কবিতা, তিন অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ। অথচ এর গভীরতা এবং বিশালতা অকল্পনীয়। কবিতা হাসায়, কবিতা কাঁদায়, কবিতা আনন্দ দেয়, কবিতা বেদনা শেখায়। কবিতার বই যেমন ভালো লাগার বিষয়, তেমনি অনেক বেশি কঠিন বিষয় কবির ভাবের সঙ্গে ভাব মেলানো। এই ভাব মেলানোকে সহজলভ্য করতে হলে কবির কবিতায় ঢুকে পড়তে হবে। মগজে ধারণ করতে পারলেই কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় নিজের কথা। সাহিত্যের অন্যতম প্রধান শাখা কবিতার রস আস্বাদন করতেই সমসাময়িক কবি মোরশেদুল ইসলামের কবিতার বই ‘যে আলো আঁধার আনে’ হাতে নেওয়া। প্রথম দর্শনেই বইটির চমকপ্রদ আলো-আঁধারির প্রচ্ছদ এবং নাম এক অন্যরকম রহস্যময়তার আভাস দেয়। সাধারণত কবির যাপিত জীবনের অন্তক্ষরণ, মোহ, মুগ্ধতা, বিস্ময়, বিদ্রোহ নিয়েই হয় কাব্যগ্রন্থ। বইটিতে স্থান পাওয়া ৬৬টি ভিন্ন ভিন্ন কবিতার প্রতিটিতে আছে বৈচিত্র্য, ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যপট। যেন প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্র।
আঁধার মানে অন্ধকার। অশুভর প্রতীক। কখনো কখনো সেই আঁধারও হয়ে ওঠে শুভর প্রতীক। দেখতে দেখতে এই অশুভ আঁধার ঢুকে মিশে যায় আমাদের প্রত্যাহিক জীবনের অববাহিকায়। বইটির প্রথম কবিতা ‘যে আঁধার সুবাস ছড়ায়’ কবিতার শেষাংশে কবি প্রশ্ন রেখেছেন,
‘রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে আঁধার ঢুকে গেছে মনের ভেতর
সাপের মতো নিঃশব্দে হেঁটে চলে আজ দিগ্বিদিক।
আচ্ছা, মানুষের মতো পাখিও তো খুব সামাজিক
নতুন করে এ সত্য আমাদের কি আজ ভাবায়?’
পরবর্তী কবিতা ‘মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে’ কবিতায় কবি ছন্দে ছন্দে তার রকমারি ইচ্ছার কথা বর্ণনা করেছেন। কবি শহর ছেড়ে অজ পাড়াগাঁয়ের ধুলোমাখা পথে হারিয়ে যেতে চেয়েছেন, চিলের মতো ঘুরে বেড়াতে চেয়েছেন, কখনো রাতের কুয়াশা, দ্বিপ্রহর রাত, পাড়ার টি-স্টল কিংবা দমকা হাওয়া হবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। পিছুটান কার না থাকে! সব পিছুটানের মায়া কাটিয়ে এসে কবি নিজেকে খুঁজতে নিষেধ করেছেন তার ‘আমায় খোঁজো না আর’ কবিতায়। এখানে কবি হারিয়ে গেছেন আকাশের গায়, শুকিয়ে গেছেন দোয়েলের ঝাঁপটানো ডানার পানি হয়ে, রাতচোরা ফুলের হারিয়ে যাওয়া রূপে। এই অনুসন্ধানের ফলে জীবন বৃথা হবে ঘোষণা দিয়ে কবি বলেছেন,
‘বকুলের ফুল হয়ে কবে ঝরে গেছে আমাদের প্রেম
সেই কবেই ঝরেছে-
শুকনো ফুলে বেশি দিন ঘ্রাণ থাকে না-প্রাণ কবে মরেছে
সেই কবেই মরেছে!’
‘ডিরেক্টর চাঁদ’ কবিতায় আকাশজুড়ে কোটি কোটি নক্ষত্রের মাঝে রাজা হয়ে থাকা চাঁদ, অবস্থার পরিবর্তনেও আকাশময় একক আধিপত্য এবং দিন দিন নক্ষত্ররাজির দূরে সরে যাওয়ার গল্প বেশ ইঙ্গিতবহ। ‘আধারের আগুন’ কবিতায় খুব সুস্পষ্ট হয়েছে সময়ের মূল্য এবং আমাদের জীবনকাল।
প্রত্যেকের জীবনে একবার হলেও প্রেম আসে। প্রেমে তো বিরহ থাকবেই। ভুল ছাড়া যেন প্রেম জমেই না। ‘অধরা’ কবিতায় নিসৃত হয়েছে কবির প্রেমিক হৃদয়ের আবেগীয় সব অনুভূতির কথা। রেইন লিলি কবিতায় কবি রেইন লিলির আড়ালে তুলে ধরেছেন অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা। শুধু বর্ষাকালেই লিলির দেখা মেলে। কিন্তু ভিজে যাবার ভয়ে ভোমর থাকে দূরে। কবি বলেছেন,
‘ভোমর বিনে হৃদয় লিলির বিরহতে ফাটে
হওয়ায় ঝরে যৌবন তাহার মিলন আশায় কাটে।
প্রেমিক বিনে বৃষ্টির ফোঁটা পরকীয়ায় মাতে
কিছু প্রণয় অপার্থিব অমিল দেহের সাথে।’
আবার ‘প্রেম নিয়ে চলে গেছে’ কবিতায় কবি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে তুলনা করে খুঁজে ফিরেছেন তার হারিয়ে যাওয়া প্রেম। কবি লিখেছেন,
‘প্রেম নিয়ে চলে গেছে শীতকালে কোনো এক রাতে
কুয়াশায় যায়নি দেখা কোন পথে গেছে কার সাথে!
বসন্তে খুঁজেছি তারে পৃথিবীর জীবন সৈকতে...’
‘পাতা ঝরা দিন’ কবিতায় কবি ঋতুভেদে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং নিঃস্বার্থে নীরবে প্রকৃতি কীভাবে আমাদের প্রেম বিলিয়ে যাচ্ছে সেই বিষয়টাই সুস্পষ্ট করেছেন। তুলনা করেছেন জীবন সংগ্রামের সঙ্গে। কবি লিখেছেন,
‘ধীরে ধীরে শীত যায়, সবুজে সবুজ হয়
দুনিয়ায় দেহ-মন, সংগ্রামমুখর জীবন।’
মানুষের জীবনের একেক পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন জন কিংবা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির আগমন ঘটে। সব কিছু ছাপিয়ে জীবনে মানুষ বড্ড একা, এটাই ধ্রুব সত্য। এর থেকেও বড় সত্যি মানুষের পিছুটান কিংবা স্মৃতিকাতরতা। এ বিষয়টাই ফুটে উঠেছে ‘সব কিছু চলে যায়’ কবিতায়। ‘অন্ধকারের গল্প’ কবিতায় কয়েকটি লাইনে যেন লুকিয়ে আছে এক সুবিশাল বিষয়বস্তু। কবি লিখেছেন,
‘তবু দু'একটা কুকুর ভোকে, গোঙায় জাগিয়া
যার প্রতিধ্বনি পৌঁছে সুদূরের সপ্তাকাশে!
তবু বিবিসি-এএফপি কিংবা আল জাজিরায়
সেই খবর আসে না, আসে ঐ মৃত ডায়নার
পরকীয়ার গালগল্প!
সবাই এত ঘুমন্ত...
আমাদের এ পৃথিবী আজ মায়ী মৃত্যুপুরী!’
'আঁধার বহে গভীরে' কবিতায় কবি লিখেছেন,
‘... আশা বাড়ে চাঁদের মতন
সামনে সমাধান নাই, পিছনে রয়েছে কৃষ্ণপক্ষ!
শত যত্নেও প্রেমের চূড়ায় গেলে হয় পতন
ভোর এলে কী যে হবে...ভোরের সাথে নাই যে সখ্য!’
ভাবনা কবিতায় কবি আমাদের চিন্তা-ভাবনার অবস্থা সম্পর্কে ব্যক্ত করেছেন,
‘আমরা সবে শুধু ভাবি উপরের কথা
শরীর নিয়ে ভাবি না, লেবাসে মশগুল!’
‘জোনাকির মতো তার প্রেম’ কবিতায় কবি ছন্দে ছন্দে চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন,
‘থেকে থেকে জ্বলে ওঠে জোনাকির মতো তার মন
বর্ণ বোঝা দায় তার---এই সাদা, এই ধূসরতা
আকারও বদলায় সদা! মাছরাঙার তপস্যার মতো,
এক পায়ে ভর দিয়ে প্রতীক্ষারত বকের মতো
তার মনের আশায়; তবু তার মন পাওয়া দায়
ভালোবাসা ধীরে ধীরে চাঁদের মতন ক্ষয়ে যায়!’
পৃথিবীতে একের পর এক দামামা বেজেই চলেছে। শক্তি কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখাতে কেউ কাউকে এক চিলতে ছাড় দেওয়ার মনসিকতায় নেই। কিন্তু কবি এসব নোংরা যুদ্ধে নয়, শান্তি আর সহনশীলতায় খুঁজে পান বীরত্ব। ‘মেকি জীবনের জালে’ কবিতায় কবি উপস্থাপন করেছেন কিছু নিরেট সত্য। যেন কোনো মনোযোগী পাঠক থেমে যাবে ওই একটি লাইনে,
‘কে থাকে জীবনে একা? ঝিঁঝিরাও ডাকে সমস্বরে;’
‘ডায়াজিনিজের লণ্ঠন’ যেন অভাবুক হৃদয়কে ভাবতে বাধ্য করে। বন্ধুত্বে লেখ্য ওয়াদা কিংবা জোঁকের মুখে শুদ্ধ আচার—সবই লোকদেখানো। সবশেষে স্থান পেয়েছে বইটির নামকরণ করা কবিতা ‘যে আলো আঁধার আনে।’ কবি প্রশ্ন রেখেছেন,
‘আজ জ্ঞানের চেয়েও অর্থের বড্ড পিপাসা প্রাণে;
আজ নারীর চেয়েও টাকার ঘ্রাণ বড়ই কড়া!
তবে কি আলো এলোও আঁধারেই রয়ে যায় তারা?’
এভাবেই কবি দেখিয়েছেন সমাজের আলোকিত মানুষেরা কীভাবে আঁধার নিয়ে আসে। সব মিলিয়ে বইটিতে স্থান পাওয়া প্রতিটি কবিতাই ভাবুক পাঠকের চিন্তাধারায় রেখাপাত করতে সক্ষম।
কবি মোরশেদুল ইসলাম ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত। এ জন্য হয়তো তাল-লয়-ছন্দ-রস অলংকারের খুব চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে তার কলামে। অনুপ্রাস, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক এবং বিভিন্ন চিত্রকল্পের মাধ্যমে দর্শন, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রেম এবং জীবন সংগ্রামের বিচিত্র সন্নিবেশ ঘটেছে প্রতিটি কাব্যে। কবিতাগুলোতে ছন্দের ক্ষেত্রে কবির বিশেষ সতক৴তা লক্ষণীয়। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কবিতা থাকলেও অক্ষরবৃত্ত ছন্দেরই যেন আধিক্য। একটি কবিতা সার্থক হয়ে উঠতে পারে তখনই, যখন এটি জীবনের অদেখা অংশকে আমাদের সামনে দৃশ্যমান করে তোলে। সেদিক থেকে কবি মোরশেদুল ইসলাম তার প্রথম প্রয়াসেই সার্থক। যার প্রমাণ তার প্রথম বই ‘যে আলো আঁধার আনে’ -এর কবিতাবলি। বইটি যেকোনো কবিতাপ্রেমী পাঠককে তৃপ্ত করবে বলে আমার বিশ্বাস।
বই সমাচার:
বই: যে আলো আঁধার আনে
লেখক: মোরশেদুল ইসলাম
প্রকাশন: চারুলিপি
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
পৃষ্ঠা: ৮০
মুদ্রিত মূল্য: ২০০ টাকা মাত্র