জীবনের লক্ষ্য পূরণে নিজেকে যে তিনটি প্রশ্ন করা জরুরি
যখন আমরা জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করি, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমাদের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা ও ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করে। ভবিষ্যতে লক্ষ্য অর্জন করার পর আমাদের মধ্যে কী কী পরিবর্তন হবে, সেই ভেবে পুলকিত হই। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করার সময় এটাই সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত। তারপর কয়েক সপ্তাহ পর বাস্তবতা এসে ধরা দেয়।
জীবনের লক্ষ্য পূরণের জন্য সময় খুঁজে বের করাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রাত্যহিক জীবনের অন্যান্য বিষয় এসে সেই জায়গা দখল করে নেয়। তখন লক্ষ্য পেছনে পড়ে যায়। এর কারণ এটা নয় যে আমরা লক্ষ্যের প্রতি সিরিয়াস নই, অনুপ্রাণিত নই, অথবা আমাদের মধ্যে শৃঙ্খলার অভার রয়েছে। এর কারণ, লক্ষ্য পূরণের জন্য যা কিছু দরকার, জীবনে যে পরিবর্তন দরকার, সেটা আমরা অনেক সময় বুঝতে ভুল করি বা বুঝতে পারি না।
লক্ষ্য নির্ধারণ করে আপনি জীবনে কী অর্জন করতে চান, আর সেটা কীভাবে অর্জন করতে চান—তা আপনাকে কেউ বলে দেবে না। এখানেই অনেকে বুঝতে ভুল করে। মানুষ মনোযোগ দেয় লক্ষ্যে এবং আশা করে যে সেই লক্ষ্যের কথা কোনো একটি নোটে লিখে তা কোথাও সেঁটে রাখলে আপনাআপনি পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক দুই মাস পরের কোনো এক বুধবার বিকেলে আপনি যখন স্ট্রেসে পড়বেন এবং কাজ ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করবেন, তখন কী করবেন, এটা জানার থেকেও আপনি জীবনে কী চান, সেটা জানা সম্পন্ন ভিন্ন বিষয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের নির্দিষ্ট ও চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য পূরণের জন্য তখনই আপনার কাজের পারফরম্যান্স ভালো হবে, যখন পরিকল্পনা এবং সেই অনুযায়ী কাজের সঠিক সমন্বয় ঘটবে। যখনই আপনি আপনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলবেন, সঙ্গে সঙ্গেই কাজে নেমে পড়তে হবে।
জীবনের লক্ষ্যকে কাজে পরিণত করার জন্য তিনটি প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: কেন জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ?
যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবেন লক্ষ্য কী, পরের ধাপই হলো এটা স্পষ্ট করা যে কেন আপনি এই লক্ষ্য পূরণ করতে চান। এই প্রশ্ন আপনাকে সত্যিকারভাবে ভাবাবে কেন এই লক্ষ্য আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি আপনার লক্ষ্য হয় ৬ মাসে ২০ কেজি ওজন কমানো, তাহলে আসল কারণটা হয়তো শুধু ওজনের সংখ্যা নয়। সেটা হতে পারে তরুণদের সঙ্গে খেলতে পারার মতো শক্তি পাওয়া, তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারা, কিংবা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কাটানো। আপনার কাছে কোন বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, সেটার সঙ্গে যদি জীবনের লক্ষ্যের সংযোগ থাকে, তখন তা আরও স্থায়ী হয়। এখানে প্রশ্নের ‘কেন’ লক্ষ্য পূরণের জন্য আপনাকে প্রতিনিয়ত তাড়না দেবে।
আর যদি ‘কেন’–এর সঠিক অর্থ খুঁজে না পান, তাহলে লক্ষ্য নিয়ে আপনার আবার ভাবা উচিত। নিশ্চিত করুন আপনার ‘কেন’ গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা প্রাধান্যের মধ্যে সবার ওপরে রাখবেন।
প্রশ্ন ২: লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোন চর্চাটি ধারাবাহিকভাবে করে যেতে হবে?
যখন লক্ষ্য সম্পর্কে এবং কেন এটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে, তখন পরবর্তী ধাপ হলো লক্ষ্য অর্জনের পথে লেগে থাকার জন্য কোন অভ্যাসের চর্চা আপনাকে নিয়মিত করে যেতে হবে, তা খুঁজে বের করা। এখানেই অনেক ভালো লক্ষ্য ব্যর্থ হয়ে যায়।
উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা ভালো হলেও সেটা আসলে স্পষ্ট করে না আপনি কী করবেন। যদি পদক্ষেপ ও কাজ স্পষ্ট না হয়, তাহলে পথচলার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। যেমন ‘আরও বেশি ব্যায়াম করব’ বলার বদলে লক্ষ্য হতে পারে, ‘সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে হাঁটব।’
যদি আপনার লক্ষ্য অর্জনের পথের কাজ ধারাবাহিক না হয়, তাহলে বুঝতে হবে—সেটা আসলে লক্ষ্য ছিল না, ছিল কেবল ইচ্ছা।
প্রশ্ন ৩: লক্ষ্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বেশি কী বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং সেটা হলে কী করব?
লক্ষ্য অর্জনের পথ খুব কম ক্ষেত্রেই মসৃণ হয়। তাই বাধা বা পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক বলেই ধরে নিতে হবে।
মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলা ওটিঙ্গেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যদি শুধু ভালো ফলের কথা ভাবে, কিন্তু বাস্তব বাধাগুলো নিয়ে না ভাবে, তাহলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। কারণ, বাধাগুলো আগে থেকে ভাবা না থাকলে, চ্যালেঞ্জ এলেই মানুষ সহজে হাল ছেড়ে দেয়। তাই বাধা আসার আগেই সেগুলো কেমন হতে পারে, তা ভেবে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। হতাশ না হয়ে বাস্তববাদী হতে হবে।
গ্যাব্রিয়েলা ওটিঙ্গেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের কথা বলেন। সেটা হলো, কোন কোন বাধা আপনার কাজটা শেষ পর্যন্ত করতে বাধা দিতে পারে, তা আগে থেকেই চিহ্নিত করা। এই বাধাগুলো সাধারণত বাইরের নয়, ভেতরের হয়। বেশির ভাগ সময় ক্লান্তি, একঘেয়েমি, চাপ বা নিজের ওপর সন্দেহই আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে বাধা দেয়।
সম্ভাব্য বাধা চিহ্নিত করার পরের ধাপ হলো, সেটা এলে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, তা আগেই ঠিক করে রাখা। মনোবিজ্ঞানী পিটার গলভিটজার দেখেছেন, সহজ (যদি-তাহলে) পরিকল্পনা বানালে কাজ শেষ পর্যন্ত করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এমন একটি পরিকল্পনা মানে, আগেই নিজের প্রতিক্রিয়াটা ঠিক করে রাখা।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি সকালে উঠে শরীর খুব ক্লান্ত লাগে এবং ব্যায়াম করতে ইচ্ছা না করে, তাহলে পুরো ব্যায়াম বাদ না দিয়ে পাঁচ মিনিট স্ট্রেচিং করা এবং পাঁচ মিনিট হাঁটা।
এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে তখন আর আলাদা করে অনুপ্রেরণার ওপর নির্ভর করতে হয় না। বাধা এলেই নতুন করে ভাবতে হয় না। কারণ, সিদ্ধান্তটা আগেই নেওয়া থাকে। এই ছোট্ট ধাপ নিয়মিতভাবে কাজ শেষ করার এবং লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা বাড়ায়।
উদ্দেশ্য থেকে বাস্তব কাজে
মানুষের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার মূল কারণ অনুপ্রেরণা বা শৃঙ্খলার অভাব নয়। বেশির ভাগ সময় তারা শুধু ইচ্ছা করেই থেমে যায়। বাস্তবে কীভাবে সেটা ধরে রাখবে, তার পরিকল্পনা করে না।
শুরুর দিকে সবাই অনেক স্বপ্ন দেখে। নতুন শুরুর উত্তেজনায় ভরে থাকে, সম্ভাবনাগুলো নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়। কিন্তু আসল পরিবর্তন স্বপ্ন দেখায় হয় না। হয় সেই কাজগুলোতে, যেগুলো আপনি নিয়মিত করে যান। এই সময়গুলোর জন্য আগেই পরিকল্পনা করলে শুধু লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনাই বাড়বে না, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের ওপর বিশ্বাসও গড়ে উঠবে।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে