কর্মস্থলে নিজেকে উপেক্ষিত মনে করছেন? কী করবেন

কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পরিবেশ কিংবা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনুভব অনেকেই করেনছবি: এআই/বন্ধুসভা

আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যাঁরা নিজ কর্মস্থল বা সংগঠনে অনুভব করেন, ‘আমার কথা কেউ শুনছে না’, বা ‘আমাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।’ সেটা বস বা নেতার পক্ষ থেকে হতে পারে, আবার সহকর্মীদের পক্ষ থেকেও। নিজেকে তখন খুবই একাকী মনে হয়। ইচ্ছা করে দ্রুতই স্থানটি ত্যাগ করতে। মনে হয়, যেখানে গুরুত্ব কম, সেখানে না থাকাই ভালো।

কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পরিবেশ কিংবা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনুভব করাটা খুবই সাধারণ সমস্যা। জন্মের পর থেকেই আমরা চাই, কেউ না কেউ আমাদের দিকে খেয়াল করুক—হোক সে মা–বাবা, ডাক্তার, নার্স, বন্ধু, বস, সহকর্মী, প্রিয়জন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফলোয়াররা। কারণ, আপনি যতই স্বাধীন হন না কেন, অন্যরা আপনাকে কীভাবে দেখে বা দেখে না—তার ওপর আপনার আত্মপরিচয়, নিরাপত্তাবোধ ও সুখ অনেকটাই নির্ভর করে।

এ কারণেই অনেকে মিটিং, পার্টি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে ডেটে গেলে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে বারবার নিজের কথাই বলতে থাকে। কারণ, সত্য হলো সবচেয়ে জোরে কথা বলা মানুষটিই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পায়; হোক সে যোগ্য কিংবা অযোগ্য। আর এ জায়গাটাতেই যে কম কথা বলে সে পিছিয়ে পড়ে, নিজেকে উপেক্ষিত মনে হয়।

গুরুত্ব না পাওয়ার আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে। সেটা হতে পারে আপনার লিঙ্গ পরিচয়, জাতিগত পরিচয়, স্বভাব, লক্ষ্য বা চিন্তা। এগুলো যদি অন্যদের সঙ্গে না মেলে, তখন তারা আপনাকে গুরুত্ব কম দিতে পারে। যদিও এমনটা হওয়া উচিত নয়, তবু কোথাও কোথাও বাস্তবতা এটাই। আবার এমন অনেক নেতা বা বস আছেন যাঁরা কেবল তাঁর মতের পক্ষের মানুষদেরই গুরুত্ব দেন। টিমের অন্যদের ব্যাপারে তেমন মনোযোগী হন না। তখন মনে হতে পারে, কিছুই করার নেই। কারণ, মানুষ যা দেখতে বা শুনতে চায় না, তা তাদের দেখানো বা শোনানো কঠিন।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে থাকে। হয়তো বন্ধু, পরিবার বা প্রিয়জন আপনাকে সত্যিকারে জানার চেষ্টা করছে না, আপনার কথা মন দিয়ে শুনছে না। তখন নিজের মধ্যে একধরনের অসহায়ত্ব কাজ করে।

আরও পড়ুন

করণীয় কী
কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কেমন হবে, তা অনেক সময় সেখানকার নেতৃত্বে যিনি রয়েছেন তাঁর ওপর নির্ভর করে। একজন ভালো নেতার বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি তাঁর সব কর্মীর দিকে সমান মনোযোগ দেবেন—সবার কথা শোনা, সমস্যার সমাধান করা, উৎসাহ দেওয়া। নেতার উচিত নিজ থেকে বলা, ‘তোমার সম্পর্কে জানতে চাই; কাজ কেমন চলছে; কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছ কি না;’ ইত্যাদি। কোনো ভালো কাজ করলে সেটাকে কীভাবে আরও ভালো করা যায়, সে বিষয়ে মাঝেমধ্যে নিজ থেকে পরামর্শ দেওয়া।

কিন্তু বাস্তবে কজন নেতা কাজটি করেন? অনেকেই এত ব্যস্ত থাকেন যে সব কর্মীর দিকে সমান মনোযোগ দিতে পারেন না। কেউ কেউ মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না।

তাই আপনি যদি সংগঠন বা কর্মস্থলে নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন, তাহলে প্রথমেই নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলুন। তাঁকে সরাসরি বলুন, ‘মনে হচ্ছে কেউ আমাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না বা দিতে চাচ্ছে না; এমন ভালো কাজ করা সত্ত্বেও।’এতে বোঝা যাবে, গুরুত্ব না পাওয়ার বিষয়টি সত্যিই ভুলবশত, নাকি ইচ্ছাকৃত। যদি নেতা সত্যিই আপনাকে গুরুত্ব দেন, তাহলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করবেন, মন দিয়ে শুনবেন এবং সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন।

আর যদি তিনি আবার নিজের কথাই শুধু বলে যান এবং বলেন, ‘আমি তো তোমাকে গুরুত্ব দিই’; কিংবা উল্টো দোষ আপনার ঘাড়ে চাপান—তাহলে আপনি উত্তর পেয়ে গেছেন। তিনি আসলে সমস্যাটাই বাড়াচ্ছেন। আপনি নিজেকে উপেক্ষিত মনে করছেন যে সেটাও তাঁর কাছে এই মুহূর্তে গুরুত্বহীন।

একই বিষয় ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য—যেমন বন্ধু বা প্রিয়জনের ক্ষেত্রে। তবে সেখানে দুজনের ক্ষমতা প্রায় সমান, তাই দায়িত্বও দুজনের। তখন কথোপকথন এমন হতে পারে—‘এই সম্পর্কে আমি নিজেকে একা অনুভব করছি। মনে হচ্ছে তুমি আমাকে আজকাল পাত্তা দিতে চাচ্ছ না। আমি কি কোনো ভুল করছি? করে থাকলে বলো, শুধরে নেব; অথবা কীভাবে সম্পর্কটাকে আবার স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারি।’ যদি গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সেই মানুষটিও তখন আপনাকে বুঝতে চাইবেন এবং সমাধানের চেষ্টা করবেন।

আর যদি কথা বলার পরও নিজেকে উপেক্ষিত মনে হয়, তাহলে সেখান থেকে সরে আসার সময় হয়েছে। মনে রাখবেন, আপনি ধুলোর স্তূপ নন, যাকে কার্পেটের নিচে ঝেঁটিয়ে রাখা যাবে। অনেক দিন ধরে উপেক্ষিত থাকা মানসিক, এমনকি শারীরিক ক্ষতিও করতে পারে। জীবন খুবই ছোট। যারা আপনাকে সত্যিকারে দেখতে বা শুনতে চায় না, তাদের পেছনে সময় নষ্ট করার মানে নেই।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে