বাইরে থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। মন ভালো নেই। কীভাবে অফিস ফাঁকি দেওয়া যায়, তা ভাবতে ভাবতে ছোটবেলার স্কুলে যাওয়ার আগে পেটব্যথার কথা মনে পড়ে গেল রোদ্দুরের। ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বসকে কল। এরপর গড়গড় করে একগাদা মিথ্যা বলে দিল। মনে মনে ভাবছে, মাঝেমধ্যে নিয়মের বাইরে গিয়ে জীবনকে উপভোগ করতে হয়। আজকে সে তা–ই করবে। নিজের মিথ্যা বলার কনফিডেন্স দেখে নিজেই হাসছে। এভাবে শেষ কবে মিথ্যা বলেছে, মনে পড়ছে না।
বাসা থেকে বেরিয়ে আনমনে রাস্তা দিয়ে একা একা হাঁটছে। কোথায় যাবে, গন্তব্য অজানা। বৃষ্টি তখন নেই বললেই চলে। শীতল বাতাসে শরীর কিছুটা কাঁপুনি দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে গা কাঁটা দিয়ে উঠছে। সেদিকে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ নেই। হাঁটতে ভালোই লাগছে; যদিও তার প্রতিদিন হাঁটা হয়। বাজারে যাওয়া হয়। দৌড়ে বাস ধরা হয়। কিন্তু আজকের হাঁটাটা মনে হচ্ছে নিজের জন্য হাঁটছে। নিজেকে উপলব্ধি করতে পারছে পুরোপুরি। স্পষ্ট দেখতে পারছে, কীভাবে গাছের পাতা বেয়ে পানির ফোঁটা মাটিতে পড়ছে।
আজকে তার মানুষ দেখার দিন, প্রকৃতি দেখার দিন। রবীন্দ্র সরোবরের এদিকে এসে চুপচাপ বসে থাকল সে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল। ফ্লাস্কে করে চা–ওয়ালা এল।
-চা দিব?
-হ্যাঁ, দিতে পারেন। তবে দুই কাপ।
-জি, আচ্ছা।
-দুই কাপ কেন জিজ্ঞেস করলেন না?
-তা জিগাইয়া আমার কী কাম। আপনি চাইছেন, আমি দিতাছি।
-তা ঠিক। বসো এদিকে। এক কাপ তুমি খাও, অন্যটা আমাকে দাও।
কিছুটা হতভম্ব হলেও সে এ ব্যাপারে অভ্যস্ত, সেটা বোঝা গেল।
-একটা কথা কই, কিছু মনে কইরেন না। আপনাগো মতিগতি বুঝি না ঠিক। হেই দিন একজনে এক কাপ চা খাইয়া ১০০ টাকার নোট দিয়া কইতাছে, রেখে দিন পুরোটা। আইজক্যা আপনি আবার চা খাওয়ার কথা কইতাছেন।
-হা হা। এটা তেমন কিছু না। মানুষ মাঝেমধ্যে অদ্ভুত কাজ করতে পছন্দ করে।
-কী জানি। আমাগো ছোট মাথা। এত কিছু ঢুকে না।
বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সে চলে গেল। রোদ্দুর আবার একা। দূরেই একটা জুটি বসে আছে মুখ ফুলিয়ে। সম্ভবত অভিমান পর্ব চলে। ছেলেটা বেশ কয়েকবার হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছে। তবু খুব একটা ফল হয়নি। নীরব স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। দূর থেকে বিষয়টি বেশ ভালো লাগছে। মনে মনে সে–ও হাসছে। নিজের একটা প্রেমিকা থাকলে তারও মনে হয় এমন করতে হতো। খুশির ব্যাপার হলো, মেয়েটা হঠাৎ অভিমান ভুলে হাসতে শুরু করল। পাশেই অন্য আরেকটা জুটি বসা। ছেলেটার কাঁধে মাথা রেখে মেয়েটা ন্যাকাবোকা হয়ে বসে আছে। বেচারা প্রেমিক অন্য আরেকটা মেয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
এরই মধ্যে একজন এসে হাত পাতে। সকাল থেকে খায়নি। কিছু টাকা দেওয়ার জন্য। এদের ভালো করেই চেনা তার। তবু পিছু নিতে ইচ্ছা করল। অনেকটা শখের গোয়েন্দাগিরির মতো। তা ছাড়া এক জায়গায় বসে থেকে হাত–পা জমে গেছে। একটু হাঁটাহাঁটিও করা দরকার। নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে ছেলেটার পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। কেউ কেউ ৫, ১০ টাকা দিচ্ছে আবার অনেকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে। বেচারা হাল ছাড়ছে না। একেক করে সবার কাছেই যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে দু–একজনে আবার বাদ দিচ্ছে। হয়তো সে জানে এখানে গিয়ে লাভ নেই। এক পাখিপ্রেমীর কাছে হাত পাততেই সে পাশের দোকানে নিয়ে গেল। এরপর পেট ভরে খাইয়ে দিল। খুব একটা উপকার হলো বলে মনে হয় না। সে কিছুক্ষণ জিরিয়ে আবার আগের পথে হাঁটতে শুরু করল। একই কথা, সকাল থেকে খায়নি কিছু, কয়েকটা টাকা দেন।
পাশেই কলেজপড়ুয়া কয়েকটা ছেলেমেয়ের একটা জটলা ছিল। সেটা এখন বেশ জমে উঠেছে। নিজেদের মতো করে সময়টা উপভোগ করছে। হাতাহাতি, কথার যুদ্ধ, টিটকারি—সব চলছে। কেউ আবার গিটার নিয়ে এসে গান জুড়ে বসল, ‘এমন যদি হতো আমি পাখির মতো’। আহামরি গানের গলা নেই। কিন্তু উন্মাদনা আছে, মাদকতা আছে৷ ভালো লাগছে শুনতে।
ফেরার পথে একজনের দিকে তাকিয়ে চোখ আটকাল। নীল শাড়ি পরা এক তরুণী বসে আছে। চেহারায় স্নিগ্ধতা ফুটে আছে। খোঁপায় গন্ধরাজ গোঁজা। কিছুটা লালচে হয়ে গিয়েছে। আজ সম্ভবত তার জন্মদিন। ঠিক জন্মদিন কি না, তা–ও জানে না রোদ্দুর। আন্দাজ করছে। যেতে চেয়েও কিছুক্ষণের জন্য সে বসল। দেখতে ভালো লাগছে। পাশেই একটা মেয়ে ফুল বিক্রি করছিল। গোটা বিশেক ফুল হবে আছে তার কাছে। দাম জিজ্ঞেস করতেই হিসাব করে বলল, ৭০ টাকা। রোদ্দুর ১০০ টাকার একটা নোট বের করে দিয়ে বলল, এটা রাখো। ওই যে মেয়েটা বসে আছে, তার কাছে ফুলগুলো দিয়ে দেবে। এরপর সে উঠে গিয়ে কিছুটা আড়াল হলো। দূর থেকে দেখছে, কী হয় ব্যাপারটা।
তরুণী বেশ রাগান্বিতই হলো। কে ফুল দিয়েছে, তা জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা ইশারা করল; কিন্তু ওই জায়গায় কেউ নেই। রোদ্দুর নিজেও কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে। তরুণী ফুল ফিরিয়ে দিল। কিছুটা দূর আসার পর আবার ডেকে নিয়ে ফুলগুলো রেখে দিল। রোদ্দুরের ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি, বাসার দিকে পা বাড়াল।