কর্মক্ষেত্রে ‘না’ বলবেন কীভাবে?

হয়তো সম্পর্কের খাতিরে ‘হ্যাঁ’ বলে দেন; কিন্তু পরে নিজেই নিজেকে দোষ দেনছবি: এআই/বন্ধুসভা
কর্মক্ষেত্রে ‘না’ বলতে পারাটা একধরনের দক্ষতা, যা চর্চার মাধ্যমে শেখা যায়।

কর্মক্ষেত্রে একটা বিষয়ের সঙ্গে আমরা প্রায় সবাই কমবেশি পরিচিত। ধরুন, অফিসে আপনি নিজের কাজটা ঠিকঠাক করছেন। এর মধ্যেই একদিন কোনো একজন সহকর্মী, বিশেষ করে সিনিয়র কেউ বা বস এসে বলল, ‘আপনি এই কাজটাও করে দেন।’ আপনিও সামনাসামনি ‘না’ বলতে পারেননি, রাজি হয়ে গেলেন। পরে কাজটি করতে গিয়ে দেখা গেল খুবই বিরক্তি অনুভব হচ্ছে।

নিজেকে প্রশ্ন করুন তো, ‘হ্যাঁ’ বলতে গিয়ে ওই মুহূর্তে কী ভাবছিলেন? এর উত্তর কয়েকটি হতে পারে। এক. যদি বসের অনুরোধ হয়ে থাকে, বসকে সরাসরি ‘না’ বলা যায় না। দুই. সিনিয়র সহকর্মী হলে সম্পর্কের খাতিরে ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছেন। তিন. অন্য সহকর্মী বারবার অনুরোধ করায় আর ‘না’ বলতে পারেননি। চার. ‘হ্যাঁ’ বলাটাকে সহকর্মীর সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে ভেবেছেন।

মিল খুঁজে পেয়েছেন তো? সত্যিটা হলো, কাজের সুযোগ পাওয়ার জন্য ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ‘হ্যাঁ’ বলাটা কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। এতে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়, পরিচিতি বাড়ে, নতুন দক্ষতা শেখা যায়। তবে ক্যারিয়ারের পরবর্তী ধাপে গিয়ে এ ধরনের অনুরোধ নিজের কাছে বিরক্তিকর হয়ে ধরা দেয়। তখন হয়তো সম্পর্কের খাতিরে ‘হ্যাঁ’ বলে দেন; কিন্তু পরে নিজেই নিজেকে দোষ দেন, ‘এত কাজ কেন নিলাম?’ বা ‘সময় ব্যবস্থাপনায় আমি দুর্বল’।

কর্মক্ষেত্রে ‘না’ বলতে পারাটা একধরনের দক্ষতা, যা চর্চার মাধ্যমে শেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে যারা কিছু চায়, তারা সাধারণত বুঝতে পারে না অন্যদের জন্য ‘না’ বলা কত কঠিন। বিশেষ করে সামনাসামনি অনুরোধ করলে ‘না’ বলা অস্বস্তিকর, কঠিন বা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার মতো মনে হয়। তখন আপনি একটি চক্রে ঘুরতে থাকেন। মনে হয়, এই মুহূর্তে ‘হ্যাঁ’ বলাই সহজ।

‘হ্যাঁ’ বলার পর কী হয়?
মানুষ একবার সাহায্য করতে রাজি হলে, অনেক সময় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করে। একটি সাধারণ ‘ঠিক আছে, সমস্যা নেই’ কথাটি ধীরে ধীরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ, মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত ভাবনার বোঝায় পরিণত হতে পারে। এ চাপ বাইরের নয়, ভেতরের। কেউ আপনাকে বাধ্য না করলেও, একবার রাজি হয়ে গেলে নিজেই দায়িত্ববোধে বেশি কাজ করে ফেলেন।

এ ছাড়া গবেষণা বলছে, আমরা নিজেরাই কোনো কাজ করতে কত সময় লাগবে তা অনুমান করতে ভুল করি; যদিও-বা একই কাজ আগে করে থাকি। ফলে ‘হ্যাঁ’ বলার মূল্য বোঝা যায় তখনই, যখন আপনি ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলেছেন।

আরও পড়ুন

কেন কর্মক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি হয়?
অনেক কর্মস্থলে দ্রুত সাড়া দেওয়া, দলগত কাজ ও সব সময় প্রস্তুত থাকা—এগুলোকে মূল্য দেওয়া হয়। এগুলো ভালো গুণ। তবে ‘না’ বলার সময় নিজের মধ্যে অপরাধবোধ বাড়ায়।

অনেক পেশাজীবী স্বীকার করেছেন, ‘না’ বলার সময় তাঁরা অপরাধবোধ, উদ্বেগ ও সুনাম নষ্ট হওয়ার ভয় অনুভব করেন। এমনকি সেই কাজ তাঁদের মূল ক্ষতি করলেও। এ ক্ষেত্রে আপনি কীভাবে ‘না’ বলবেন? কৌশল মেনে এমনভাবে বলতে হবে যাতে সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না হয়।

‘না’ বলার কৌশল
১. সরাসরি অনুরোধের জবাব সঙ্গে সঙ্গে দেবেন না। সময় নিন। যেমন বলতে পারেন, ‘এই মুহূর্তে আমার কাজের চাপ বেশি, পরে জানাচ্ছি।’

দেখা গেল আপনার এই জবাব শুনে সহকর্মী মন খারাপ করেননি। বরং অন্য কারও কাছে গিয়েছে বা নিজেই নিজের কাজটি করার চেষ্টা করছেন।

২. সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ না বলে বিকল্প উপায় বলে দিতে পারেন। গবেষণা বলছে, সরাসরি ‘না’ বলার চেয়ে গঠনমূলক বিকল্প দেওয়া বেশি গ্রহণযোগ্য। যেমন—
‘এই মুহূর্তে সম্ভব না। তবে আপনাকে কিছু উপায় বলে দিতে পারি, যাতে সহজেই কাজটি করতে পারেন।’

অথবা ‘এই কাজটিতে আমি দক্ষ নই। তবে এমন একজনকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি, যিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।’

৩. বেশি ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার নেই। অনেকেই বলেন, ‘ইশ্‌, কাজটি করে দিতে পারলে ভালো লাগত।’ তারপর কাজটি না করতে পারার পেছনে অনেক অজুহাত দেন। এটা করা যাবে না। বরং স্পষ্টভাবে বলুন, ‘আগামী কয়েক দিন আমার হাতে সময় নেই। অন্য কাজ আছে, সেগুলো আগে শেষ করতে হবে।’

তাই যে কাজগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোর জন্য সময় রাখতে চাইলে—অপ্রয়োজনীয় কাজগুলোকে কার্যকরভাবে ‘না’ বলতে শিখতেই হবে।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে