পড়ার টেবিলটা বেশ সুন্দর। টেবিলের সামনে সাদা দেয়ালের ওপর ঝুলছে রঙিন এক পোস্টার। পোস্টারে শোভা পাচ্ছে সবুজ পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য। সবুজের ফাঁকে ফাঁকে থোকায় থোকায় ফুটে আছে হলুদ ফুল, ফুল আর ফুল।
পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে রয়েছে লেকভরা স্বচ্ছ পানি। পাহাড়ের সারবাঁধা গাছের প্রতিচ্ছবি টলমল করছে পানির ভেতর। হলুদ ফুলগুলোও মিটিমিটি করে হাসছে ডুবোজলে।
গতকাল টেবিলের সামনে পোস্টারটি ঝুলিয়ে দিয়েছেন মামণি। মুগ্ধ চোখে এই অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য দেখছে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জিদনি। আনন্দে ভরে উঠছে মন। ভালো লাগছে, ভীষণ ভালো লাগছে জিদনির।
আনন্দে থাকলে সুন্দর সুন্দর ইচ্ছা জাগে মনে। ভালো ভালো কাজ করার তাগিদও আসে। জিদনিরও ইচ্ছা হলো সুন্দর ছবি আঁকার।
সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়িং বক্সটা টেনে নিল ও, খাতাও।
হঠাৎই মন তেতো হয়ে উঠল।
বেশ কদিন টেবিলে বসেনি, খেলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। খেয়াল করে দেখেনি সুন্দর টেবিলটায় ধুলো জমে আছে, বইয়ের ওপরও। খাতা টেনে বের করার সঙ্গে সঙ্গে ময়লা উড়তে শুরু করেছে, নাকেও ঢুকেছে। বাজে একটা কাশি শুরু হয়ে গেছে। নাক জ্বলতে শুরু করেছে।
মুহূর্তে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল জিদনি। চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘আকলিমা। এই আকলিমা!’
আকলিমা, গৃহকর্মী, কাজের মেয়ে, দ্রুত ছুটে এসে ওর সামনে দাঁড়াল।
‘টেবিলে এত ময়লা কেন? রোজ পরিষ্কার করতে পারো না?’
‘আফনিই তো টেবিলে হাত দিতে না কইরা দিছেন।’
‘কেন, না করব কেন?’
‘আমি কী জানি, কইছেন, নিজের কাজ নিজে কইরবেন, আমি যেন হাত না দিই।’
হঠাৎই রাগ নিভে গেল জিদনির। কিছুটা লজ্জাও পেল। ঠিকই তো। ও-ই নিষেধ করেছিল, ভুলে গেছে কথাটা।
‘আচ্ছা, যাও।’ আকলিমার দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল ও।
নিজের টেবিল নিজে গোছানোর কাজে মন দিল এবার।
বাহ্! অল্প সময়ে টেবিল ঝকমক হয়ে গেল। মনে আনন্দ-ঢেউ উঠল আবার।
ক্লাস রুটিনের ওপর একবার চোখ বোলাল ও। চমকে উঠল। আগামীকাল ক্লাসে পড়া আছে ‘উড়াউড়া’ মিসের। বাংলা পড়ান উনি। ভীষণ রাগ ওনার। পড়া না পারলে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ক্লাসে। আদরও করেন তিনি। তবে ভুল করলে ক্ষমা নেই। এ জন্য সবাই নাম দিয়েছে ‘উড়াউড়া’।
পড়ার প্রতি মন স্থির করার চেষ্টা চালাল জিদনি।
না, মন স্থির হচ্ছে না। বারবার মন চলে যাচ্ছে অন্যদিকে, খেলার মাঠে।
গতকালের খেলার দৃশ্য ভেসে উঠছে চোখের সামনে, বারবার।
আন্তশ্রেণি ক্রিকেট ফাইনাল চলছে, নবম শ্রেণির সঙ্গে খেলা ছিল। ও হচ্ছে দলের নির্ভরশীল ব্যাটসম্যান। অথচ কিছু বোঝার আগেই ৩ রানের মাথায় আউট হয়ে গেছে।
লেগ স্টাম্পের বাইরে বলটা বাঁক খেয়ে শাঁই করে ভেতরে ঢুকে গেছে, স্টাম্প উড়ে গেছে, বোল্ড!
কিছুতেই দৃশ্যটা চোখের সামনে থেকে সরাতে পারছে না জিদনি। কিছুক্ষণ পরপর বুক খালি করে বের হচ্ছে দীর্ঘশ্বাস।
‘উড়াউড়া’ মিসের কড়া চোখও ভেসে উঠছে। জোর করে তাই পড়ায় মন বসিয়ে পড়তে লাগল আবার। আধঘণ্টার পড়া মুখস্থ করতে সময় লাগল প্রায় দু ঘণ্টা।
॥ দুই ॥
পরের দিনের ঘটনা।
বাংলা ক্লাস চলছে, লাইন ধরে মিস সবাইকে পড়া জিজ্ঞেস করছেন। দুজন ইতিমধ্যে ভুল করেছে। কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে ওরা।
এবার জিদনির পালা।
একি! পঠিত বিষয় ঠিকমতো বলতে পারছে না কেন! দুই লাইন বলার পরই ঠেকে গেছে, মাথা চুলকাতে শুরু করেছে ও।
মিস হোঁচট খেলেন। জিদনি সব সময় পড়া শিখে আসে, আজ পারছে না কেন! ভাবলেন তিনি।
সবার জন্য একই সাজা। ভালো ছাত্র হলেও ওর জন্য সাজা বাতিল করার উপায় নেই। ক্ষুব্ধ চোখে তিনি জিদনির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কান ধরো! ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকো।’
জিদনির চোখ লাল হয়ে উঠেছে। শুকিয়ে গেছে চোখ। একটুও পানি বের হচ্ছে না চোখ থেকে। অপমানে কানও গরম হয়ে উঠেছে। আদেশ অমান্য করার উপায় নেই। দুই হাতে কান ধরে দাঁড়িয়ে রইল ও।
॥ তিন ॥
জিদনির মনের খবর: মনোবিশ্লেষণ
জিদনি ভালো ছাত্র। মেরিট ভালো ওর। আগের পরীক্ষাগুলো সেই স্বীকৃতি বহন করছে।
কিন্তু মেরিট কী, কেনই-বা আজ পড়ার পরও উত্তর দিতে পারল না। স্মরণশক্তি কি কমে যাচ্ছে? বুদ্ধি কি হ্রাস পাচ্ছে ওর?
বিজ্ঞান বলছে, স্মরণশক্তি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন গভীর মনোযোগ। বুদ্ধি বিকাশের পথ সহজতর করা যায় মনোযোগের মাধ্যমে বিষয়বস্তু শেখার মধ্য দিয়ে।
বুদ্ধির সঙ্গে জন্মগত বা জেনেটিক একটি বিষয় জড়িত আছে ঠিকই, পরিবেশের অবদানও অনেক বেশি, সুন্দর পরিবেশ মনকে সতেজ করে, নানাভাবে বুদ্ধি বিকাশের ধারাকে প্রভাবিত করে।
খুব মনোযোগের সঙ্গে যা দেখা বা শোনা হয়, স্মৃতির পাতায় তার ছাপ হয় দৃঢ়, মস্তিষ্কের তথ্য তুলে রাখার কাজটা হয় দীর্ঘস্থায়ী। ফলে সহজে ‘অনেক পঠিত বিষয়’ বা ‘তথ্য’ মনে রাখা যায় দীর্ঘদিন। গবেষণায় দেখা গেছে, মনোযোগী ছাত্রছাত্রীরাই ভালো রেজাল্ট করে।
গুরুজনেরা বলে থাকেন, ‘মন দিয়ে পড়ো। চোখ-কান খোলা রেখে শেখো।’ এই বাক্যটিকে এখন কেবল গুরুজনদের সাদামাটা উপদেশ ভেবে নিলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, উপদেশটির ভেতর লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, মন কী?
সাধারণত বুকের বাম দিকে আলতো করে হাত রেখে আমরা বলি, ‘এই তো এখানে মন।’
না, এ কথা সত্য নয়। এখানে আছে হৃৎপিণ্ড বা হার্ট।
মন হচ্ছে মস্তিষ্কের অংশ, যা আমাদের চিন্তা-চেতনা-আবেগ, বুদ্ধি, মেমোরির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বিষয়বস্তুর ওপর মন বসানোর অর্থ মস্তিষ্কের কাজকে গভীরভাবে চালিত করা, চিন্তা-চেতনা-অনুভূতিকে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর সঙ্গে একাকার করে টেনে নেওয়া।
স্মৃতির ভিত দৃঢ় করতে চোখও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞানের যুগে অডিও-ভিডিও শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত আমরা।
কানে শোনা, চোখে দেখা ও দেখা-শোনার মাধ্যমে মিল ঘটিয়ে যদি কিছু শেখা যায়, তাহলে দীর্ঘদিন মনে থাকে, তা স্মরণ করা যায় সহজে।
চোখের সঙ্গে মস্তিষ্কের রয়েছে সরাসরি সংযোগ। চোখ দৃশ্যমান বস্তুর ইমেজ সৃষ্টি করে। আর ইমেজকে বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্ক। প্রকৃত অর্থে বিশ্লেষণের কারণেই বস্তুটিকে দেখতে পাই আমরা।
জিদনি সুন্দর পাহাড়ের ছবি দেখেছিল, দেখে মন কিছুটা ভালো হয়ে গিয়েছিল ওর, সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত হয়েছিল। কিন্তু টেবিলের ধুলো-ময়লা মনকে তেতো করে তুলেছিল, ক্ষুব্ধ হয়েছে ও। একসময় সৃষ্টিশীল কাজ থেকে দূরে সরে আসে।
ক্লাসের পড়ালেখার প্রতি ইচ্ছার অভাব ছিল না জিদনির। কিন্তু খেলার মাঠের ব্যর্থতা পড়ার টেবিলে তাড়া করছিল। মনোযোগ ধরে রাখতে পারছিল না! যা শিখেছিল, স্মৃতির পাতায় স্থায়ী আসন পায়নি। ফলে ক্লাসে ব্যর্থ হয়েছে জিদনি।
গুরুজনেরা আরেকটা উপদেশ প্রায় দিয়ে থাকেন, ‘খেলার সময় খেলা, পড়ার সময় পড়া।’
এ উপদেশও স্মরণশক্তির বিষয়ে বিজ্ঞানের মূল সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের চাওয়া, পাওয়া, ব্যর্থতা, হতাশা যদি সব সময় মনের ভেতর ঘুরঘুর করতে থাকে, তাহলে মস্তিষ্ক নতুন তথ্য সহজে ধারণ করতে পারে না, ফলে স্মরণশক্তি কমতে বাধ্য।
‘একজন দক্ষ ব্যাটসম্যান হতে হলে প্রতিটি বলের প্রতি মনের সূক্ষ্ম যোগাযোগ সৃষ্টি করতে হবে, তীক্ষ্ণ চোখে বলটি লক্ষ করার ক্ষমতা থাকতে হবে।’ কথাগুলো বলেছেন বিখ্যাত ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার।
এ বাক্যটির ভেতরও কিন্তু লুকিয়ে আছে বিজ্ঞান, লুকিয়ে আছে মন ও চোখ। যে যত বেশি মনের এসব গোপন কাজ ধারালো করতে পারবে, সে তত বেশি জয়ী হবে সব ক্ষেত্রেই।
টেবিলে পড়তে বসে যদি সব চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে বইয়ের সঙ্গে মনকে আটকানো যায়, তবে শিখতে সময় লাগবে কম, স্মরণশক্তি হবে দীর্ঘস্থায়ী। আর পড়তে বসার পর মন যদি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে, স্মৃতির ঘরে উইপোকা বাসা বাঁধবে। খেয়ে ফেলবে স্মৃতিশক্তি। পড়াশোনার ফলাফলও।