কর্মক্ষেত্র আপনাকে পরিচয় দিচ্ছে, নাকি পরিচয় কেড়ে নিচ্ছে

কাজ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু পুরো জীবন নয়ছবি: এআই/বন্ধুসভা

সরকারি প্রতিষ্ঠান হোক কিংবা বেসরকারি—কখনো কখনো ওই প্রতিষ্ঠানগুলোয় এমন নেতা আসেন, যাঁরা প্রতিষ্ঠানটি অনেক উঁচুতে নিয়ে যান। অবস্থা এমন যে প্রতিষ্ঠানটির নাম বললে ওই ব্যক্তির নামও চলে আসে। অর্থাৎ তাঁরা একে–অপরের পরিপূরক হয়ে যায়। এমনকি কর্মীদের মধ্যেও সেই ধারণা চলে আসে। তাঁরা মনে করেন, এই মানুষটি না থাকলে হয়তো প্রতিষ্ঠানটি ঠিকভাবে চলবে না। একজন নেতা নিজের প্রতিষ্ঠান, কাজ ও প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে এতটাই গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন যে একসময় নিজের মূল্যবোধ ও পরিচয়ও সেই কাজের সঙ্গে মিশে যায়। আবার ওই নেতাও এই ধারণা কখনো কখনো পোষণ করে থাকেন।

তবে একটি সত্য অনেকের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান, কাজ বা মানুষের জন্য গভীরভাবে নিবেদিত, তাঁদের মনে হতে পারে—তাঁরা না থাকলে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানই একজন মানুষকে কেন্দ্র করে চিরকাল চলার জন্য তৈরি হয় না। একজন মানুষ চলে গেলে তাঁর জায়গায় অন্য কেউ আসতে পারেন। কখনো সেই ব্যক্তি একই কাজ আরও ভালোভাবেও করতে পারেন। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান একজন মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে পারলেও একজন মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

যখন কাজ আর শুধু কাজ থাকে না
অর্থপূর্ণ কাজ মানুষের জীবনে গভীর উদ্দেশ্যবোধ তৈরি করতে পারে। নিজের কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের উপকার করা, কোনো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখা কিংবা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অনুভূতি অত্যন্ত শক্তিশালী।
তবে কাজ থেকে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া আর কাজের মাধ্যমে নিজের মূল্য প্রমাণ করার চেষ্টা—দুটি এক বিষয় নয়।

অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করার বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নেতাদের জন্য শক্তি ও কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা ও বিভিন্ন নেতার অভিজ্ঞতা দেখায়, একজন নেতার ব্যক্তিগত পরিচয় যখন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে মিশে যায়, তখন ঝুঁকিও তৈরি হয়।

গবেষণার তথ্য এমন একটি বিষয়কে সমর্থন করে, যা অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারেন—যেসব নেতা মানসিক, আবেগগত ও শারীরিকভাবে ভালো থাকেন, তাঁরা সাধারণত তাঁদের কাজও ভালোভাবে করতে পারেন। অর্থাৎ নেতাদের যত্ন নেওয়া শুধু মানবিকতার বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সঙ্গেও যুক্ত।

সমস্যা শুরু হতে পারে তখন, যখন প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রয়োজনীয় বা অপরিহার্য হওয়াই একজন নেতার নিজের মূল্য বোঝার প্রধান উপায় হয়ে ওঠে। তখন অন্যকে দায়িত্ব দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। মনে হতে পারে, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া মানে নিজের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া। কাজ থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালেও অপরাধবোধ তৈরি হতে পারে।
তখন আর প্রশ্নটি এটা থাকে না যে অন্য কেউ কি কাজটি করতে পারবে? বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—‘অন্য কেউ যদি কাজটি করতে পারে, তাহলে আমার গুরুত্ব কোথায়?’

নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই পুরো পরিচয় নয়
নিজেকে একজন নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া স্বাভাবিক। নেতৃত্বের ভূমিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকার অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নেতৃত্বের পরিচয়ের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ব্যক্তিরা কর্মক্ষেত্রে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারেন এবং নিজেদের কাজের ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে শক্তিশালী অনুভূতি পেতে পারেন।

কিন্তু অতিরিক্তভাবে এই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লে আত্মত্যাগ, মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি এবং পারিবারিক জীবনে দ্বন্দ্বও বাড়তে পারে। অর্থাৎ সমস্যা নিজেকে নেতা হিসেবে ভাবার মধ্যে নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন নেতৃত্বের পরিচয় একজন মানুষের কাছ থেকে ক্রমেই আরও বেশি কিছু দাবি করতে শুরু করে।

একজন মানুষ শুধু তাঁর পেশা বা পদবি নন; তিনি একই সঙ্গে বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা একটি সম্প্রদায়ের সদস্য হতে পারেন। তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ, সম্পর্ক, দায়িত্ব ও স্বপ্নও তাঁর পরিচয়ের অংশ। এসব পরিচয় যত বৈচিত্র্যময় হয়, জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা সংকট তত সহজে পুরো অস্তিত্বকে গ্রাস করতে পারে না।

মনোবিজ্ঞানী প্যাট্রিশিয়া লিনভিলের ‘সেলফ-কমপ্লেক্সিটি’ বা নিজের পরিচয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষের পরিচয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে, তাঁরা কঠিন পরিস্থিতির পর মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে থাকেন।
তাই একজন মানুষের জীবনে কাজের বাইরের সম্পর্ক, দায়িত্ব, আগ্রহ ও অভিজ্ঞতার জায়গা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

পরিবারের জন্য সময় মানে শুধু কাজের দক্ষতা বাড়ানো নয়
অনেক সময় পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেও কাজের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। বলা হয়, পরিবারকে সময় দিলে মানসিক চাপ কমে, মন ভালো থাকে এবং শেষ পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে পারফরম্যান্সও ভালো হয়।

এটি সত্য হতে পারে। কিন্তু পরিবারকে সময় দেওয়ার গুরুত্ব এর চেয়েও বড়। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো গুরুত্বপূর্ণ শুধু একজন মানুষকে আরও ভালো নেতা বা কর্মী বানানোর জন্য নয়; সন্তানের কাছে একজন মানুষ বাবা বা মা বলেই গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ব্যস্ত নেতা নিয়মিত কাজ থেকে কিছুটা সময় বের করে সন্তানদের সঙ্গে থাকতে পারেন। ফোন বন্ধ করে তাঁদের সঙ্গে খেলতে পারেন, পার্কে যেতে পারেন কিংবা শুধু তাঁদের পাশে বসে থাকতে পারেন।

এই সময়কে যদি কেবল কর্মদক্ষতা বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর আসল অর্থটাই হারিয়ে যায়। কারণ, সন্তানেরা কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপায় নয়। পরিবার কোনো কর্মক্ষেত্রের পারফরম্যান্স টুলও নয়। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মূল্য রয়েছে নিজের জায়গাতেই।

গ্রিনহাউস ও পাওয়েলের ‘ওয়ার্ক-ফ্যামিলি ইনরিচমেন্ট’ বা কাজ ও পারিবারিক জীবনের পারস্পরিক ইতিবাচক প্রভাববিষয়ক গবেষণা দেখায়, জীবনের একটি ক্ষেত্রের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা অন্য ক্ষেত্রের জীবনমান ও কাজের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তাই কাজের বাইরের অর্থপূর্ণ জীবনকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য কারও অপরাধবোধে ভোগার প্রয়োজন নেই।

প্রতিষ্ঠান আপনাকে বদলে দিতে পারে
একটি কঠিন সত্য মেনে নেওয়া প্রয়োজন—কোনো নেতা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেলে তাঁর জায়গায় অন্য কেউ আসতে পারেন। নতুন ব্যক্তি হয়তো ভিন্ন দক্ষতা নিয়ে আসবেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি আগের ব্যক্তির চেয়েও ভালোভাবে কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

কিন্তু এর মাধ্যমে যা প্রমাণিত হয় তা হলো, একটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা, একজন মানুষের মূল্য নয়। একজন মানুষের পেশাগত ভূমিকা পরিবর্তনযোগ্য হতে পারে। কিন্তু তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং একজন মানুষ হিসেবে তাঁর অস্তিত্ব—এসব কোনো প্রতিষ্ঠানের পদবি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং ভালো নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা একজন নেতার অনুপস্থিতিতেও চলতে পারে।

একজন নেতা যদি এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন, যেখানে তাঁর অনুপস্থিতিতেও কাজ এগিয়ে যায়, সেটিই তাঁর নেতৃত্বের সাফল্যের অন্যতম প্রমাণ। কিন্তু যদি নিজের গুরুত্বের অনুভূতি নির্ভর করে এই বিশ্বাসের ওপর যে ‘আমাকে ছাড়া প্রতিষ্ঠান চলবে না’, তাহলে প্রতিষ্ঠানের জন্য যেসব ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, সেগুলোই ব্যক্তিগতভাবে হুমকি মনে হতে পারে।
দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া তখন দুর্বলতা মনে হতে পারে। অন্য কাউকে সামনে আনা কঠিন হয়ে যেতে পারে। ছুটি নেওয়া কিংবা কাজ থেকে দূরে থাকা অপরাধবোধ তৈরি করতে পারে।

নিজের মূল্য প্রমাণের দায়িত্ব কাজের নয়
আপনার কাজের চেয়েও আপনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এই কথার অর্থ কাজকে কম গুরুত্ব দেওয়া নয়।

কাজ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মানুষের জন্য করা কোনো উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু কোনো কাজের গুরুত্ব কখনোই সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।

একজন মানুষ কোনো প্রতিষ্ঠানে যতটা প্রয়োজনীয়ই হোন না কেন, তাঁকে তাঁর কাজের ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। কোনো প্রকল্প ব্যর্থ হলে তাঁর মূল্য কমে যায় না। কোনো দায়িত্ব অন্য কেউ ভালোভাবে পালন করলে তাঁর গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিষ্ঠান তাঁকে বদলে দিতে পারলেও একজন মানুষ হিসেবে তাঁর মূল্য কমে যায় না। টেকসইভাবে নেতৃত্ব দিতে হলে তাই কাজের বাইরের পরিচয় ও সম্পর্কগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পরিবার, বন্ধুত্ব, ব্যক্তিগত আগ্রহ, সামাজিক সম্পর্ক, দায়িত্ব এবং কাজের বাইরের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—নেতৃত্ব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু পুরো জীবন নয়।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে