলবাগানের সবুজ পেছনে ফেলে আমাদের শেষ গন্তব্য যাদুকাটা নদী। নামটির মধ্যেই যেন মায়া।
স্বচ্ছ পানি, সাদা বালু, ছড়িয়ে থাকা পাথর, দূরের পাহাড় আর খোলা আকাশ—সব মিলিয়ে নদীটির সৌন্দর্যই আলাদা।
নদীর তীরে দাঁড়াতেই মনে হলো, এতক্ষণে দেখা প্রকৃতির নানা রূপ যেন এখানে এসে এক ফ্রেমে মিলেছে।
স্বচ্ছ পানির নিচে পাথরগুলো পর্যন্ত দেখা যায়। পানির ওপর আকাশের নীল ছায়া। আর নদীর ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়।
শেষ বিকেলের আলোয় দৃশ্যটি আরও বদলে গেল। পশ্চিম আকাশের সোনালি আলো নদীর জলে পড়ে তৈরি করছিল ঝিকিমিকি। সাদা বালু, পাথর আর পাহাড়ে সেই আলো যেন প্রকৃতির ছবিতে শেষ তুলির আঁচড়।
সারা দিনের ভ্রমণের শেষে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে মনে হলো—টাঙ্গুয়ার হাওরের জল, টেকেরঘাটের পাহাড়, নীলাদ্রির নীল, লাকমাছড়ার ঝরনা, বারেক টিলার দিগন্ত, শিমুলবাগানের সবুজ আর যাদুকাটার স্বচ্ছ জল—সব মিলিয়েই আমাদের ভ্রমণ পূর্ণতা পেল।
শুধু প্রকৃতি নয়, হাওরের মানুষের গল্পও
টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু পাহাড়, পানি, মেঘ আর পাখির সৌন্দর্যের নাম নয়। এই বিশাল জলাভূমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা।
বর্ষায় নৌকাই হয়ে ওঠে তাঁদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। মাছ ধরা এখানকার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ পেশা। হাওরের জল ও মাছের ওপর বহু পরিবার নির্ভরশীল।
কৃষিও স্থানীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; পানি নেমে গেলে বিস্তীর্ণ জমিতে চাষাবাদ শুরু হয়। টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্য সম্পদ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার সম্পর্কও এই জলাভূমির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পর্যটনও এখন অনেক মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। নৌকার মাঝি, স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকান কিংবা পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনে পর্যটকদের উপস্থিতির প্রভাব রয়েছে।
নৌকায় ভেসে যেতে যেতে কোনো জেলেকে মাছ ধরতে দেখা, মাঝির বইঠার ছন্দে নৌকা এগিয়ে চলা কিংবা দূরের কোনো গ্রামে মানুষের দৈনন্দিন জীবন চোখে পড়া—এসব দৃশ্য টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্যকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
তখন বোঝা যায়, এই হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি একটি জীবন্ত জনপদ।
সভাপতি, কেরানীগঞ্জ বন্ধুসভা