ফারুক মঈনউদ্দীনের অনুবাদ ভাবনা: প্রত্যেকেই একজন অনুবাদক

ফারুক মঈনউদ্দীন

‘আমরা প্রত্যেকেই একজন অনুবাদক’—অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীনের এই কথা শুনে কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলাম। এত দিন অনুবাদ বলতে বুঝতাম এক ভাষার লেখা অন্য ভাষায় রূপান্তর করা। কিন্তু লেখালেখি কর্মশালার অনুবাদ সেশন শেষে উপলব্ধি করলাম, অনুবাদ আসলে মানুষের চিন্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্যে এক জীবন্ত সেতুবন্ধ।

তরুণ লেখক বন্ধুদের লেখালেখিতে দক্ষ করে তুলতে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ভার্চ্যুয়াল লেখালেখি কর্মশালার প্রথম সেশনে অনুবাদ বিষয়ে আলোচনা করেন অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীন। ১০ জুলাই রাত ৮টায় এটি অনুষ্ঠিত হয়।

সেশনে ফারুক মঈনউদ্দীন অনুবাদকে কেবল ভাষাগত দক্ষতা নয়; বরং একটি সৃজনশীল শিল্প হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা যখন মনের ভাবকে কথায় বা লেখায় প্রকাশ করি, তখনো একধরনের অনুবাদ ঘটে—চিন্তা থেকে ভাষায় রূপান্তরের অনুবাদ।’

তাঁর আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—অনুবাদ কখনোই শুধু শব্দের নয়, ভাবের। একটি শব্দ অভিধানে যে অর্থ বহন করে, বাস্তব ব্যবহারে তার অর্থ ভিন্ন হতে পারে। অনুবাদকের প্রথম কাজ প্রসঙ্গ বোঝা। যেমন ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’ আক্ষরিকভাবে ‘পাউরুটি ও মাখন’ হলেও এর প্রকৃত অর্থ জীবিকার প্রধান উৎস। বাংলায় এর যথার্থ রূপ ‘রুটি-রুজি’। আবার ‘রিটায়ারিং’ কিংবা ‘পিরিয়ড’ একই শব্দ ভিন্ন প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থ বহন করে। এসব উদাহরণ বুঝিয়ে দিয়েছে অনুবাদে ভাষাবোধই সবচেয়ে বড় শক্তি।

সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে অনুবাদের সাংস্কৃতিক দিক নিয়ে আলোচনা। একটি ভাষার বাগ্‌ধারা, রসিকতা বা শব্দখেলা অন্য ভাষায় হুবহু তুলে ধরা যায় না। শিবরাম চক্রবর্তীর বিখ্যাত উক্তি—‘এই গাড়ির হর্ন ছাড়া সবই বাজে’–এর দ্ব্যর্থবোধক রস অনুবাদ করতে হলে শুধু ভাষা জানলেই হবে না, জানতে হবে সেই ভাষার সংস্কৃতি, প্রেক্ষাপট ও রসবোধের ভেতরের জগৎও। অর্থাৎ একজন অনুবাদক কেবল ভাষান্তরকারী নন, তিনি দুই সংস্কৃতির মধ্যকার এক নীরব সেতুবন্ধ।

আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—দক্ষ অনুবাদক হতে হলে দুটি ভাষার ওপর সমান দখলের পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনধারা সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান থাকতে হয়। অনুবাদের মাধ্যমে শুধু বাক্য নয়, একটি সভ্যতার অভিজ্ঞতাও অন্য ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন

আজকের বিশ্বে অনুবাদের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, আইন, প্রযুক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই অনুবাদ জ্ঞান বিনিময়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনুবাদের কাজকে সহজ করলেও মানুষের সংবেদনশীলতা, রসবোধ ও সাংস্কৃতিক উপলব্ধির বিকল্প এখনো হয়ে উঠতে পারেনি।

এই সেশন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—ভালো লেখক হতে হলে শুধু ভাষাজ্ঞানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গভীর পর্যবেক্ষণ, সৃজনশীল চিন্তা, নিয়মিত পাঠ ও অনুশীলন। অভিজ্ঞ লেখকদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ, সহলেখকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং নিয়মিত চর্চার অনুপ্রেরণা লেখালেখির পথকে আরও সমৃদ্ধ করে। অনুবাদচর্চা সেই আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।

দুই ঘণ্টাব্যাপী এই প্রশিক্ষণ শেষে আমার কাছে লেখালেখি আর শুধু শব্দ সাজানোর কাজ নয়, এটি মানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে দেখার একটি জানালা। সেই জানালা খুলে দেওয়ার জন্য প্রথম আলো বন্ধুসভার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে লেখকবন্ধুদের জন্য এক অনন্য প্রাপ্তি। ভবিষ্যতের লেখালেখির পথে এই অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সাবেক সভাপতি, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা