আদি ল্যাংচার কুটিরে

শক্তিগড়ের বিখ্যাত ল্যাংচা মিষ্টিছবি: লেখক

কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন যাওয়ার পথে রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের বাস কিছু সময়ের জন্য থামল। চারপাশে সব ল্যাংচার দোকান! বিভিন্ন নামের শেষে ল্যাংচা। ল্যাংচা কুটির, ল্যাংচা বাড়ি, ল্যাংচা ভবন, ল্যাংচা নিলয়, ল্যাংচা ঘর, ল্যাংচা ধাম, আসল ল্যাংচা, ল্যাংচাখোর, আদি ল্যাংচাসহ বিভিন্ন নামে ৫০টির বেশি দোকান রয়েছে রাস্তার দুই পাশজুড়ে। বর্ধমানের কাছাকাছি শক্তিগড়। শক্তিগড় হাওড়া-বর্ধমান প্রধান লাইন এবং হাওড়া-বর্ধমান কর্ডের ওপর অবস্থিত একটি রেলওয়ে জংশন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পূর্ব বর্ধমান জেলায় অবস্থিত একটি শহরতলি।

মনে পড়ল শক্তিগড়ের বিখ্যাত ল্যাংচা মিষ্টির কথা। সেখানে মিষ্টি খেতে খেতে দোকানি দাদার সঙ্গে গল্প করি। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন খাবারের নাম জানেন এবং এসব খাবার খেতেও ইচ্ছুক। কখনো বাংলাদেশে না এলেও বেড়াতে এসে পদ্মার ইলিশ খাবেন বলে ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ততক্ষণে আমিও মজা করে ল্যাংচা মিষ্টির স্বাদ নিচ্ছি। আদি ও অকৃত্রিম স্বাদ! ল্যাংচার ছোট-বড় সাইজ রয়েছে।

আরও পড়ুন

যাহোক উপায় না দেখে বাসের হর্ন শুনে বাসে উঠতে হলো। ল্যাংচা ও দোকানির সঙ্গে স্মৃতিটুকু রয়ে গেল। ল্যাংচা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি মিষ্টি। এর স্বাদ ও গঠন গোলাপজাম মিষ্টির সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে। উপাদান ও আকৃতির দিক থেকে ভিন্ন। ল্যাংচা খোয়া/মাওয়া ও পনির/চেনা দিয়ে তৈরি করা হয়। ল্যাংচা মিষ্টি লেডি কেনিং, পান্তুয়া ও গোলাপজামের চেয়ে লম্বা এবং নলাকার আকৃতির হয়।

ল্যাংচা মিষ্টির শুরুর ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, একজন মহারাজা/জমিদার বর্ধমানের কোনো মিষ্টান্ন কারিগরকে বলেন যে তিনি ভাজা মিষ্টি খেতে চান। সেই কারিগর মহারাজাকে একরকম ভাজা মিষ্টি বানিয়ে দেন।

মিষ্টি খুবই সুস্বাদু হয়! যিনি ভাজা মিষ্টি তৈরি করেছিলেন তিনি ল্যাংড়া ছিলেন। ওনার সঙ্গে মিলিয়ে মিষ্টির নাম হয় ল্যাংচা। ল্যাংচা রসের মিষ্টি, এর রং গাঢ় লাল অথবা কালচে বাদামি হতে পারে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শক্তিগড়ের ল্যাংচা মিষ্টি শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশেই নয়, ওডিশা, বিহার, আসাম ও ত্রিপুরার মতো রাজ্যেও জনপ্রিয়। উপমহাদেশের অন্যান্য স্থানেও লাংচার প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশের ঝিনাইদহের ল্যাংচা মিষ্টির সুনাম রয়েছে।

ল্যাংচার দোকান। শক্তিগড়ে এমন বিভিন্ন নামে ৫০টির বেশি দোকান রয়েছে রাস্তার দুই পাশজুড়ে
ছবি: লেখক

ল্যাংচার মিষ্টির উৎপত্তিস্থল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। এর উৎপত্তি ও নামকরণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যালের ‘রূপমঞ্জরী’ উপন্যাসে বর্ণিত কাহিনিকে প্রামাণ্য ধরে সাংবাদিক গৌতম ধনী কৃষ্ণনগর ও বর্ধমানের রাজপরিবারের বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে ল্যাংচার উৎপত্তির ইতিহাস খোঁজার করার চেষ্টা করেছেন। প্রথম কত সালে ল্যাংচা বানানো হয়, তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেনি। তবে ১৯০০ থেকে ১৯১০ সালের ভেতরে প্রথম দোকান কৌশিক ঘোষের বাবার, যা জনশ্রুতি রয়েছে বলে জানা যায়। আবার ল্যাংচার উৎপত্তি হয়েছিল ক্ষুদিরাম দত্ত নামের একজন নবীন ব্যক্তির হাত ধরে। যিনি পরবর্তী সময়ে ল্যাংচা মহল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে একজন পঙ্গু (ল্যাংড়া বা বাংলায় ল্যাংচা) ব্রিটিশ অফিসারের ল্যাংচা মিষ্টির প্রতি দুর্বলতার কথাও মানুষের মুখে ছড়িয়ে রয়েছে।

ল্যাংচা তৈরি করা হয় ময়দা, দুধের গুঁড়া দিয়ে। ময়দা ও দুধের গুঁড়া সোডা ও পানির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে একটি ডো তৈরি করা হয়। ঘি মিশিয়ে ডো তৈরি করা হয় নিয়মিত বিরতিতে। ভালোভাবে মিশিয়ে, ডো কয়েক ঘণ্টার জন্য অপরিবর্তিত রাখা হয়। তারপর ডো হাত দিয়ে নলাকার আকৃতির টুকরায় ভাগ করা হয়।

নলাকার টুকরাগুলো তেলে ডুবিয়ে ভাজা হয়, যতক্ষণ না চারপাশে বাদামি রঙের খোসা তৈরি হয় এবং সেগুলো শক্ত হয়ে যায়। ভাজা নলাকার টুকরাগুলো তারপর চিনির সিরায় সেদ্ধ করা হয়। তৈরি হয়ে গেলে এগুলো আবার ঠান্ডা গোলাপের স্বাদযুক্ত বা এলাচি স্বাদযুক্ত চিনির সিরাযুক্ত একটি টবে ফিরিয়ে আনা হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে নাড়িয়ে রাখলে এই শক্ত টুকরাগুলো নরম ও রসালো হয়ে যায়। তখন ল্যাংচা প্লেটে পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত হয়।

শক্তিগড়ের হাইওয়ের যেকোনো দোকান থেকে ল্যাংচা মিষ্টির স্বাদ নিতে পারবেন। কলকাতা শহরে ল্যাংচা মিষ্টান্ন মিলবে, তবে শক্তিগড়ের ল্যাংচা স্বাদে ও মানে অনন্য। শক্তিগড় যেতে হলে কলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে শক্তিগড় স্টেশনে নামতে হবে। সময় প্রায় দুই ঘণ্টা লাগবে। ট্রেনের ভাড়া ২০ রুপি। এ ছাড়া বর্ধমানগামী যেকোনো বাসে চেপে শক্তিগড় যাওয়া যায়।

শক্তিগড়ের ল্যাংচা বাঙালির কাছে নস্টালজিয়ার প্রতীক। যার সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ ও উত্তম কুমারের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

মোহাম্মদপুর, ঢাকা