একদম ছেলেবেলায় এক শিশু তাঁর প্রতিবেশী আরেক শিশুকে পেলেই খেলায় মেতে ওঠে। এক দিন–দুই দিন খেলতে খেলতে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব কী, সেটা বোঝার আগেই তারা বন্ধু হয়ে ওঠে। সেই যে শুরু, মানুষের জীবনের প্রতিটা ক্ষণে বন্ধুর সংখ্যা বাড়তেই থাকে! স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে আমাদের জীবনে বন্ধুর অভাব হয় না। তবে সবাই কি খুব ভালো বন্ধু হতে পারে? আমারও অনেক বন্ধু আছে, কিন্তু সবচেয়ে সেরা বন্ধু ‘বইবন্ধু’।
মাধ্যমিকের সময়টা কেটেছে ময়মনসিংহের ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুলে। আমাদের সময় প্রতি বৃহস্পতিবার লাইব্রেরি থেকে বই পড়ার জন্য বাড়িতে নেওয়ার সুযোগ থাকত। পড়ার জন্য একজন একটা বই নিতে পারত। বান্ধবীদের দুই-তিনজনের কার্ড ইস্যু করে আমি আরও কিছু বই নিয়ে পুরো সপ্তাহ লেখাপড়া, কোচিং এবং এক স্যারের প্রাইভেট থেকে আরেক স্যারের প্রাইভেটে দৌড়ানোর ফাঁকে বই পড়তাম। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, পাঠ্যবইয়ের নিচে গল্পের বই রেখে পড়তাম, কেউ যেন টের না পায়! এভাবে ধীরে ধীরে বই হয়ে গেল আমার প্রিয় বন্ধু।
জীবনে একটা সময় হয়তো আপনার কাছের বন্ধু আপনাকে ভুল বুঝে দূরে চলে যেতে পারে, কিন্তু আপনার বইবন্ধু আপনাকে কখনোই ছেড়ে যাবে না। নিয়মিত বই পড়লে কী হয়? আসুন জেনে নেওয়া যাক।
১) বই পড়লে অনেক অজানা কিছু জানা যায়, আমাদের ভেতর সৃজনশীলতার মনোভাব বাড়তে থাকে।
২) বই পড়ার সময় আমরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারি, এর ফলে আমাদের শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয়।
৩) গল্পের চরিত্রগুলোর ভেতর যখন আমরা ডুবে যাই, তখন ভাবতে থাকি, আচ্ছা, পরের অংশ কী এমন হতে পারে? এতে আমাদের কল্পনার পরিধি বৃদ্ধি পায়।
৪) একাকিত্ব কমে যায়।
৫) অন্যদের তুলনায় বইপড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়।
৬) মানসিক চাপ কমে।
৭) লেখার দক্ষতা বাড়ে।
৮) মনমানসিকতায় ভালোর প্রভাব বেশি থাকে।
৯) অন্যের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই দক্ষতা বাড়ে। কথা দিয়ে যেহেতু মানুষের মন জয় করা যায়, সে ক্ষেত্রে বই পড়লে উপকার নিজেরই।
১০) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের সম্পর্কে জানা যায়, তাঁদের সঙ্গে আনমনেই কথা বলা যায়।
১১) আমরা যখন বইয়ের চরিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হই, তখন অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়।
১২) জটিল জটিল চিন্তার বিকাশ ঘটে।
১৩) বিখ্যাত মানুষদের বাস্তব জীবনের অনেক গল্প জানা যায়।
১৪) বিভিন্ন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানা যায়।
১৫) বই পড়ার মাধ্যমে চিন্তার জগতের পুষ্টি সাধিত হয়।
বই কীভাবে নির্বাচন করবেন
- সুন্দর রঙিন প্রচ্ছদ দেখে কিংবা বইয়ের কাগজের মান ভালো দেখেই বই কিনে নেওয়া উচিত না। যে বই পড়া হয়নি, সেটার খানিকটা অংশ গুগল করে নিতে পারেন। ফেসবুকে বইয়ের অনেক গ্রুপ আছে, সেখানে বই রিভিউগুলো পড়ে আপনার যেটা ভালো লাগে, সেই বই পড়ার জন্য সংগ্রহ করতে পারেন।
বই হতে পারে সেরা উপহার
- আপনি কোনো বন্ধুর জন্মদিন, বিয়ে কিংবা যেকোনো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে বই নির্বাচন করতে পারেন। বইয়ের চেয়ে ভালো উপহার আর কিছু হতে পারে না।
বই কীভাবে পড়া উচিত
-অনেককেই দেখা যায়, বই দাগিয়ে পড়েন কিংবা বইয়ের যত্ন নেন না। দুই–একবার পড়ার পরই বইটি পুরোনো হয়ে যায়। বই পড়ার সময় কলম দিয়ে না দাগিয়ে পেনসিল দিয়ে দাগাতে পারেন। বইয়ের পুরো পাতা ভাঁজ দিয়ে না রেখে কতটুকু পড়েছেন, তা মনে রাখার জন্য কোণের দিকে সামান্য ভাঁজ করতে পারেন। বুকমার্ক ব্যবহার করতে পারেন।
বই পড়ার সময় পাশে একটা ডায়েরি রাখছেন তো
- বই পড়ার সময় একটা ডায়েরি পাশে রাখার চেষ্টা করুন। ভালো লাগার লাইনগুলো লিখে রাখুন। কেউ যখন ডায়েরিটা খুলবে, তখন দেখবে সব ভালো কথার মিলনমেলা। মন নিমেষে ভালো হয়ে যাবে।
বইয়ের যত্ন করতে হবে
- মাঝেমধ্যে বইগুলো মুছে নিতে হবে। এতে করে বইয়ে ময়লা জমবে না। সময়–সুযোগ করে বইগুলো ছাদে নিয়ে রৌদ্রস্নান করাতে পারেন। বই যেখানে রাখবেন, সেখানে নিমপাতা কিংবা কর্পূর রাখলে পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে বইগুলো রক্ষা পাবে।
কোথাও যাওয়ার আগে সঙ্গে বই নিতে পারেন
- কোথাও যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন। রাস্তায় জ্যাম, বিরক্ত লাগাটা স্বাভাবিক। এ সময় বই পড়লে সময়টা সুন্দর কাটবে। কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার সময়ও আপনার সঙ্গী হতে পারে বই।
‘Reading is to the mind what exercise is to the body’– Joseph Addison
‘ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে, তেমনি বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি’
আসুন আমরা বই পড়ি, অন্যদেরও বই পড়তে উৎসাহিত করি।