আপনিও কিন্তু নেতৃত্ব দিচ্ছেন

লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।

যার মধ্যে দায়িত্ববোধ বা প্রতিশ্রুতি রক্ষার হার যত বেশি, সে তত বেশি নেতৃত্বে দক্ষতা অর্জন করেছবি: এআই/বন্ধুসভা

আমরা অনেক সময় ভেবে থাকি, দায়িত্বশীল পদে যিনি আছেন, তিনিই নেতৃত্ব দেন বা দেবেন। কিন্তু আপনি জেনে অবাক হবেন, আপনিও আপনার জায়গা থেকে নিজের অজান্তেই দুর্দান্ত নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। পার্থক্য হলো, কেউ দিচ্ছেন সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকে, আর আপনি দিচ্ছেন নিজের অবস্থান থেকে।

যখন কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য আপনি অন্য কারও কাজকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন বা করেন—অর্থ হলো আপনি নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছেন। এ জন্য কার্যকর নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখেন। এখন আমাদের জানতে হবে, নেতৃত্ব আমি কীভাবে দিচ্ছি? নেতৃত্ব তিনটি শব্দের সমষ্টি—‘ব্যক্তিগত, পরম, দায়িত্ববোধ’। অর্থাৎ যে কাজ আপনি পরম দায়িত্বশীলতা নিয়ে করে যাচ্ছেন, সেটি হোক নিজের জন্য বা কোনো একটি দলের জন্য বা সমাজের জন্য বা রাষ্ট্রের জন্য, তার মাধ্যমেই আপনি নেতৃত্বের মধ্যে আছেন। যার মধ্যে দায়িত্ববোধ বা প্রতিশ্রুতি রক্ষার হার যত বেশি, সে তত বেশি নেতৃত্বে দক্ষতা অর্জন করে। এ জন্যই আমরা দেখি, একজন নবীন অনেক সময় একজন প্রবীণের চেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছে যায়।

ভালো নেতৃত্ব অর্জনের জন্য কর্মদক্ষ হতে হবে এবং তা অর্জনের জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় আপনি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়বেন। দক্ষতা বা যোগ্যতার অর্থ হলো, একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সেই কাজটি সম্পর্কে ভালোমতো জ্ঞান থাকা। অন্যদিকে আপনার প্রতিশ্রুতি বা ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে। পাশাপাশি কাজটি করার জন্য আপনার প্রেরণা ও আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব জানাবোঝা সত্ত্বেও প্রতিশ্রুতি দুর্বল হলে বা কোনো কিছু করার ইচ্ছা না থাকলে সফলতা আসবে না। এ জন্য বলা হয়—কর্মদক্ষতা হলো দক্ষতা, যোগ্যতা, প্রতিশ্রুতি ও ইচ্ছাশক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিশেষ গুণ, যা আপনাকে নেতৃত্বের শিখরে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

সব গুণ থাকা সত্ত্বেও কেন নেতৃত্বের জায়গায় কেউ কেউ পিছিয়ে পড়ে, আবার কেউ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ ক্ষেত্রে একজন নবীন কোনো সংগঠন বা সামাজিক কাজে যে আগ্রহ বা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে কাজ করে, সে ধীরে ধীরে হয় আরও প্রতিশ্রুতিশীল হয়ে ওঠে, অথবা তার উদ্যমের ঘাটতি হতে শুরু করে। নানা কারণে এমন হয়ে থাকে। কখনো নিজের ভেতরের বাধা বা অন্যের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে উৎসাহ হারিয়ে যায়। তবে সবকিছু সহ্য করে যে এগিয়ে যায়, সে-ই নেতৃত্বের সর্বোচ্চ জায়গায় যেতে পারে। সহজ কথায়, এই অবস্থাকে আমরা চারটি পর্যায়ে ভেঙে দেখাতে পারি। প্রথম পর্যায়ে দেখা যায়, আমাদের মধ্যে যোগ্যতা কম থাকে, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি বা প্রতিশ্রুতি অনেক বেশি থাকে। অর্থাৎ এ পর্যায়ে অতি উৎসাহী হয়ে অন্যের জন্য, সমাজের জন্য কাজ করার স্বার্থে অনেকে মুখিয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, যোগ্যতা কম না থাকলেও কারও কারও প্রতিশ্রুতি কমে যায় বা মোহভঙ্গ ঘটে। এ ক্ষেত্রে আশা অনুযায়ী যা পাওয়ার ছিল, তা না পাওয়ায় প্রথম পর্যায়ের মতো যোগ্যতা না থাকলেও ব্যক্তির অন্যের জন্য কাজ করার যে মানসিকতা ছিল তা কমে যায়। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে, অনেকখানি যোগ্যতা সে অর্জন করে ফেলেছিল। ফলে এ ধরনের কেউ কেউ নেতৃত্বের জায়গা থেকে ছিটকে পড়তে থাকে এবং সচেতনভাবেই অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে যে যোগ্যতা অর্জন করার কথা ছিল, তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। তৃতীয় পর্যায়ে, সে মাঝারি থেকে উচ্চ কর্মদক্ষতা অর্জন করে। এ সময় দেখা যায় তার মধ্যে দোদুল্যমান প্রতিশ্রুতি, অর্থাৎ ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সে অনেক অবদান রাখে এবং যে প্রতিশ্রুতি ঠিক রাখতে পারে, সে-ই সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত হয়, অন্যরা ঝরে পড়ে। এরপর যারা চতুর্থ পর্যায়ে যেতে পারে তারা সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। ফলে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ জায়গায় যায়। এই পর্যায়ে সে পুরোপুরি আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

এ জন্য শুরু থেকে বাকি তিনটি পর্যায়ে কর্মদক্ষতা ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। না হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হবে না। অথচ আমাদের প্রত্যেকেরই কমবেশি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা থাকে।

নিজেই মিলিয়ে দেখুন, কোন পর্যায়ে আছেন? মনে রাখা জরুরি, এই যোগ্যতা থাকলে আপনাকে অন্যরা নেতৃত্বের জন্য খুঁজে নেবেন। এই বিষয়গুলো ছাড়াও আরও কিছু গুণ থাকতে হবে। যেমন কোনো কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করা, কর্মপরিকল্পনা করা, কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা, সময়সীমা নির্ধারণ করা, কীভাবে করব সেটা ঠিক করা এবং কাজটি সম্পন্ন হলে বা না হলে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে সেই কৌশল বের করা। একই সঙ্গে কোনো কাজে অন্যের মতামত চাওয়া, অন্যের প্রশংসা করা, যুক্তি দিয়ে বোঝানো, ছোট কাজেও সম্ভাবনা খোঁজার মানসিকতা যেমন থাকতে হবে, তেমনিভাবে জীবনে কোনো কাজ বৃথা যায় না—এই বিশ্বাসও রাখতে হবে। হতাশা আসতেই পারে, তবে নিজের প্রতিশ্রুতি বা ইচ্ছাশক্তি কমানো যাবে না।
আসুন সম্ভাবনায় বাঁচি।

উপদেষ্টা, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ