শ্রীলঙ্কায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ফেলো হিসেবে কীভাবে সুযোগ পেলাম

শ্রীলঙ্কা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততায় সিলন ইনস্টিটিউট অব বিল্ডার্স আয়োজিত ওয়ার্ল্ড কনস্ট্রাকশন সিম্পোজিয়ামে (ডব্লিউসিএস ২০২৬)ছবি: লেখকের সৌজন্যে

কলম্বোর পাঁচ তারকা হোটেল হিল্টনের সুবিশাল বলরুমে তখন বিশ্বের বড় বড় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের ভিড়। চারপাশে ভারী আলোচনা, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে ভেসে উঠছে টেকসই নগরায়ণের ভবিষ্যৎ রূপরেখা। সেই বিশাল আসরে নোটপ্যাড হাতে এক রুম থেকে আরেক রুমে দ্রুত পায়ে হেঁটে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন কয়েকজন তরুণ ফেলো, যাঁদের একজন ছিলাম আমি, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক প্রতিনিধি।

অনেকের কাছেই আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলনে যোগ দেওয়া মানেই বিশাল অঙ্কের বিমানভাড়া, থাকা-খাওয়ার হিসাব আর বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা। কিন্তু একাডেমিয়া আর প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের মেলবন্ধন যে কত বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে, শ্রীলঙ্কার মাটিতে টানা ২৩ দিনের এই অনন্য অভিজ্ঞতা তারই এক বাস্তব প্রমাণ।

একটি যোগাযোগ ও আস্থার গল্প
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত নানা প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কিং গড়ে ওঠে। শ্রীলঙ্কায় প্রতিবছর সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজিত হয়, যার মধ্যে দেশটির শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়োজন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তেমনই মর্যাদাপূর্ণ দুটি আসর হলো শ্রীলঙ্কা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততায় সিলন ইনস্টিটিউট অব বিল্ডার্স আয়োজিত ওয়ার্ল্ড কনস্ট্রাকশন সিম্পোজিয়াম (ডব্লিউসিএস ২০২৬) এবং দেশটির শীর্ষ সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রুহুনা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সিম্পোজিয়াম অন অ্যাডভান্সেস ইন সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং (এসিইপিএস ২০২৬)।

আয়োজকদের উদ্দেশ্য ছিল তরুণ গবেষকদের সরাসরি এই আন্তর্জাতিক মহাযজ্ঞের সঙ্গে জড়ানো। তাই তাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধানের কাছে চাওয়া হয় একজন প্রতিনিধির নাম। আন্তর্জাতিক মঞ্চের এমন গুরুদায়িত্ব সামলাতে প্রয়োজন ছিল একাডেমিক বোঝাপড়ার পাশাপাশি চমৎকার কমিউনিকেশন দক্ষতা। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পুরকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান এস এম সাজ্জাদ আহমেদ শোভন আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ করেন কনফারেন্সের কো-চেয়ার প্রফেসর ড. অনুরাধা ওয়াইদ্যাসেকারা ও প্রফেসর টি এন বিক্রমায়ারাচ্চির কাছে।

পরবর্তীকালে বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর ওমর ফারুক এবং আইকিউএসির (আইকিউএসি) পরিচালক সিরাজুল ইসলাম প্রধানের মাধ্যমে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নজরে আসে। তিনি দারুণ উৎসাহ নিয়ে পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করেন। আস্থার সেই মেলবন্ধনেই খুলে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দরজা।

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

টাকা নয়, যোগ্যতাই যখন পাসপোর্ট
সম্পূর্ণ বিনা খরচে এই সুযোগ কীভাবে বাস্তবে রূপ নিল? আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সাধারণত আয়োজকেরা নির্বাচিত ‘স্টুডেন্ট ফেলো’ বা ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট’দের যাবতীয় খরচ ও স্থানীয় আতিথেয়তার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করে। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা যুক্ত হওয়ায় আমার নিজের কোনো খরচ করতে হয়নি। বড় অঙ্কের খরচের চিন্তা দূরে ঠেলে বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার এক দ্বার উন্মোচিত হয়।

সমান্তরাল রুম, টানটান ব্যস্ততা ও শ্রীলঙ্কান আতিথেয়তা
শ্রীলঙ্কায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় আসল রোমাঞ্চ। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ছয়-সাত শ গবেষক, বিজ্ঞানী, খ্যাতনামা প্রফেসর, লেকচারার এবং শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির কর্ণধার ও নীতিনির্ধারকদের পদচারণে মুখর ছিল পুরো প্রাঙ্গণ। এমন এক সুবিশাল আয়োজনে আয়োজক কমিটির কো-চেয়ার প্রফেসর ড. অনুরাধা ওয়াইদ্যাসেকারা চারজন আন্তর্জাতিক ফেলোকে যুক্ত করেন মূল কার্যক্রমে। চীন, জাপান, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশ থেকে আসা আমিসহ চার তরুণের কাঁধে পড়ে এক বিশাল দায়িত্ব।

একই ছাদের নিচে ছয় থেকে সাতটি রুমে তখন একসঙ্গে চলছিল সমান্তরাল টেকনিক্যাল সেশন। গবেষক, একাডেমিশিয়ান ও ইন্ডাস্ট্রি লিডারদের উপস্থাপিত জটিল বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধগুলোর গভীর পর্যবেক্ষণ আয়োজক কমিটির একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে আমাদের চার ফেলোকে আলাদা আলাদা রুমের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমাদের কাজ ছিল প্রতিটি প্রেজেন্টেশন নিখুঁতভাবে শোনা, জটিল বৈজ্ঞানিক ও প্রায়োগিক আলোচনার মূল দিকগুলো টুকে রাখা এবং সামগ্রিক সেশনের ওপর বিশ্লেষণধর্মী টেকনিক্যাল রিপোর্ট তৈরি করা।

সেই ব্যস্ততার মধ্যেই শ্রীলঙ্কান সংস্কৃতির উষ্ণ আতিথেয়তা পুরো আবহে এনে দিয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। কনফারেন্সের গাম্ভীর্যের ফাঁকে ফাঁকে প্রতি ৪০ মিনিট পরপর সুগন্ধি চা-কফির ধোঁয়া আর স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী স্বাদের বুফে আহার-ক্লান্তি দূর করে পুরো অভিজ্ঞতাকে পরিণত করেছিল এক প্রাণবন্ত উৎসবে।

২২তম দিনের চূড়ান্ত স্বীকৃতি
সম্মেলনের মূল কাজের বাইরে আরও সুযোগ মিলেছিল প্রফেসর অনুরাধার সহকারী হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘শ্রীলঙ্কা সাসটেইনেবিলিটি অ্যাওয়ার্ড শো’র মঞ্চে সরাসরি উপস্থিত থাকার।

টানা ২২ দিনের পরিশ্রম ও গভীর বিশ্লেষণের পর শেষ দিনে আয়োজক কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয় সেশনগুলোর বিস্তারিত টেকনিক্যাল রিপোর্ট। আয়োজকদের একটি বিশেষজ্ঞ দল পুরো রিপোর্টটি চুলচেরা যাচাই ও মূল্যায়ন করে। পরবর্তীকালে এক বর্ণাঢ্য ডিনার অনুষ্ঠানে সেই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করা হয় এবং আয়োজকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও স্বীকৃতি। শিক্ষার্থীদের এমন বৈশ্বিক অর্জন ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগের কথা পরবর্তীকালে বিভিন্ন ফোরামে ও সংবাদমাধ্যমেও ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ সংসদের পরিচালক শাহ আলম চৌধুরী।

আরও পড়ুন

তরুণদের জন্য সহজ পাঠ
শ্রীলঙ্কার এই বিশাল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাওয়ার পর বারবার মনে হয়েছে, এমন প্ল্যাটফর্মে আমার আরও অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। তাই শিক্ষার্থীদের বলব-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই লক্ষ্য স্থির করুন যে আপনি কোন নির্দিষ্ট সেক্টর বা গবেষণার বিষয়ে কাজ করতে চান।

এরপর সেই বিষয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখুন এবং তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্ভাবনী ও গবেষণাধর্মী আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করুন। পাশাপাশি কথা বলার জড়তা কাটিয়ে নিজের প্রেজেন্টেশন ও কমিউনিকেশন স্কিল ঝালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষকদের কাছে যখন আপনার একাডেমিক নিষ্ঠা, গবেষণার আগ্রহ এবং স্পষ্ট লক্ষ্য ধরা পড়বে, তখন তাঁরাই নিজ দায়িত্বে আপনাকে বিশ্বমঞ্চের আলোর ঠিকানায় পৌঁছে দেবেন।

বন্ধুসভার সদস্য ও শিক্ষার্থী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি