রাত বাড়লে সমুদ্রের চেহারা অদ্ভুতভাবে পাল্টে যেতে থাকে। আকাশের রংটা লাগে কুচকুচে আঁধারের মতো। সমুদ্র তখন জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলে রাক্ষসের মতো বিকট শব্দে। কখনো কখনো নানা ধরনের অলৌকিক খেলা শুরু করে সে! আচমকা ঢেউয়ের সঙ্গে কোত্থেকে উড়ে আসে আগুনরঙের পাখিগুলো। আবার কখনো পানির ভেতর থেকে হাঙরের মতো দু-একটা মাছ লাফ দিয়ে উঠতে চায় ডাঙায়। আর কুচকুচে আঁধারের মতো আকাশটা তখন সমুদ্রের খুব কাছাকাছি চলে আসে। এই দৃশ্য প্রতিদিন দেখে লোকমান। এখন তার এ দৃশ্যগুলো মুখস্থ হয়ে গেছে। তবু মাঝরাতে জ্যোত্স্নার আলো সরিয়ে সে যেন মাঝেমধ্যেই সমুদ্রের কিনারে এসে একা একা বসে থাকে। পরীর কথা ভাবে। তার চোখে তখন নদীর চরের পাশে লেগে থাকা ছোট্ট গ্রাম আমতলির দৃশ্য ভাসে। পরীর সঙ্গে খুনসুটির স্মৃতিগুলো মেঘের মতো মনের ভেতর উড়ে বেড়ায়। যেন ঘুম ঘুম পায়ে হেঁটে আসে পরী সমুদ্রের পাড়ে।
‘লোকমান ভাই, তুমি কবে ফিরা আসবা!’
‘আসমুরে পরী। আগে হোটেলটা ঠিকমতো চালাই লই। চাচার লোনগুলা শোধ না করলে আমাগো ঘর বাইন্ধাও সুখ হইব না।’
‘আমার বাবার জন্য তোমার এত মায়া? আমারও তোমার জন্য অনেক মায়া লোকমান ভাই। কিন্তু আমার যে আর দিন কাটে না!’
লোকমান সমুদ্রের গর্জনের শব্দে কান পাতে। একটা বিড়ি ধরায়। পরী যেন তাকে কী রকম উন্মত্ত করে তোলে। গ্রামের দুটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে পরীর বাবা বিপদে পড়েছে। এ বছরের মধ্যে শোধ দিতে হবে সব। বাবা-মাহারা লোকমান ছোটবেলা থেকে থাকত পরীদের বাড়ি। লোকমান চান্দের গাড়ি চালাত। তা দিয়েই সংসার চালাত তাদের। কিন্তু পরীর মায়ের অসুখের চিকিত্সার টাকা জোগাড় করতে গিয়েই তাদের এই বিপত্তি। তাই তো লোকমান আর বসে থাকেনি। চাচাকে বাঁচানোর জন্য উপার্জন বাড়ানোর আশায় সমুদ্রের দেশে এসে ভাতের হোটেল দিয়েছে। লোকমানের এক বন্ধু হোটেলটার নাম রেখে দিয়েছে ভাতঘর। হোটেলটা ভালোই চলে। এখানকার রিকশা-ভ্যান আর টেম্পো চালকেরাই বেশি আসেন। সকালে থাকে ভাত আর ভর্তা। দুপুরে ভাত, ডিম ভুনা আর নানা ধরনের ভর্তা। কোনো দিন সস্তায় সমুদ্রের কোনো মাছ পেলে মাছভাজাও চলে সমানে। মাছগুলোর নামও অদ্ভুত। পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল কোরাল, রাঙা কই, সুই মাছ, লাল মাছ—এসব। বিক্রি জমে অবশ্য রাতে। তখন নানা ধরনের ট্যুরিস্টও আসেন। শখ করে এখানে খান। ছবি তোলেন। বকশিশ দেন।
লোকমানের সময়টা কাটে দারুণ। বাজার করা, দিনভর খাবারের আয়োজন, কাস্টমারদের সঙ্গে আলাপ, তারপর সবশেষে রাতে হিসাব-নিকাশ। কোনো কোনো দিন হিসাব শেষে লাভের অঙ্কটা দেখে বেশ খুশি থাকে লোকমান। মনটা উড়ু উড়ু করে। সমুদ্রের পাড়ে বসার আগেই সবুজের গোডাউনে গিয়ে দুজন ভরপুর চোলাই সেবন করে আসে।
তারপর কোথা থেকে পরী মেয়েটা ছুটে আসে। সারা রাত সে নানা ধরনের প্রশ্ন করে। কখনো তার উত্তর থাকে। কখনো থাকে না। প্রতিদিনের মতো আজও পরী এল—
‘লোকমান ভাই, বাড়ি কবে আসবা?’
‘জানি না রে পরী।’
‘তোমার কিন্তু আমার ব্যাপারে কোনো খেয়াল থাকে না। আজ আমার জন্মদিন।’
‘বলিস কী? বয়স কত হলো যেন।’
‘বাইশ।’
‘তুমি আমারে ঘরে তুইলবা কবে।’
‘খুব শিগগির, সোনা। সামনের বর্ষায় আমি আসব।’
‘কথা ঠিক থাকে যেন।’
লোকমান আবার সিগারেট ধরায়। একটু উঠে আসে। ভাতঘর হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। কী মনে করে ফোন দেয় চাচাকে।
‘চাচা কেমন আছ?’
‘ভালো আছিরে বাপ। তুই কেমন? তোর পাঠানো সব টাকা পেয়েছি।’
‘ঠিকমতো শোধ দিয়ে দিয়োগো চাচা। এরা কিন্তু হাঙ্গর মাছের মতো।’
‘ঠিক বলেছিস। তুমি কবে আসবা বাজান।’
‘সামনের বর্ষায়। চাচা পরীরে একটু দেবেন? কথা বলতাম।’
আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। লাইনটা কেটে যায়। মনটা বিষণ্ন লাগে। কী রকম অস্থির লাগে। তারপর আবারও ক্রমাগত মোবাইলে চেষ্টা করে লোকমান। লোকমান দাঁড়িয়ে অনবরত মোবাইলে চেষ্টা করে যাচ্ছে। শেষমেশ পাওয়া গেল চাচিকে। চাচি ফিসফিস করে বলল, ‘তুই টাকা পাঠিয়ে বড় উপকার করেছিস রে লোকমান। খুব আয়োজন করে পরীর বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি।’
‘লোকমান ম্লান কণ্ঠে বলল, কবে বিয়ে?’
‘এই তো আজকে রাত্তিরে। ওপাড়ার রমিজ মণ্ডলের বড় ছেলের সঙ্গে।’
ফোনটা কেটে সমুদ্রের পাড়ে বসে পড়ে লোকমান। আজ সমুদ্রও বড় অশান্ত। সিগন্যাল পড়েছে। সবাই দৌড়ে যে যার মতো নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। কেবল লোকমান তার ভাতঘর হোটেলের ভেতর চুপচাপ বসে আছে।