নিজেকে গড়ছেন, নাকি শুধু চাকরি খুঁজছেন

এখনো অনেকেই মনে করেন, একটি ভালো চাকরিই জীবনের সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ডছবি: এআই/বন্ধুসভা

একসময় একটি ভালো চাকরি ছিল জীবনের সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা—সবকিছুই যেন একজন তরুণ-তরুণীকে একটি চাকরির জন্য প্রস্তুত করত। কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির এই যুগে সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজ স্বাবলম্বিতা মানে শুধু চাকরি পাওয়া নয়; বরং নিজের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করছি?

প্রযুক্তি জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে অভূতপূর্ব সুযোগ। এখন একজন মানুষের সফল হতে রাজধানীতে থাকতে হয় না, বড় অফিসে বসতে হয় না কিংবা পরিচিত কোনো ব্যক্তির সুপারিশের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিজের দক্ষতাই হতে পারে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা এমন অসংখ্য মানুষের গল্প দেখি, যাঁরা একসময় ছিলেন একেবারেই সাধারণ। কেউ কৃষক, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ শিক্ষক, কেউ গৃহিণী। কিন্তু তাঁরা নিজেদের একটি বিশেষ দক্ষতাকে নিয়মিতভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। সেই ধারাবাহিকতাই তাঁদের পরিচয়, জনপ্রিয়তা এবং আয়ের নতুন পথ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশেও এর উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে। চিত্ত মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার আহসান হাবীব দেখিয়েছেন, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমকে একত্র করলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কীভাবে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হতে পারে। একইভাবে দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণী আজ ইউটিউব, ফেসবুক, অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, কৃষি উদ্যোক্তা, বই পর্যালোচনা কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতি তুলে ধরে নিজেদের কর্মক্ষেত্র নিজেরাই তৈরি করছেন। তাঁরা চাকরির জন্য অপেক্ষা করেননি; বরং নিজেরাই কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছেন।

এখানেই সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি লুকিয়ে আছে। দুঃখজনকভাবে আজকের অনেক তরুণ-তরুণী প্রস্তুতির চেয়ে ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজেকে গড়ে তোলার আগেই বড় আয়, বিলাসী জীবন, দামি মোবাইল ফোন, ব্র্যান্ডের পোশাক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কৃত্রিম জীবন প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় তাঁরা জড়িয়ে পড়ছে। অথচ বাস্তবতা হলো—প্রত্যেক সফল মানুষের জীবনে এমন একটি সময় ছিল, যখন তিনি নীরবে নিজেকে তৈরি করেছেন। সেই সময়টুকু বাইরে থেকে কেউ দেখেনি, কিন্তু সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ঠিক তখনই।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমি দ্রুত কিছু করতে চাই’। কিন্তু প্রশ্ন হলো—নিজেকে কি সেই কাজের জন্য প্রস্তুত করেছি?

একজন চিকিৎসক হতে যেমন বছরের পর বছর পড়াশোনা করতে হয়, একজন গবেষককে যেমন অসংখ্য ব্যর্থতা মেনে নিতে হয়, একজন উদ্যোক্তাকে যেমন লোকসান, হতাশা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়, তেমনি একজন সফল কনটেন্ট নির্মাতা, প্রশিক্ষক কিংবা অনলাইন উদ্যোক্তার পেছনেও থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি। কোনো সাফল্যই হঠাৎ করে আসে না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক শিক্ষার্থী এখন প্রস্তুতির সময়টাকেই সবচেয়ে বেশি অপচয় করছেন। যে সময় বই পড়ার, নতুন দক্ষতা অর্জনের, ভাষা আয়ত্ত করার, প্রযুক্তি ব্যবহারের কৌশল শেখার কিংবা নিজের চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করার; সেই সময়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, অন্যের জীবন দেখে নিজেকে ছোট ভাবা কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায়।

আমাদের সময়ে পরিবারে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল। ভোরে পড়তে বসা, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসা, নিয়মিত জীবনযাপন—এসব অভ্যাস একজন মানুষকে আত্মশৃঙ্খলা শিখিয়েছে। সময় বদলেছে, জীবনযাত্রাও বদলেছে; কিন্তু আত্মশৃঙ্খলার কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি। প্রযুক্তি বদলেছে, সফলতার মূলনীতি বদলায়নি।

আরও একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির প্রতারক সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, অর্থ আত্মসাৎ, অনৈতিক শর্ত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের হয়রানি করা হচ্ছে। বিশেষ করে অনেক তরুণী চাকরির আশায় প্রতারণা, মানসিক নির্যাতন, এমনকি আত্মসম্মানহানিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। জীবনের স্বপ্নকে পুঁজি করে কেউ যেন তাঁদের দুর্বলতার সুযোগ নিতে না পারে, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

একই সঙ্গে তরুণদেরও একটি বিষয় বুঝতে হবে—দক্ষতা যত বাড়বে, আত্মনির্ভরতা তত বাড়বে; আত্মনির্ভরতা যত বাড়বে, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তত কমবে। যোগ্য মানুষকে হয়তো সংগ্রাম করতে হয়, কিন্তু তাঁকে দীর্ঘদিন অবহেলা করে রাখা যায় না।

আরও পড়ুন

সমাজে আরেকটি অসুস্থ প্রবণতা তৈরি হয়েছে—সাফল্যের চেয়ে সাফল্য প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। দামি মোবাইল, ব্র্যান্ডের পোশাক, বিলাসবহুল জীবন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো ছবি দেখে অনেক তরুণ মনে করেন, এটাই সফলতা। অথচ প্রকৃত সফল মানুষ জানেন, নিজের বিনিয়োগ প্রথমে হওয়া উচিত নিজের ওপর নিজের শিক্ষা, দক্ষতা, চরিত্র, যোগাযোগের ক্ষমতা এবং চিন্তার গভীরতার ওপর।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সংগ্রাম কোনো লজ্জার বিষয় নয়; বরং সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ। যে তরুণ কষ্টকে মেনে নিয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন, ভবিষ্যৎ তাঁর জন্যই অপেক্ষা করে।

আজ একজন কৃষক মাঠে কাজ করতে করতেই কবিতা আবৃত্তি করে লক্ষ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে পারেন। একজন গৃহিণী রান্নার ভিডিও দিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারেন। একজন শিক্ষক অনলাইনে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারেন। একজন গ্রামের তরুণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ঘরে বসেই কাজ করতে পারেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, পৃথিবী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত।

তাই আজকের শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে বড় আহ্বান—নিজেকে তৈরি করার সময়টাকে সম্মান করুন। এ সময়ে আয়ের চেয়ে শেখাকে গুরুত্ব দিন। কারণ, প্রস্তুতি ছাড়া অর্জন স্থায়ী হয় না। বীজ বপনের আগেই যেমন ফসল পাওয়া যায় না, তেমনি দক্ষতা অর্জনের আগেই সফলতা প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।

আমাদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম সীমিত সুযোগ নিয়েও অসীম পরিশ্রম করেছে। তাদের আগের প্রজন্ম আরও বেশি সংগ্রাম করেছে। মানুষের সাফল্যের সৌন্দর্য তাঁর অর্জনে নয়; বরং সেই অর্জনের পেছনের গল্পে। যে সাফল্যের পেছনে ঘাম নেই, ত্যাগ নেই, ব্যর্থতা নেই—সেই সাফল্য খুব বেশি দিন টেকে না।

এখনো সময় আছে। পরিবারকে সন্তানদের শুধু পরীক্ষার ফল নয়, দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে চাকরিপ্রার্থী নয়, সমস্যা সমাধানকারী মানুষ তৈরি করতে হবে। আর তরুণদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে হবে—আমি কি শুধু একটি চাকরি চাই, নাকি এমন একজন মানুষ হতে চাই, যার দক্ষতা অন্য মানুষের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে?

আমরা এমন একটি প্রজন্ম দেখতে চাই, যারা সুপারিশের অপেক্ষায় থাকবে না; বরং নিজের যোগ্যতায় পথ তৈরি করবে। যারা বাহ্যিক চাকচিক্যের মোহে নয়, আত্মমর্যাদা, সততা, জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। কারণ, ভবিষ্যৎ তাঁদেরই, যাঁরা সময়কে অজুহাত বানায় না; বরং সময়ের পরিবর্তনকে নিজের শক্তিতে পরিণত করে।

স্বাবলম্বিতার নতুন সংজ্ঞা তাই একটাই—নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে একদিন কাজকে খুঁজতে না হয়; কাজই আপনাকে খুঁজে নেয়।

সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়