সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের মিল কতটা প্রভাব ফেলে

ব্যক্তিত্বের মিল কাজের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছবি: ফ্রিপিক

পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ একে অন্যের থেকে আলাদা। তবু অনেকের সঙ্গেই কিছু না কিছু ক্ষেত্রে মিল থাকে। আমরা যেখানে কাজ করি, সেখানেও কারও না কারও সঙ্গে ব্যক্তিত্বে কিছুটা মিল থাকে। সেটা বসের সঙ্গে হতে পারে, আবার অন্য সহকর্মীর সঙ্গেও হতে পারে। আর এই ব্যক্তিত্বের মিল কাজের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। কিছু সহকর্মীকে দেখামাত্র আপন মনে হয়, আবার কেউ কেউ যেন আমাদের থেকে একেবারেই আলাদা। গবেষণা বলছে, এই ব্যক্তিত্বের মিল–অমিল কর্মক্ষেত্রে আমরা যতটা ভাবি, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যক্তিত্বের মিল ভালো নাকি খারাপ
এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়। কেউ এটার পক্ষে বলে তো কেউ বিপক্ষে। বিশেষ করে প্রেম বা দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের মত হলো—সম্পর্কে ব্যক্তিত্বের মিল থাকাটা খুবই জরুরি। কারণ, সারা জীবন একসঙ্গে বসবাস করবে; একে অপরের সঙ্গে মিল না থাকলে তখন বসবাস করাটা কঠিন হয়ে পড়বে। সাংসারিক ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া লাগবে। যেমন খুব গোছানো একজন মানুষ হয়তো একই রকম একজনের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করবে, কোনো অগোছালো মানুষের সঙ্গে নয়। আবার আরেকটা মত হলো—খুব অগোছালো একজন মানুষ হয়তো একজন গোছানো মানুষের সঙ্গে থাকলে ভালোভাবে চলতে পারবে। কারণ, অন্য কোনো অগোছালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হলে তখন জীবন আরও অগোছালো হয়ে যাবে।

গবেষকেরা এই ধারণাগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছেন। কিছু গবেষণায় ব্যক্তিত্বের মিলের তেমন প্রভাব পাওয়া যায়নি, আবার কিছু গবেষণায় ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। যেমন নারীরা তাঁদের সঙ্গীর সঙ্গে ব্যক্তিত্বের মিল বেশি হলে সম্পর্ক নিয়ে বেশি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। একইভাবে শিক্ষার্থীরা তাদের মতো ব্যক্তিত্বের শিক্ষককে বেশি পছন্দ করে।

কর্মক্ষেত্রে বসের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের মিল
কখনো কি আপনি আপনার বসের ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভেবেছেন? আপনি যে নতুন ও সৃজনশীল আইডিয়া দেন, আপনার বস কি সেগুলো গ্রহণ করতে আগ্রহী? নাকি আপনি পরিবর্তন আর নতুনত্ব চান, কিন্তু আপনার বস পরিবর্তনে অনিচ্ছুক?

ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ওয়ার্ক অ্যান্ড অর্গানাইজেশনাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বসের ব্যক্তিত্বের মিল এবং কাজের প্রতি আগ্রহের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই গবেষণায় কর্মী ও বস দুজনই নিজেদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

এখানে দুটি ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এক. কেউ নতুন অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের প্রতি কতটা খোলা মনোভাব রাখে। দুই. কেউ কত সহজে নেতিবাচক আবেগ অনুভব করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কর্মী নতুন অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের প্রতি খোলা মনোভাব রাখে, বসের সঙ্গে তাঁদের মিল বেশি ছিল, তাঁরা কাজে বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ কর্মীরা এমন বস চান, যিনি তাঁদের মতোই নতুন আইডিয়া ও পরিবর্তন পছন্দ করেন।

তবে দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ফলাফল একটু ভিন্ন। এখানে দেখা গেছে, বস ও কর্মীর আবেগপ্রবণতায় পার্থক্য থাকলে সেটাই বরং উপকারী হতে পারে। অর্থাৎ আপনি আপনার বসের চেয়ে বেশি বা কম আবেগপ্রবণ হলে সেটাও ভালো হতে পারে। এতে একদিকে যেমন বসের ওপর ভরসা করা যায়, তেমনি বসও আপনার ওপর ভরসা করতে পারেন।

অন্য সহকর্মীদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের মিল
কিছু গবেষণায় কর্মক্ষেত্রে অন্য সহকর্মীদের ব্যক্তিত্বের মিল নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। যেমন আপনি যদি নতুন কোনো আইডিয়াতে খুব আগ্রহী হন, আর আপনার সহকর্মীরা আগ্রহী না হন, তাহলে কাজ করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রেও ফলাফল একরকম নয়। কিছু গবেষণা বলছে, মিল থাকলে কাজ ভালো হয়। আবার কিছু গবেষণা বলছে, বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা থাকলে টিমের কাজের মান বাড়তে পারে। মোটকথা, একটি টিমে যেমন ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা নানা দৃষ্টিভঙ্গি, ভূমিকা ও সমস্যা সমাধানের কৌশল নিয়ে আসতে পারে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে এই ভিন্নতাই আবার সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।

কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব মানিয়ে নেওয়া
বসের সঙ্গে হোক বা সহকর্মীদের সঙ্গে—ব্যক্তিত্বের মিল বা অমিল কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নেতৃত্বের জায়গায় আছেন, তাঁদের জন্য কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সামঞ্জস্য নিয়ে ভাবা জরুরি। সম্ভব হলে, বসদের উচিত তাদের আচরণে কিছুটা নমনীয়তা আনা, যেন কর্মীর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। এর মানে এই নয় যে তাঁরা নিজের ব্যক্তিত্ব বদলে ফেলবেন। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ করবেন। এ ধরনের নমনীয়তা কর্মীদের উপকারে আসতে পারে। কাজের পরিবেশও ভালো থাকবে।

টিমওয়ার্কের ক্ষেত্রেও—বিশেষ করে যেখানে দুজন খুব কাছাকাছি কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের মিল থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কাজ বণ্টনের সময় ব্যক্তিগত পছন্দ বিবেচনা করা সম্ভব না হলেও, যেখানে কাজের ঘনিষ্ঠতা বেশি সেখানে কার সঙ্গে কাজ করবেন, সে বিষয়ে কিছুটা মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয়েরই লাভ হতে পারে।

মনে রাখবেন, ব্যক্তিত্বের মিল বা অমিলের প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে আপনার পাশের ব্যক্তিটির ওপর। আপনি নিজে হয়তো অগোছালো মানুষ, কিন্তু গোছানো কারও সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন। অন্যদিকে সেই গোছানো মানুষটি হয়তো বিষয়টি একদমই পছন্দ করছেন না।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে