শ্রাবণি

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

শ্রাবণ মাস, প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। দুই দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। আজ সকাল থেকে জহুরা প্রসবযন্ত্রণায় ছটফট করছে। সজল স্ত্রীকে ক্লিনিকে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু বৃষ্টির কারণে বিলম্ব হচ্ছে। যত সময় যাচ্ছে, সজলের মনের ভেতর আতঙ্ক, আঁতকে উঠছে বারবার। ঘরের ভেতরে তার দাদি ও মা পোয়াতির বাচ্চা বের হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার, আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

জহুরা মাঝেমধ্যে ওমা-মাগো-আল্লাহ-আল্লাহ করে চিৎকার করছে। সজল বারান্দায় অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। ভয় ও আনন্দে মনের ভেতর তোলপাড় চলছে।
কিছুক্ষণ পরেই হয়তো সন্তানের মুখ দেখবে, আবার ভয় আচ্ছন্ন করে। যদি জহুরার কিছু একটা হয়ে যায়!
কি সব আলতুফালতু ভাবছে; সজল নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে। মনেপ্রাণে সে–ও আল্লাহকে ডাকছে। ধৈর্যের বাঁধ তার ভেঙে পড়ে। জহুরার চিৎকারে সজলের বুকটা হাহাকার করে ওঠে! বারবার অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে মোবাইল করে।

সজল মেঘের দিকে তাকিয়ে অভিমানে ফেটে পড়ে। বাইরে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ। সজল ঘরের দরজা নাড়ে। তার মাকে ডাকতে থাকে। মা, দরজা খোলো। অ্যাম্বুলেন্স এসেছে, হাসপাতালে নিতে হবে। আর দেরি করা যাবে না। দাদি, দরজা খোলো। হঠাৎ শিশুর কান্নার শব্দ। সবার মুখে হাসি। দাদি ঘর থেকে চিৎকার করে বলে, ওরে সজল, তুই বাবা হয়েছিস। মিষ্টি আন।
-দাদি, জহুরা কেমন আছে?
- হ্যাঁ, ভালো আছে।
সজলের মা দরজা খুলে সজলকে ডাকে, আয় ঘরে আয়। মেয়েকে দেখে যাও—চাঁদের মতো সুন্দর তোমার মেয়ে। সজল মেয়েকে কোলে তুলে চুমো খায়। জহুরার মুখের দিকে তাকায়। প্রসবযন্ত্রণার পর মা হওয়ার আনন্দে জহুরার ক্লান্ত মুখের ওপর দিপ্তী ছড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টি থেমে গেছে, সূর্য উঁকি দিয়েছে। পৃথিবীর মুখ দেখার চেষ্টা করে।
বিয়ের তিন বছর হলো। আজ তাদের ঘরে নতুন অতিথির আগমনে গোটা বাড়িতে আনন্দের জোয়ার। শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টির দিনে মেয়ের জন্ম হওয়াই সজল মেয়ের নাম রাখে শ্রাবণি।

শ্রাবণির বয়স এখন পাঁচ বছর। ওর একটি পুতুল আছে। নাম রুনু। সে তার মেয়ে। ভীষণ ভালোবাসে রুনুকে। রুনুর খাওয়াপরা নিয়ে সে সারা দিন ব্যস্ত থাকে। সজল ও
জহুরা মেয়ের কাণ্ড দেখে হাসে। পাশের বাড়ির মিলা ও টুম্পা ওর সমবয়সী। খেলার সঙ্গী, রুনুর বিষয় নিয়ে ওদের সঙ্গে বগবগ করতে থাকে। সজল প্রাইমারি স্কুলের
শিক্ষক। মাঝেমধ্যে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তার সোজাসাপটা কথা, বাবা, তুমি আমাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না। আমি স্কুলে গেলে রুনুর কী হবে? ও কি না খেয়ে মরবে?
সজল মেয়ের কথা শুনে হাসে। আজ সন্ধ্যায় বাবা ও মাকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, বাবা, পরশু দিন সোমবার আমার মেয়ের বিয়ে। বরযাত্রী আসবে অনু, টুম্পা ও
নন্দিতা, সঙ্গে বরের মা আসবে। বরযাত্রীদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। খাবার থাকবে গরুর মাংস, খাসির মাংস, মুরগির ফ্রাই, ডিম ও পোলাও। বুটের ডাল ও সালাদ। এগুলোর ব্যবস্থা করতে। আমার মন ভালো নেই।
জহুরা ও সজল মেয়ের কাণ্ড দেখে হাসতে থাকে। তোমরা হাসছ? বলেই শ্রাবণির চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে। সজল ও জহুরা মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পারে। সত্যি সত্যি ও দুঃখ পেয়েছে। সজল বলে আচ্ছা, তোমার মেয়ের বিয়ের জন্য খাবারদাবার সব ব্যবস্থা করব। জহুরা বরযাত্রীদের বসার ব্যবস্থা করবে। জহুরা শ্রাবণিকে ডাকে, খেতে এসো।
-না, মা আমি খাব না। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। কেন খেতে ইচ্ছে করে না? রুনু চলে যাবে সে জন্য?
-হ্যাঁ।
শ্রাবণি রাতে সত্যি আর কিছু খেল না। পরের দিন বাড়িজুড়ে শ্রাবণি এটা–সেটা পরিষ্কার করা শুরু করে। দাদিকে বলে, দাদি? রুনুর বিয়ে হলুদ বাটাবাটির ব্যবস্থা করো।
দাদি বলেন, কার সঙ্গে রে?
- নন্দিতার সন্তান পিয়াসের সঙ্গে।
- ছেলের খোঁজখবর নিয়েছ? ছেলে কেমন? বর্তমানে তো অনেক ছেলে নেশার সঙ্গে জড়িত।
-না না, দাদি তুমি কী বলো? ছেলে শিক্ষিত, স্মার্ট! অতি ভদ্র! এই রকম ছেলের সংখ্যা বর্তমানে খুবই কম।
-দান ডিমান্ড?
- কী বলো দাদি? আমার এমন সুন্দরী মেয়ের জন্য দান ডিমান্ড! বিনে পয়সা অলংকার দিয়ে তারাই সাজিয়ে নিয়ে যাবে।

আজ সোমবার শ্রাবণি সকাল থেকে মন খারাপ করে বসে আছে। দুপুরে বরযাত্রী আসবে। তাই শ্রাবণির মন খারাপ। রুনুকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে শ্রাবণিও দাদির সঙ্গে এটা–সেটা কাজে সাহায্য করছে। দাদি বলেন, কিরে শ্রাবণি? বরযাত্রী কতজন আসবে।
-পাঁচজন,
-বরের বন্ধুরাও আসছে তো?
-তা জানি না। আমাকে পাঁচজনের কথাই জানিয়েছে।
দুপুর সাড়ে বারোটায় সজল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে। স্কুলে যাওয়ার পর শ্রাবণি বাবাকে মোবাইল করতে থাকে। বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো, বরযাত্রী কিন্তু বারোটার মধ্যে আসবে।
সত্যি সত্যি রুনু, টুম্পা, নন্দিতা ও নাহিদা লাল শাড়ি পরে বাড়িতে এসে হাজির। নাহিদার হাতে বড় একটি ছেলে পুতুল। পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরা। জহুরা সবাইকে ঘরে
বসতে বলে। শ্রাবণি সবার জন্য নাশতা নিয়ে আসে, শাড়ি পরেছে। নাশতার পর্ব শেষে ভাত খাওয়ার পর্ব শুরু হয়। ভাত খাওয়া শেষ হলে শ্রাবণি নন্দিতার হাতে তাঁর মেয়ে রুনুকে তুলে দেয়। তারা রুনুকে নিয়ে বিদায় নেয়। শ্রাবণি অঝোরে কাঁদতে থাকে! এমন একটি দৃশ্য দেখে সজল, জহুরা ও শ্রাবণির দাদি স্থির থাকতে পারেননি।
শ্রাবণির এত আদরের রুনুকে আজ সত্যিই অন্যের হাতে তুলে দেওয়া সজল ও জহুরার মনে ব্যথার সৃষ্টি করে। তারাও কেঁদে ফেলে। দাদি শ্রাবণিকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

লেখকের ঠিকানা: পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও