কর্মক্ষেত্রে নিজেকে উৎসাহিত রাখতে কী করবেন
অবহেলা কেউই পছন্দ করেন না। আর কর্মক্ষেত্রে তো অবশ্যই না। সবাই প্রশংসা শুনতে চান, কিংবা কাজের গঠনমূলক মূল্যায়ন। অনেকে সহকর্মী ও বসের কাছ থেকে সেই মূল্যায়ন পান না বলে চাকরি ছেড়ে দেন। নিয়মিত প্রশংসার অভাব ধীরে ধীরে কর্মীদের কাজের প্রতি উৎসাহ কমিয়ে দেয়। এতে মানসিক স্বাস্থ্য, টিমওয়ার্ক ও কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রশংসা পাওয়া এত কঠিন কেন
কর্মক্ষেত্রে প্রশংসা বা কাজের সঠিক মূল্যায়নের অভাবের দুটি দিক রয়েছে—দেওয়ার দিক ও নেওয়ার দিক। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই বসেরা কর্মীদের কাজের ফিডব্যাক ঠিকভাবে দিতে পারেন না, বিশেষ করে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। দিলেও সেটা নেগেটিভ প্রতিক্রিয়াই হয়ে থাকে সাধারণত। তবে সব বস আবার এমন নন। এমনও বস আছেন যাঁরা কর্মীদের সব সময় মূল্যায়ন করে থাকেন।
আবার অনেক কর্মী বসের কাছ থেকে ফিডব্যাক চাইতে বা বুঝতে খুব একটা দক্ষ নন। দুই ক্ষেত্রেই সমস্যার মূল কারণ হলো—প্রতিক্রিয়ার আসল মর্মার্থ কেউই বোঝেন না। সবাই প্রশংসা বা সমালোচনায় বেশি গুরুত্ব দেন। এমনকি এক সহকর্মী আরেক সহকর্মীর ব্যাপারেও কখনো কখনো এমন মনোভাব পোষণ করেন।
প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—‘কাজ কীভাবে আরও ভালো করা যায়?’ কিন্তু বস ও কর্মী দুজনই সেটা না ভেবে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবেন—‘তিনি কি আমাকে আসলেই পছন্দ করেন?’, ‘ক্ষমতা আসলে কার হাতে?’; লেখিকা এলিজাবেথ গিলবার্টের মতে, এই দুটি প্রশ্নই পৃথিবীর বেশির ভাগ যুদ্ধ, দুঃখ আর কষ্টের কারণ।
তাই কর্মক্ষেত্রে প্রশংসা পাওয়ার চেষ্টা অনেক সময়ই বৃথা হয়। প্রথমত, এতে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বস সাধারণত অফিসের অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। আপনি কোনো কাজে ভালো করলে, তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ধন্যবাদ পেতে পারেন। কাজের ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় সেটা দিতে তিনি সময় পান না, বিশেষ করে বড় অফিসগুলোতে।
দ্বিতীয়ত, ধরুন বস প্রশংসা করলেন ঠিকই, কিন্তু সেটি আপনাকে খুশি করতে পারল না। আপনি আরও বেশি প্রশংসা মনে মনে আশা করছিলেন। হয়তো বস বললেন, ‘ভালো কাজ করেছ।’ কিন্তু এতে স্পষ্ট না ঠিক কোন কাজটি ভালো হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে কীভাবে আরও উন্নতি করা যায়। কখনো কখনো প্রশংসার কথাটি এমন সময় বলেন যেটা আপনিও ঠিকভাবে বুঝতে পারেননি।
তৃতীয়ত, অতিরিক্ত প্রশংসা পাওয়ার আশা করাটাও বোকামি। এতে আপনার নিজের কাজের শক্তি ও মনোযোগ নষ্ট হয়। প্রশংসা পাওয়ার এই তৃষ্ণা ভালো লক্ষণ নয়। তখন যদি প্রশংসা না পান তাহলে কাজের স্পৃহা কমে যায়। আবার কেউ কেউ চান বসের কাছাকাছি যেতে—যদি এর মাধ্যমে কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায় করা যায়! আর সেখানেই আপনি আটকে যান স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। মূল কথা হলো—সব ক্ষেত্রে প্রশংসা খুঁজলে আপনি আরও নির্ভরশীল ও অসুখী হয়ে পড়বেন।
তাই যে কাজগুলো আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, সেগুলো ছেড়ে দিয়ে যেগুলো নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিন।
কী করলে নিজেকে বেশি মূল্যবান মনে হবে
• নিজেই নিজের কদর করুন: নিজের সাফল্য উদ্যাপন করুন। কাজের ফাঁকে বিরতি নিন। নিজের জন্য একটি পরিসীমা ঠিক করুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘আপনি কি আপনার সব ছুটি ব্যবহার করেছেন?’ যদি না করে থাকেন, কেন? সেই ছুটিগুলো ধীরে ধীরে ব্যবহার করুন। অন্যের অপেক্ষা না করে নিজেই নিজের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিন। নিজেকে ধন্যবাদ দিন। চাইলে নিজেই নিজেকে কোনো পুরস্কার দিতে পারেন।
• অন্যদের কদর করুন: প্রশংসা কেবল নিজেকেই করলে হবে না। সহকর্মীদের কাজেরও প্রশংসা করতে হবে। ভালো কাজে তাঁদের ধন্যবাদ দিন। এতে কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে। তখন দেখবেন পরবর্তী সময়ে সহকর্মীরাও আপনাকে মূল্যায়ন করছে।
• মনে জমতে না দিয়ে নিজের হতাশার কথা স্বীকার করুন: বন্ধু বা পরিবারের কারও কাছে নিজের এসব হতাশার কথা বলতে পারেন। তবে ভুলেও অফিসে এসব কথা বলা যাবে না। সহকর্মীদের কাছে এসব বললে তাঁরা আপনাকে দুর্বল মনে করতে পারে। অফিসের পরিবেশও খারাপ হয়। এই বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে।
• বাস্তববাদী হোন: প্রশংসা না পাওয়ার দুঃখে না থেকে, কী পেলে আপনি কাজে সন্তুষ্ট হবেন সেটায় মনোযোগ দিন। যেমন বেতন, কাজের সময়, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ইত্যাদি। যা দরকার সেটার কথা বসকে গিয়ে বলুন। অনেক সময়, এই বাস্তব পদক্ষেপগুলো কাজের পরিবেশে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
সুতরাং, কাজে পুরস্কার প্রাপ্তির আশায় বসে না থেকে নিজের কাজের মূল্য নিজেই দিন। অন্যদের অবদানকে স্বীকৃতি দিন। হতাশা সামলান এবং নিজের প্রয়োজন নিয়ে কথা বলুন।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে