ইন্টার্নশিপে বেতন নেই, তবু কেন করবেন
শিক্ষাজীবনে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টার্নশিপ সেই সুযোগ তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে প্রয়োগ করা, পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন। তবে ইন্টার্নশিপের জন্য পারিশ্রমিক না পাওয়ার বিষয়টি অনেক শিক্ষার্থীর কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে পড়াশোনার পাশাপাশি যাঁদের নিজের বা পরিবারের খরচ চালাতে হয়, তাঁদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করা কঠিন।
শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইন্টার্নশিপ
বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ পান। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়, প্রতিষ্ঠান, জনগোষ্ঠী ও কাজের ধরন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জন করতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণই যথেষ্ট। কিন্তু এ বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। কারণ, তাত্ত্বিক জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে। এ বিষয়ে মার্কিন সাইকোলজির শিক্ষক অ্যাশলি মায়ার বলেন, ‘ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেন। পাশাপাশি কাজ করতে গিয়েও নতুন অনেক কিছু শেখার সুযোগ পান। ইন্টার্নশিপের উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের আগ্রহের বিষয়, প্রতিষ্ঠান, জনগোষ্ঠী ও কাজের ধরন সম্পর্কে ধারণা পান।’
এই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সমৃদ্ধ করতে, ভবিষ্যৎ পেশা বেছে নিতে এবং পরবর্তী পর্যায়ের পড়াশোনার জন্য প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে।
বিনা পারিশ্রমিকে কাজের চ্যালেঞ্জ
শিক্ষার্থীদের অনেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের জন্য নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং কাজের চাপ সামলানোই কঠিন। এর মধ্যে বিনা পারিশ্রমিকে ইন্টার্নশিপ করতে হলে আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। ফলে অনেকেই ইন্টার্নশিপের প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও এতে অংশ নিতে আগ্রহী হন না।
এ পরিস্থিতিতে ইন্টার্নশিপের সময় শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠানে এই উদ্যোগ চালু হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাড়লে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা কমতে পারে।
অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি পাওয়া কঠিন কেন
কর্মজীবনের শুরুতে নতুন স্নাতকদের একটি সাধারণ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে প্রাথমিক পর্যায়ের পদ উল্লেখ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। কিন্তু সদ্য পড়াশোনা শেষ করা একজন প্রার্থীর পক্ষে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করা সহজ নয়।
এই পরিস্থিতিতে ইন্টার্নশিপ কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হন, কাজের দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা পান এবং নিজেদের দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ পান।
কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে অ্যাশলি মায়ার বলেন, ‘নিয়োগদাতারা সাধারণত এমন প্রার্থী খোঁজেন, যাঁদের কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। জীবনবৃত্তান্তে কোনো কাজ করার অভিজ্ঞতা উল্লেখ থাকলে প্রার্থীর দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত, সুযোগ অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করা।’
ইন্টার্নশিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পেশাগত যোগাযোগ তৈরি করা। এ সময় শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, তাঁদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন এবং ভবিষ্যতে কর্মজীবনে কাজে লাগতে পারে—এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।
ইন্টার্নশিপ আর চাকরি এক নয়
ইন্টার্নশিপ করতে গিয়ে যদি কোনো শিক্ষার্থীর মনে হয়, তিনি শুধু বিনা পারিশ্রমিকে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, ইন্টার্নশিপের মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পন্ন করা নয়; বরং শিক্ষার্থীর শেখা, দক্ষতা অর্জন ও পেশাগত বিকাশ নিশ্চিত করা।
ইন্টার্নশিপে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান—উভয় পক্ষেরই উপকার হতে পারে। তবে কাজের পাশাপাশি শেখার সুযোগ থাকা জরুরি। এ কারণে অনেক ইন্টার্নশিপে শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লিখিত প্রশিক্ষণ চুক্তি থাকে। এতে সাধারণত প্রশিক্ষণের লক্ষ্য, কাজের ধরন এবং শিক্ষার্থীর দায়িত্ব উল্লেখ করা হয়। ইন্টার্নদের নিয়মিত কর্মীর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করে তাঁদের শেখার সুযোগ নিশ্চিত করাই এ ধরনের ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
কোনো বিষয় সম্পর্কে শ্রেণিকক্ষে শেখা আর বাস্তবে সেটি প্রয়োগ করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সমস্যার ধরন বুঝতে পারেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং নিজেদের দক্ষতার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে পারেন।
বাধ্যবাধকতা নয়, শেখার সুযোগ
ইন্টার্নশিপকে শুধু শিক্ষাজীবনের একটি বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। বরং একে শেখা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করলে শিক্ষার্থীরা এর সুফল আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন শিক্ষাক্রমের প্রয়োজনীয় একাডেমিক ক্রেডিট অর্জন করা যায়, অন্যদিকে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাও পাওয়া যায়।
ভালো কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে ইন্টার্নশিপের একটি বিশেষ দিক হলো, এখানে শেখার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পায়।
সব ইন্টার্নশিপে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় না। তবে একটি কার্যকর ইন্টার্নশিপ শিক্ষার্থীর জীবনবৃত্তান্ত সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, দক্ষতা বিকাশে এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। তাই এটির মূল্য শুধু পারিশ্রমিক দিয়ে বিচার করা যায় না।