তারুণ্যের আত্মবিশ্বাস

স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যই পূর্বসুরিদের উত্তরসুরি
ফাইল ছবি

অস্থিরতায় আসক্ত, চঞ্চল প্রকৃতির, প্রাণোচ্ছল এ রকম কিছু ইতিবাচক-নেতিবাচক বিশেষণের সমন্বয়ে গঠিত তারুণ্য এবারের করোনায় সত্যিই ধাক্কা খেয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকা শিশুদের শিক্ষাজীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ যেকোনো মাধ্যমে যেমন তুমুল আলোচনা হচ্ছে, ঠিক তেমনি কম যাচ্ছে না তরুণদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষাতেও করোনার গ্রাস নিয়ে ওঠা আলোচনার ঢেউও। করোনা তো সবারই ক্ষতি করেছে, বাদ যায়নি কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে তারুণ্যের। ব্যাখাটা সহজ কিন্তু বিশাল।

সেটিতে যাব, তবে তার আগে কিছু কথা আছে। বেকারত্ব বাংলাদেশের একটি সমস্যা। এই সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেই দায়িত্ব শেষ করছি আমরা অনেকে। সেই তালিকায় হয়তো এই লেখার মাধ্যমে যোগ দিয়েছি আমি নিজেও। দেশের তরুণ সমাজের ঠিক কত শতাংশ যে বেকার, সেই সংখ্যা এবং তা এত দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে যে আমার এই লেখা লেখার সময় থেকে ছাপা হতে হতে সেই সংখ্যাটিও পরিবর্তন হয়ে যাবে। ইতিবাচকভাবে বেকারত্বের সংখ্যা কমে গেলে হয়তো কোনো আক্ষেপই থাকত না, কিন্তু সেটি না হয়ে বেকারত্ব যে বাড়বে বর্তমান গতিধারায়, সেটি সহজেই অনুমেয়।

এবার আসি সেই পুরোনো কথায়। করোনা এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে তারুন্যকে। একবার কল্পনা করে দেখুন তো, যারা এই করোনার মাত্র কয়েক দিন বা মাস আগে নিজেদের উচ্চশিক্ষা পর্ব শেষ করেছেন, নিজেদের পেশাজীবনে প্রবেশের চূড়ান্ত প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তে রয়েছেন, তাদের সেই প্রস্তুতির মধ্যেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে করোনা নামক দানব। আবার যারা শিক্ষাজীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে ছিলেন, করোনায় তাদের জীবনকেও যেন উপর্যুপুরি নোনাপানি উপহার দিয়েছে। নিজের জীবনে নদী থেকে সাগরে প্রবেশের সবচেয়ে মুল্যবান সময়ে তারা পেয়েছে বিশাল ধাক্কা। আমার আজকের মূল বিষয়বস্তুই হলো তারুণ্যে বসবাস করা এই জনগোষ্ঠীকে নিয়েই।

এমনিতেই যেখানে সুন্দর, স্বাভাবিক, সাবলীল পরিবেশ বজায় থাকলেও কর্মসংস্থানের সুযোগের ক্ষেত্রে বেশ অপ্রতুলতা, সেখানে এই প্রতিকূলতায় সেই বেকার তারুণ্যের উপযুক্ত কর্মসংস্থান কোথা থেকে হবে? সত্যিকার অর্থে আমাদের কাঠামোতেও তো সেই সুযোগ নেই। করোনা যেখানে চাকরিজীবীদের করছে কর্মহীন, সেখানে নতুন তারুণ্যের জায়গা কোথায়? ধরুন সদ্য উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে নতুনেরা নিজের পছন্দের না হলেও, কোনো রকমে শুধু বেকারত্ব ঘোচাতে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে নিল। তাতে করে আসলেই কি দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সে নিজেকে জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে! শঙ্কা তো আছেই, সেই সঙ্গে কাজ করবে ভয়ও। সেই তরুণ বা তরুণীর মানসিক অবস্থা এতটাই ভঙ্গুর পর্যায়ে যাবে যে, দায়সারা ওই চাকরি ছাড়া কিছুই হয়তো তাকে দিয়ে আর সম্ভব হবে না। কতটা বিষণ্নতায় চলে যাচ্ছে তারুণ্য!

চাকরির প্রসঙ্গ বাদ। তরুণেরা যদি উদ্যোক্তা হতে চান তাহলে কী দাঁড়ায়? সমাজের চারিদিকে চোখ ঘোরান, ১০০ জন তরুণ উদ্যোক্তা হলে এর অধিকাংশই ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে পারেন না। যারা সফল হন, কেবল তারাই বিভিন্ন গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খবর হন। তাহলে উৎসাহ, প্রেরণা কোথা থেকে আসবে?

অবশ্যই আসবে। তবে তরুণদের সফলতার পথ আরও সহজ করতে হবে। রিক্স ফ্যাক্টর শব্দটি তরুণদের সফলতার রাস্তা থেকে তুলে নিতে হবে। তাহলেই তারুণ্য যোগ দেবে মানবসম্পদের ছকে। তারুণ্যের শক্তি আছে। নীতিনির্ধারকদের আছে অভিজ্ঞতা। সবকিছু শক্তি দিয়ে হয় না। তাই শক্তি আর অভিজ্ঞতার মিশেলের অপেক্ষায় রয়েছি। কথায় আছে, ‘পাকা চুলের বাহাদুরিতে অনেক কিছুই হয়’। তাই তারুণ্যকে একটু সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করছি। একটু সুযোগ, স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যই তো পূর্বসুরিদের উত্তরসুরি। চাকরিজীবী কিংবা উদ্যোক্তা! সফল হওয়ার, স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার তারুণ্য তো এটাই।

বিতর্কবিষয়ক সম্পাদক, প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ