কর্মক্ষেত্রে আড্ডা কি সময় নষ্ট, নাকি মানসিক শক্তির উৎস
যখন কথা বলার সিদ্ধান্ত নিই, তখন অনেকেই সহজ পথ বেছে নিয়ে সেই চেনা প্রশ্নটাই করে...
পরিবারের বাইরে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে আমাদের প্রতিদিন দেখা হয়। পাড়া–প্রতিবেশী থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী, বন্ধুবান্ধবসহ অনেকেরই মুখোমুখি হতে হয়। আবার কাজের সূত্রে কারও সঙ্গে প্রথমবার পরিচিতি ঘটে। সম্পর্কের ধরন অনুযায়ী কখনো হাত নেড়ে অভিবাদন জানাই, আবার কখনো ইচ্ছে করে অন্যদিকে চলে যাই। যখন কথা বলার সিদ্ধান্ত নিই, তখন অনেকেই সহজ পথ বেছে নিয়ে সেই চেনা প্রশ্নটাই করে, ‘কেমন আছ/আছেন?’ এই প্রশ্নের জবাবও খুব কমন, ‘ভালো।’ এভাবেই কথাবার্তা শুরু হওয়ার আগেই অনেক সময় শেষ হয়ে যায়।
কখনো কখনো আমরা কথাটা একটু বাড়াতে চাই। তখন আরেকটা প্রশ্ন করি, ‘কেমন যাচ্ছে দিনকাল?’ এটির উত্তরও কমন, ‘এই তো, আলহামদুলিল্লাহ ভালো যাচ্ছে। আপনার কী খবর?’
কিন্তু সত্যটা হলো, এভাবে ঠিক কারও সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন কথা বলার আরও আকর্ষণীয় উপায়।
ছোট ছোট কথার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলা
ছোট ছোট কথাবার্তা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেরই অংশ। তবে বিষয়টি শুধু কথা বললেই হয় না, কী নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কথোপকথন শুধু সৌজন্য নয়, সম্পর্কও গড়ে তুলতে পারে। যদিও এসব কথা খুব ছোট হয়, তবু প্রতিদিনের এই সংক্ষিপ্ত অভিবাদনের ভেতরেই বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে হওয়া ছোটখাটো আড্ডা একদিকে যেমন কাজের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়, অন্যদিকে আবার মনও ভালো করে। এ গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের মোট কথাবার্তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছোটখাটো কথা। তিন সপ্তাহ ধরে অফিসে এ ধরনের কথাবার্তা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এতে কর্মীদের মন ভালো থাকে এবং দিনের শেষে মানসিক স্বস্তি বাড়ে। যদিও এতে কাজের মনোযোগ কিছুটা কমে যেতে পারে, তবু আধুনিক কর্মজীবনে এই ছোট কথাই অনেক সময় মানসিক শক্তি জোগায়।
ভালো সম্পর্কের শুরু ভালো প্রশ্নের মাধ্যমে
আপনি যদি অফিসে কোনো সহকর্মীকে ভালোভাবে জানতে চান, তাহলে কমন একঘেয়ে প্রশ্নগুলো বাদ দিন। বিশেষ করে যেগুলোর উত্তর সবাই জানে। মানুষ সবচেয়ে বেশি নিজের কথা বলে তখনই, যখন এমন কিছু নিয়ে কথা বলে, যেটা সে পছন্দ করে। এ জন্য দরকার বাছাই করা প্রশ্ন।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো প্রশ্ন হলো—যেগুলো আপনার সামনে থাকা মানুষটির আগ্রহ বা ভালোবাসার জায়গাকে স্পর্শ করে। ব্যক্তিগত লক্ষ্য হোক বা পেশাগত আগ্রহ—ব্যতিক্রমী প্রশ্ন মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। যাদের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় আছে, তাদের আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন—‘ছুটি কেমন উপভোগ করলেন?’ বা ‘পরিবারের সবার স্বাস্থ্যের কী অবস্থা?’
আর যাদের খুব ভালো চেনেন না, তাদের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করতে পারেন—‘ছুটির দিনে আপনি কী কী করতে পছন্দ করেন?’ অথবা এমন কিছু, যা ওই সহকর্মী কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ভদ্র ভাষা আর উপযুক্ত বিষয় বেছে নিলে মানুষ বুঝতে পারে, আপনি সত্যিই আন্তরিক।
মানুষ পুরোনো স্মৃতি নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। যেমন রমজান মাস শুরু হতে যাচ্ছে। এই সময়ে শৈশবে রমজান মাসে করা প্রিয় কাজ, ঈদের শপিং, টিভি অনুষ্ঠান, প্রিয় খাবার—এসব নিয়ে কথা বললে সহজেই আন্তরিকতার সম্পর্ক তৈরি হবে।
মোটকথা, পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে এমন প্রশ্ন করা, যেগুলো আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে, মানুষের মনে ভালো লাগা জাগায়। আর সেই ভালো লাগার অনুভূতির সঙ্গে যেন আপনারও একটা সংযোগ থাকে। তাই ভেবে করা প্রশ্ন সম্পর্ক গড়ে তোলে, বিশ্বাস তৈরি করে এবং কর্মক্ষেত্রে আপনাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে