অনুবাদ শুধু ভাষা বদল নয়—একজন অনুবাদকের কী কী জানা উচিত
প্রত্যেক মানুষই একজন অনুবাদক। আমরা যে কথা বলি, মনের ভাব প্রকাশ করি বা লিখি, এটাও একধরনের অনুবাদ। অনুবাদ এই অর্থে, আমরা যেটা ভাবি সেটা কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক অনুবাদ করে থাকে। আমাদের ভাবনাটাকে যখনই ভাষায় প্রকাশ করা হয়, লিখিত কিংবা মৌখিকভাবে, সেটিই এক অর্থে অনুবাদ।
আমরা সাধারণ অনুবাদ বলতে বুঝি কোনো একটি ভাষাকে ভিন্ন একটি ভাষায় রূপান্তর করাকে।
‘অনুবাদ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। অর্থ পশ্চাদানুসরণ। আক্ষরিক অর্থে, পুরো অনুসরণ করা বা পুনরাবৃত্তি করা। অর্থাৎ একজন কিছু একটা বলছেন বা লিখছেন; সেটিকে যদি আমি অন্য ভাষায় রূপান্তর করি, সেটিই অনুবাদ।
একটি বিদেশি ভাষার যেকোনো জিনিস আমরা যদি পড়তে চাই, সেটি যদি অনূদিত না হয়, তাহলে আমরা পড়তে পারি না। তার মানে আমরা একটা খোলসের মধ্যে থাকি। অনুবাদের ভূমিকাটা এখানেই। যদি অনুবাদ না থাকত, বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যে স্তরে পৌঁছেছে, সেটা সম্ভব হতো না। আমরা কি কখনোই ইংরেজি সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করতে পারতাম? কিংবা ফরাসি সাহিত্যের? অনুবাদের কারণেই আমরা বিশ্বসাহিত্যের দরবারে ঢুকতে পেরেছি।
অনুবাদকের কৃতিত্ব
অনুবাদককে মূল রচনার ভাষা ভালোভাবে জানতে হবে। একই সঙ্গে রচনাটি তিনি যে ভাষায় অনুবাদ করবেন, সেটিও তাঁকে ভালো করে জানতে হবে। ভাষা যদি কম জানেন, তাহলে অনুবাদের পূর্ণ সফলতা আসবে না।
মূল লেখকের সঙ্গে অনুবাদকের পার্থক্য
মূল লেখক যে ভাষায় রচনা করছেন, তাঁকে একটি ভাষা জানলেই চলে। কিন্তু অনুবাদককে দুটো ভাষা জানতে হয়। এ ক্ষেত্রেও কিন্তু অনুবাদক মূল লেখকের চেয়ে এক স্তর ওপরে অবস্থান করেন। অনুবাদককে মূল রচনার গভীরে ঢোকার যোগ্যতা রাখতে হয়। সেটাকে পুরোপুরি আত্মস্থ করতে হয়। এরপর রচনাটিকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে তাঁকে সৃষ্টি করতে হয়।
অনুবাদক শুধু আক্ষরিক অনুবাদ করছেন না। তিনি বিষয়টিকে আত্মস্থ করছেন এবং রচনাটিকে যেভাবে উপস্থাপন করছেন, তাতে তাঁকে বেশ কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়; তিনি যে ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন, সে ভাষার পারিপার্শ্বিকতা, সমাজ, সংস্কৃতির ব্যাপারে জানতে হয়। একই সঙ্গে গবেষণা করতে হয়। তিনি যে ভাষা বা পাঠকের কাছে যাবেন, তার সংস্কৃতি, সমাজ ও তাদের মানসিক গঠন বুঝতে হবে। তারপর তিনি সফলভাবে অনুবাদ করতে পারবেন। অনুবাদককে এ দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে হয়।
তাই বলা যায়, অনুবাদকের ভূমিকা লেখকের চেয়ে বেশি। কারণ, তাঁর কাজই হচ্ছে অনুবাদের কাজটিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া। একটা নতুন জনগোষ্ঠীর কাছে, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে রচনাটিকে উপস্থাপন করা।
অনুবাদের ক্ষেত্রে যে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে
অনুবাদ যদি না থাকত, বিশ্বের এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের কাছাকাছি আসতে পারত না। একটা উদাহরণ দিই। দুটি শব্দ ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’। আক্ষরিক অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়াবে ‘পাউরুটি ও মাখন’। আমরা যদি এটাকে অনুবাদ করি তাহলে কি ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’-এর জায়গায় রুটি ও মাখন দেব? অবশ্যই নয়। কারণ, এখানে ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’ বলতে বোঝানো হচ্ছে মূল আয়ের পথ। তাহলে এখানে আমরা ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’কে রুটি ও মাখন না লিখে লিখব রুটি রুজি। এখানে রুটি শব্দটা আছে আর আমরা যোগ করব রুজি।
মূল লেখক যাঁরা, তাঁদের লেখার অনেক ধরনের স্টাইল থাকে। অনেক ধরনের শব্দ তাঁরা ব্যবহার করেন, যেটির সঙ্গে আমরা সব সময় পরিচিত নই। কিংবা আমাদের দেশে শব্দটি খুব বেশি প্রচলিত নয়। তাঁদের বাক্যের গঠন ভিন্ন, ব্যাকরণ ভিন্ন হয়। সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক প্রসঙ্গ তো আছেই। এটা মাথায় রাখলে আর আক্ষরিক অনুবাদ কাজ করে না।
বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন বাগধারা থাকে। আবার অনেক সময় একাধিক শব্দের দ্বৈত অর্থ থাকতে পারে। শিবরাম চক্রবর্তীর একটা বিষয় নিয়ে উদাহরণ দিচ্ছি। দ্বৈত অর্থের অনেক শব্দ থাকে। যেমন একটা গাড়ি নিয়ে তাঁর একটা বিখ্যাত বাক্য আছে।
‘এই গাড়ির হর্ন ছাড়া সবই বাজে’
এখানে হর্ন শব্দের মানে সবাই বুঝি, হর্ন বাজে। এখন এখানে ‘বাজে’ শব্দের কী কী অর্থ দাঁড়ায়? বাজের একটা মানে হচ্ছে ‘খারাপ’, আরেকটা অর্থ হচ্ছে ‘শব্দ হওয়া’। এখানে বোঝানো হচ্ছে হর্ন বাজে না। তিনি যেটা হয়তো বোঝাচ্ছেন, হর্ন বাজে না, অথচ গাড়ির এমন লক্করঝক্কর অবস্থা যে চললেই ঝমঝম শব্দ হয়। তার মানে এখানে বোঝানো হচ্ছে, হর্নটা ভালো নয়। অর্থাৎ বাজে।
আবার অন্য অর্থে যদি ধরি, হর্নটাই শুধু বাজে। অর্থাৎ শব্দ হয়।
তাহলে এই ‘বাজে’ শব্দটাকে কতভাবে বোঝানো যায়। এখন আপনি যদি এটাকে অনুবাদ করতে চান, এটা কখনোই কিন্ত ওইভাবে আসবে না। বাজে শব্দটাকে যে বিভিন্ন ভাবে বোঝানো হচ্ছে, এটাকে ইংরেজিতে পান (পিইউএন) বলে। এই পান যখন থাকে তখন কিন্তু সত্যিকারভাবে একজন অনুবাদকের জন্য কাজটা খুবই কঠিন হয়ে যায়।
আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যাকরণের বৈশিষ্ট অন্য ভাষার সঙ্গে মিলে না। কারণ, কোনো একটা বাগধারা, যেগুলো অন্য ভাষার সঙ্গে যায় না, ব্রেড অ্যান্ড বাটারের কথা যেমন বললাম। তেমনিভাবে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
কোনো কোনো শব্দ থাকে যেগুলোর সঙ্গে আমরা ঠিক পরিচিত নই। আমি যখন ক্লিনটন বি সিলির ‘আ পোয়েট অ্যাপার্ট’ বইটা অনুবাদ করি, সেখানে একটা শব্দ পেলাম ‘রিটায়ারিং’। জীবনানন্দ দাশের ওপরে বইটি। ক্লিনটন বি সিলি জীবনান্দের জীবনীর ওপর পিএইচডি করেছেন। বইটি অনুবাদ করার সময় চিন্তা করলাম, তিনি কেন ‘রিটায়ারিং’ শব্দটা ব্যবহার করলেন। এ শব্দের যে অন্য একটি অর্থ আছে, তা আমি জানতাম না। তারপর লেখকের সঙ্গে যখন আমার যোগাযোগ হলো, ওনার কাছ থেকে জানতে পারলাম, ‘রিটায়ারিং’ শব্দের আরেকটা অর্থ হচ্ছে ‘মুখচোরা বা লাজুক’।
আরেকটা শব্দ লেখক ব্যবহার করেছেন ‘পিরিয়ড (period)’। এটির কিন্তু অনেকগুলো অর্থ আছে। সময় কিংবা নারীদের একটি শারীরিক পরিবর্তন। পিরিয়ডের আরেকটি অর্থ আছে—ব্যস। কোনো কিছু বলার পর আমরা ব্যস বলে শেষ করি।
এই যে শব্দের বিভিন্ন অর্থ, যেটি অনুবাদকের কাছে পরিচিত নয়, বোধগম্য নয়, সেটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। অনুবাদকদের বিভিন্ন ভাষার এ ধরনের অপ্রচলিত শব্দের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হয়।
উল্লেখ্য, প্রথম আলো বন্ধুসভার ভার্চ্যুয়াল লেখালেখি কর্মশালা ২০২৬-এর প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ১০ জুলাই। কর্মশালায় ‘অনুবাদ’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীন। এই লেখা তাঁর আলোচনার প্রতিলিপি।