গল্পের প্রাণ গল্পেই: আনিসুল হকের লেখালেখির পাঠ
‘ভালো লেখকের কোনো সংজ্ঞা নেই। ভালো লেখক হতে হলে লেগে থাকতে হবে।’
—আনিসুল হক
এই সহজ অথচ গভীর কথাতেই যেন লেখকজীবনের মূলমন্ত্র তুলে ধরলেন এই কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত লেখালেখি কর্মশালার দ্বিতীয় ক্লাসে গল্প ও কথাসাহিত্যের নানা দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন আনিসুল হক। ১৭ জুলাই, রাত ৮টায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণ সেশনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লেখালেখিতে আগ্রহী তরুণ-তরুণীরা অংশ নেন। গল্প রচনার কৌশল, সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা এবং একজন লেখকের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
আনিসুল হক বলেন, ‘একজন ভালো লেখক হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সূত্র নেই। প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন অধ্যবসায়। নিয়মিত পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন লেখার চর্চাই একজন লেখককে পরিণত করে। মাঝপথে ব্যর্থতা আসতেই পারে, কিন্তু তাতে থেমে গেলে চলবে না। বরং ব্যর্থতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে যেতে হবে।’
লেখালেখির উদ্দেশ্য নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন আনিসুল হক। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘লেখার উদ্দেশ্য কখনোই কেবল অর্থ উপার্জন হওয়া উচিত নয়। মানুষের কল্যাণ, সৌন্দর্যবোধের বিকাশ এবং সমাজকে সমৃদ্ধ করাই হওয়া উচিত একজন লেখকের প্রধান লক্ষ্য। এই পথ সহজ নয়, তবু নিষ্ঠার সঙ্গে লিখে যেতে হবে।’
আনিসুল হক অংশগ্রহণকারীদের বিশ্বসাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ বাংলা সাহিত্যের বহু প্রথিতযশা লেখকের রচনা পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁদের লেখার ভাষা, বর্ণনাশৈলী, চরিত্র নির্মাণ ও গল্প বলার কৌশল থেকে নতুন লেখকেরা অনেক কিছু শিখতে পারেন বলে এই সাহিত্যিক উল্লেখ করেন।
গল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘গল্পকে গল্প হয়ে উঠতে হবে। অর্থাৎ গল্পে এমন একটি ঘটনাপ্রবাহ থাকতে হবে, যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবে। গল্পের ভেতরে থাকতে হবে রস—সেটি হাস্যরস, বেদনারস, বিস্ময় কিংবা অন্য যেকোনো অনুভূতির হতে পারে। পাঠকের মনে আবেগের সঞ্চার ঘটাতে না পারলে গল্প পূর্ণতা পায় না।’
প্রশিক্ষণের শেষ পর্বে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আনিসুল হক। গল্প লেখা, চরিত্র নির্মাণ, ভাষার ব্যবহার এবং প্রকাশের প্রস্তুতিসহ নানা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দেন। প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ দিনের সেশন।
লেখালেখি কর্মশালার সমন্বয় করেন বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের বইমেলা ও ম্যাগাজিন সম্পাদক সৌমেন্দ্র গোস্বামী। নতুন লেখকদের জন্য এমন আয়োজন শুধু লেখার কৌশল শেখার সুযোগই নয়, বরং সাহিত্যচর্চার প্রতি আরও গভীর অনুপ্রেরণা জোগাবে বলেই মনে করেন অংশগ্রহণকারীরা। আনিসুল হকের বক্তব্যের মূল বার্তাও ছিল একটাই—ভালো লেখক হওয়ার কোনো শর্টকাট নেই; পড়তে হবে, লিখতে হবে, আর নিরলসভাবে লেগে থাকতে হবে।
উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা