সফল মানুষেরা যে দুটি প্রচলিত নিয়ম ‘ইগনোর’ করেন

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব নিয়ম মানতে গিয়ে মানুষ আগের চেয়ে বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে এবং কাজের মানও কমে যাচ্ছেছবি: এআই/বন্ধুসভা

সফল জীবন গঠনের জন্য আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে এমন অনেক উপদেশ পাবেন, যেখানে বলা হয়, ‘তরুণদের এখনই কাজ করার সময়’, ‘এই সময়ে যত বেশি কাজ করবে, ক্যারিয়ার তত গোছানো হবে’, ‘খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে’, ‘জীবনকে একটি রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে’, ‘রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে’…ইত্যাদি ইত্যাদি।

এভাবে একটা সিস্টেম গড়ে উঠেছে, আর আমরা সেটায় অভ্যস্ত হচ্ছি এবং সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় কঠোর পরিশ্রম করছি। কেউ নির্দিষ্ট সময়ের বেশি অফিসে সময় দিচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব নিয়ম মানতে গিয়ে মানুষ আগের চেয়ে বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে এবং কাজের মানও কমে যাচ্ছে। অথচ গবেষণা বলছে, সবচেয়ে সফল মানুষেরা এত নিয়ম মেনে চলেন না; বরং তাঁরা সাধারণ মানুষের চেয়েও কম নিয়ম মানেন। তাঁরা বুঝতে পারেন কোন নিয়মগুলো তাঁদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের ধারার বিরুদ্ধে যাচ্ছে এবং সেগুলো বর্জন করেন।

যে দুটি নিয়ম সফল ব্যক্তিরা চেষ্টা করেন ইগনোর করার—

নিয়ম ১: দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো
মানুষের মস্তিষ্ক একটানা সমানভাবে কাজ করতে পারে না। ঘুমবিষয়ক গবেষক নাথানিয়েল ক্লিটম্যান আবিষ্কার করেছেন যে মানুষের শরীরের একটি নির্দিষ্ট ছন্দ (রিদম) রয়েছে, যা ৯০ থেকে ১২০ মিনিট পর পর পরিবর্তিত হয়। এই সময়ে মনোযোগ তীক্ষ্ণ থাকে এবং কাজ ভালো হয়। এই সময় পর মস্তিষ্ক বিশ্রামের সংকেত দেয়। যদি এই সংকেত উপেক্ষা করে কেউ কাজ চালিয়ে যায়, তাহলে কাজের মান নষ্ট হয়।

মনোবিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স এরিকসন ১৯৯৩ সালে বেহালাবাদকদের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি দেখেন, সেরা বাদকরা দিনে গড়ে মাত্র ৩.৫ ঘণ্টা অনুশীলন করতেন (৬০-৯০ মিনিটের ৩টি সেশন)। মজার ব্যাপার হলো তাঁরা অন্যদের চেয়ে ১ ঘণ্টা বেশি ঘুমাতেন এবং সপ্তাহে প্রায় ৩ ঘণ্টা দুপুরে ঘুমাতেন। তাঁরা শুধু কাজই বেশি করতেন না, বিশ্রামও নিতেন বেশি।

আরও পড়ুন

পৃথিবীর অনেক সফল ব্যক্তিই এমন। মার্কিন লেখক ও সমাজকর্মী মায়া অ্যাঞ্জেলোর কথাই ধরা যাক। তিনি সকালে একটি হোটেল রুমে গিয়ে দুপুর পর্যন্ত লিখতেন। এরপর বাসায় ফিরে লেখালেখির কথা একদম ভুলে যেতেন এবং রান্না বা পরিবারের কাজে সময় দিতেন। এই পদ্ধতিতেই তিনি ৩০টির বেশি বেস্টসেলার বই লিখেছেন।

চার্লস ডারউইনকে চেনে না এমন কেউ নেই। তিনি তাঁর দিনকে ছোট ছোট কাজের সেশনে ভাগ করে নিতেন। দিনে তিনবার হাঁটতে বের হতেন। তাঁর সেরা আইডিয়াগুলো ডেস্কে বসে নয়, বরং হাঁটার সময় আসত।
মূল কথা হলো বিশ্রাম কাজের পরের কোনো পুরস্কার নয়; বরং ভালো কাজের জন্য এটি অন্যতম পূর্বশর্ত।

নিয়ম ২: সব সময় খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা
খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার একটি সংস্কৃতি আমাদের দেশে আদিকাল থেকে রয়েছে। বলা হয়, ভোরে না উঠলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। কিন্তু সবার জন্য এই নিয়ম খাটে না। বিজ্ঞান বলছে, আমাদের প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট ক্রোনোসাইট বা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি আছে। এটি জিনগতভাবে নির্ধারিত।

২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন, তাঁদের মানসিক দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে সকালে কাজ করা ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি। আবার দেখা গেছে, রাতজাগা মানুষেরা বেশি সৃজনশীল হন। রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশ তাঁদের ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করে। যেমন জার্মান লেখক ফ্রানৎস কাফকা দিনের বেলা একটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে ফুলটাইম চাকরি করতেন। আর লেখালেখি করতেন রাত ১১টা থেকে ভোররাত ৩টা পর্যন্ত। তাঁর বিখ্যাত অনেক সৃষ্টি রাতের অন্ধকারেই জন্ম নেওয়া।

নোবেলজয়ী লেখিকা টনি মরিসন ভোরে লিখতেন। কারণ, তাঁর ছোট বাচ্চা ছিল এবং দিনের বেলা চাকরি করতে হতো। অর্থাৎ, তিনি তাঁর পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রেখে সময় বেছে নিয়েছিলেন।
আমাদের অনেকেরই প্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খান। তিনি রাত জেগে কাজ করতে পছন্দ করেন। ঘুমাতে যান ভোর হওয়ার পরে। আবার ঘুমান মাত্র ৫–৬ ঘণ্টা। এটাই তাঁর রুটিন হয়ে গেছে।

আসল কথা হলো ভোর ৫টায় ওঠা বা রাত জেগে কাজ করা—কোনোটাই শ্রেষ্ঠ নয়। আসল নিয়ম হলো আপনার মস্তিষ্ক যখন সবচেয়ে ভালো কাজ করে, সেই সময়টাকে চেনা এবং মেনে চলা। নিজের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করাটা ভুল। সবচেয়ে কার্যকর সময় তখনই, যখন আপনার মস্তিষ্ক কাজের জন্য প্রস্তুত থাকে, সেটা ভোর ৫টা হোক কিংবা রাত ২টা।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে