প্রথম চাকরির যে অভ্যাসগুলো আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে

ক্লাসরুমের শেখা জ্ঞান আর করপোরেট–জীবনের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যাঁরা দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, তাঁরাই তুলনামূলক কম সময়ে এগিয়ে যানছবি : প্রথম আলো

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করে প্রথম চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। ক্লাসরুমের শেখা জ্ঞান আর করপোরেট–জীবনের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যাঁরা দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, তাঁরাই তুলনামূলক কম সময়ে এগিয়ে যান। অন্যদিকে সামান্য কিছু আচরণগত ভুল অনেক মেধাবীকেও পিছিয়ে দেয় অনেক দূর।

মানবসম্পদ বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে অসংখ্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আজ শেয়ার করব।

একজন নতুন সহকর্মী যোগ দেওয়ার পর লক্ষ করলাম, ডেস্কে বসেই অধিকাংশ সময় মুঠোফোন দেখছেন। মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত ফোন রিসিভ করছেন এবং সবার সামনেই উচ্চ স্বরে কথা বলছেন। হয়তো তাঁর কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এটি ধীরে ধীরে তাঁর সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছিল।

আরেকজনের গল্প ভিন্ন। যোগদানের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সহকর্মীদের ব্যক্তিগত আলোচনা অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে শুরু করেন। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্রুত ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, এতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া যাবে। বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা, সহকর্মীদের আস্থা হারিয়েছিলেন খুব অল্প সময়েই।

আবার একজন ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের। মেধাবী, দায়িত্বশীল, কিন্তু অত্যন্ত অন্তর্মুখী। প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলতেন না, দলীয় আলোচনায় অংশ নিতেন না। কাজ ভালো করলেও নিজেকে দৃশ্যমান করতে না পারায় তাঁর সক্ষমতা অনেকটাই আড়ালে থেকে যেত।

এই তিনটি ঘটনা আলাদা হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার করে। আর তা হলো—কর্মজীবনে শুধু মেধাই যথেষ্ট নয়; আচরণ, শৃঙ্খলা এবং পেশাদার মনোভাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মূলত প্রথম চাকরিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত, তা হলো শৃঙ্খলা। সময়মতো অফিসে আসা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা মেনে চলা, মার্জিত ও পরিপাটি পোশাক পরা এবং দায়িত্বশীল আচরণ। এসব অভ্যাস একজন কর্মীর পরিচয় গড়ে তোলে। প্রথম এক-দুই বছর এই অভ্যাসগুলো তৈরি করতে পারলে পরবর্তী পথচলা অনেক সহজ হয়ে যায়।

এরপর আসে যোগাযোগের দক্ষতা। করপোরেট অফিসে কেউ একা কাজ করে সফল হতে পারে না। তাই ভদ্রভাবে গুছিয়ে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহকর্মীদের সম্মান করা এবং নিজের মতামত বিনয়ের সঙ্গে প্রকাশ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গসিপ, পরনিন্দা, গ্রুপিং কিংবা অপ্রয়োজনীয় অফিস পলিটিকস থেকে দূরে থাকা উচিত। মনে রাখবেন, আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত আপনি বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষ।

নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দক্ষ, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে কর্মক্ষেত্রে সিনিয়রদের অভিজ্ঞতার মূল্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নতুন প্রযুক্তি বা এআই টুল সম্পর্কে জানলে সেটি কাউকে ছোট করার জন্য নয়; বরং পুরো দলের কাজ সহজ করার উদ্দেশ্যে শেয়ার করুন। সম্মান দিয়ে শেখানো এবং সম্মান নিয়ে শেখার মধ্যেই প্রকৃত পেশাদারত্ব।

আরও পড়ুন

আরেকটি অভ্যাস অবশ্যই করুন, নোট নেওয়ার অভ্যাস করুন। মিটিংয়ে একটি নোটবুক সঙ্গে রাখুন। কী কাজ করছেন, কখন শেষ করবেন, কোথায় আটকে আছেন—সব লিখে রাখুন। এটি শুধু কাজ গুছিয়ে করতে সাহায্য করে না, আপনার দায়িত্বশীলতাও প্রকাশ করে।

বর্তমান কর্মক্ষেত্রে এআই দ্রুত কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির পাশাপাশি এক্সেল, পাওয়ার বিআই, এআই টুলস, বিজনেস কমিউনিকেশন, প্রেজেন্টেশন স্কিলস এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন এখন আর অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়; বরং প্রয়োজনীয় দক্ষতা। প্রতি দুই-তিন মাসে অন্তত একটি নতুন কোর্স বা সার্টিফিকেশন সম্পন্ন করার অভ্যাস আপনার দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

নিজের পারসোনাল ব্র্যান্ড গড়ার কাজটিও শুরু করুন প্রথম চাকরি থেকেই। লিংকডইন প্রোফাইলটি আপডেট করে ফেলুন এবং সেখানে আপনার পেশা–সংশ্লিষ্ট প্রফেশনালদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করুন। আপনার অর্জনগুলো নথিভুক্ত করুন এবং অফিসে এমন একটি পরিচয় তৈরি করুন, যাতে সহকর্মীরা আপনার নাম শুনে প্রথমেই সততা, দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার কথা মনে করেন। মনে রাখবেন—পদবির চেয়ে এই সুনামই অনেক বেশি মূল্যবান।

সব শেষে একটি কথা। আপনার প্রথম চাকরি কখনোই আপনার শেষ গন্তব্য নয়। এটি শুধু একটি ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের পুরো ক্যারিয়ার তৈরি হবে। তাই শুরুতেই বেতন, পদবি বা সুযোগ-সুবিধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন নিজের নৈতিকতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং চরিত্র গঠনে। কারণ, করপোরেট–জীবনে মানুষকে শেষ পর্যন্ত মনে রাখা হয় শুধু তাঁর কাজের জন্য নয়, বরং তাঁর ব্যবহার, সততা এবং নির্ভরযোগ্যতার জন্য।

একটি ভালো শুরুই পারে একটি অসাধারণ ক্যারিয়ারের গল্প লিখতে।

লেখক: মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রফেশনাল এবং উপদেষ্টা, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা