কথাসাহিত্য প্রণয়(ন) কথা

প্রতীকী ছবি
প্রথম আলো

কোনো কিছু প্রণয়ন করতে গেলে তার সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত হতে হয়। প্রণয়নের সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্ক কেবল শব্দে নয়, বাস্তবেও। প্রণয় মানে কোনো কিছুতে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যাওয়া, তাকে আদ্যোপান্ত বোঝা। আর একবার বোঝা হয়ে গেলে তাকে নিয়ে সৃষ্টিতে মেতে ওঠা যায়। প্রতিভার স্ফুরণ ঘটানো যায় বিচিত্রভাবে। এভাবে প্রণয় থেকেই রচিত হয় প্রণয়নের রাস্তা। ব্যাপারটি আমরা সাহিত্য তথা কথাসাহিত্যে বিচার করে দেখব। পাঠককুল তখন শিরোনামে ব্র্যাকেটবন্দী ‘ন’-এর মর্মার্থ বুঝতে পারবেন। আমার কাছে এই পাঠককুল তরুণ, যারা কথাসাহিত্যে সিদ্ধ হতে চায়। আমি তাদেরই সম্বোধন করছি।

একজন তরুণ পাঠক হিসেবে তুমি যখন মপাসাঁ কিংবা তলস্তয়ের কথাসাহিত্য (গল্প ও উপন্যাস) পাঠ করো, তখন এর বিষয়গত ও কারিগরি সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ো। তোমার মধ্যে প্রশ্ন জাগে, একজন ঝানু লেখক কীভাবে তৈরি করেন তাঁর লেখা, কীভাবে লেখার মধ্যে সঞ্চার করেন সৌন্দর্য, যা পাঠকচিত্তকে গভীরভাবে নাড়া দেয়? যদি মনে করো এ রকম লেখনীপ্রতিভা জন্মগত তবে আমি তোমার সঙ্গে একমত নই। আমি মনে করি প্রতিভা তৈরি হয় এবং তৈরি করতে হয়। একজন লেখক তিলে তিলে নিজেকে প্রস্তুত করেন মহৎ সৃষ্টির জন্য। এ জন্য তাঁকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। গভীর নিয়মনিষ্ঠায় বহু পাঠ ও বহু লিখনচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একজন মহৎ লেখক। তিনি সিদ্ধি লাভ করেন তাঁর লিখন সাধনায়।

আমি যে কথাটি বোঝাতে চাইছি তা হলো, লেখার নিয়ম আছে এবং তা শিখতে হয়। কথাসাহিত্য দিয়ে কথা শুরু হয়েছে। আমরা এখানে কথাসাহিত্য প্রণয়নপ্রণালি নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করব। কথাসাহিত্য রচনার নিয়মগুলো কী কী? একজন তরুণ পাঠক হিসেবে কীভাবে তুমি নিজেকে প্রস্তুত করবে বড় কথাসাহিত্যিক হওয়ার জন্য? কী ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা তোমার জন্য আবশ্যক? চলো আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

কথাসাহিত্যিক হতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কথাসাহিত্যকে। এর উপাদানসমূহকে। যদি রন্ধনের উপাদান হাতের কাছে থাকে এবং জানা থাকে সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, অর্থাৎ কোনগুলো কী অনুপাতে মেশাতে হবে, কখন চুলায় চড়াতে হবে, কতটুকু আঁচ দিতে হবে, তবেই উৎকৃষ্ট রান্না সম্ভব। একটি গল্প ও উপন্যাস তৈরি হয় প্রধানত ছয়টি উপাদানে: বিষয়বস্তু, ঘটনা, চরিত্র, স্থানকাল, দৃষ্টিকোণ ও কথোপকথন। শুরু করা যাক এসবের ফিরিস্তি। খাতাকলম নিয়ে তৈরি হও!

শুরুতেই সিদ্ধান্ত নাও কী বিষয়বস্তু বা থিম নিয়ে কাজ করবে। বিষয়ক্ষেত্র, যা দ্বারা নির্ধারিত হয় কথাসাহিত্যের প্রকরণ, তাকে ভালো করে বোঝো। বিষয় হতে পারে সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রাতিবেশিক, মনস্তাত্ত্বিক, সাম্পর্কিক, ঐতিহাসিক, আধুনিক, আধিভৌতিক, ভ্রামণিক, হাস্যরসাত্মক, উপদেশমূলক, কল্পবৈজ্ঞানিক, গোয়েন্দাবৃত্তিক ইত্যাদি। যেকোনো বিষয় থেকেই নিঃসৃত হবে জুতসই কোনো বিষয়বস্তু। বিষয় ও বিষয়বস্তু লেখকের চিন্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। যে বিষয়ের ওপর সম্যক দখল আছে, কেবল সেটা নিয়েই কাজে হাত দেওয়া উচিত। অপরিচিত বিষয় নিয়ে কাজ করলে কথাসাহিত্য গভীরতা পাবে না। তবে লেখা যেন তথ্যে ভারী হয়ে না ওঠে। তথ্যকে সওয়ার হতে হবে কল্পনার ঘোড়ায়। নইলে লেখা হয়ে যাবে খটমটে, নীরস। কোনো চমক থাকবে না। যেকোনো মূল্যে সৃষ্টিকে হতে হবে চমকপ্রদ, চিত্তাকর্ষক।

বিষয় নির্ধারিত হয়ে গেলে বিষয়বস্তু ঠিক করে নাও। যেমন, বিষয়টি সামাজিক হলে চিন্তা করে নাও সমাজের কোন কোন সমস্যার ওপর আলোকপাত করবে। সম্পর্কমূলক হলে ভেবে নাও এটা কি স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কিত, নাকি প্রেমিক-প্রেমিকা সম্পর্কিত। কল্পবৈজ্ঞানিক হলে ঠিক করে নাও পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের কোন কোন সূত্রের সহায়তা নেবে। বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে লিখন সাধারণত দিকভ্রষ্ট হয় না। গল্প তরতর করে এগিয়ে চলে এবং দ্রুত তা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে। গল্প-উপন্যাসের কিছু কিছু থিম থাকে ঘটনার আড়ালে লুকানো। পাঠককে মাটি খুঁড়ে সেগুলো বের করে আনতে হয়। গুপ্তধনের মতো। লেখকের চিন্তাধনে শেষ পর্যন্ত পাঠক ধনী হয়ে ওঠেন।

প্রতীকী ছবি
প্রথম আলো

এবার আসো ঘটনা বা প্লটে। ঘটনাই কথাসাহিত্যের ভিত্তি। ঘটনার কারণেই কথাসাহিত্য প্রবন্ধ থেকে পৃথক। আদতে, কথাসাহিত্য বলতে অনেকে কেবল ঘটনাকেই বোঝেন। ঘটনা যত মজার হবে, গল্প-উপন্যাস তত পাঠকপ্রিয় হবে। একটি ছোটগল্প সাধারণত এক বা একাধিক ঘটনার সমষ্টি। উপন্যাস রচিত হয় বৃহৎ প্লটে, সম্প্রসারিত ক্যানভাসে। এখানে থাকে অনেক সাবপ্লট। ঘটনা এগিয়ে চলে এঁকেবেঁকে। ঘটনাগুলো কিন্তু কোনোভাবেই ছাড়া-ছাড়া নয়। তাদের মধ্যে থাকে একটি আন্তসম্পর্ক বা অর্গানিক ইউনিটি। আগা-গোড়া-মধ্য বাঁধা থাকে বিষয়বস্তুর শক্ত সুতায়। পাঠক ঘটনাক্রমের পালতোলা নৌকায় স্বচ্ছন্দে ভেসে চলেন, যখন পালে লাগে কৌতূহলের জোর হাওয়া।

ঘটনা সাজানোর অনেক বিধান আছে। এটি লিখনকৌশলের অংশ। অনেক সময় লেখক ঘটনা পরম্পরার মাঝখান থেকে শুরু করেন এবং তারপর পেছনে তাকান (যাকে বলে ফ্ল্যাশব্যাক)। অন্যথায় এটি হয় সরলরৈখিক, কালানুক্রমিক। ঘটনাসমূহের বিন্যাস ও বর্ণনার জন্য লেখকের প্রয়োজন নান্দনিক বোধ ও বিস্তর ভাষাদক্ষতা। সাধারণত এটি অর্জিত হয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। প্লটে থাকে ছোট-বড় নানা ঘটনা। লেখককে বুঝতে হবে কোনটি বেশি ও কোনটি কম গুরুত্ব পাবে। কোনটির বিশদ বর্ণনা আর কোনটির স্বল্প বর্ণনা থাকবে। মূলত লেখকের শৈল্পিক দক্ষতা ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়। একেকজন লেখকের ভাষাশৈলী একেক রকম। এখানে থাকে লেখকের অদৃশ্য স্বাক্ষর-রেখা, যা দিয়ে একজন বিশিষ্ট লেখককে অনায়াসে শনাক্ত করা যায়। চেষ্টা করবে লেখক হিসেবে নিজস্ব শৈলী তৈরি করতে, যা তোমাকে লেখকভিড়ে আলাদাভাবে চিনতে সহায়তা করবে। তখন তোমার নিজস্ব সত্তায় টিকে থাকতে সুবিধা হবে।

ঘটনা বিন্যাসের সময় স্মরণ রাখতে হবে গল্প বা উপন্যাসের কাঠামো বা স্ট্রাকচারের ব্যাপারটি। গল্প বা উপন্যাস গড়ে ওঠে একটি বিশেষ কাঠামোর ওপর, যা পাঁচটি পর্যায়ে বিভক্ত: প্রারম্ভিকা, ঊর্ধ্বগতি ক্রিয়াকলাপ, ঘটনাশীর্ষ, নিম্নগতি ক্রিয়াকলাপ এবং সংকটমোচন। প্রারম্ভিকায় কাহিনির একটি আভাস দেওয়া হয়, স্থানকাল ও চরিত্র পরিচিতির মাধ্যমে কিংবা কোনো সমস্যার সূত্রপাতের মাধ্যমে। ঊর্ধ্বগতি ক্রিয়াকলাপে মোচড় খেতে খেতে ঘটনা সংঘটিত হয়, দ্বন্দ্ব–সংঘাত চলে, টেনশন বাড়তে থাকে। ঘটনাশীর্ষ দ্বন্দ্ব-সংঘাত-টেনশনের চরম পর্যায়, যেখানে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, এবং দৃশ্যপটের আমূল পরিবর্তন ঘটে। নিম্নগতি ক্রিয়াকলাপে ঘটনা মন্থর হয়, যেখানে টেনশনের মেঘ কেটে নতুন উপলব্ধির রোদ্দুর দেখা দেয়। এবং সর্বশেষে ঘটে সংকটমোচন, যেখানে সমস্যার সমাধান হয় এবং কাহিনির সমাপ্তি ঘটে। তবে আপাত সমাপ্তির মধ্যে লেখক নতুন সমস্যার বীজ বপন করে দিতে পারেন। তখন পাঠকমনে এমন কৌতূহলী প্রশ্ন উপস্থিত হবে, এরপর কী হলো? রবীন্দ্রনাথ এরূপ অবস্থাকেই বলেছেন ‘শেষ হয়েও হইলো না শেষ’, যার ক্ল্যাসিক উদাহরণ এফ আর স্টকটনের ‘দ্য লেডি অর দ্য টাইগার’ গল্পটি। রাজা এক অপরাধী প্রজাকে শাস্তি দেবেন। তার অপরাধ সে রাজকন্যার প্রণয়াসক্ত। শাস্তির পন্থাটি অদ্ভুত। খোলা মাঠ। মাঠের চারদিকে গ্যালারিভরা দর্শক। অপরাধীর সামনে দুটি দরজা এবং তাকে এগিয়ে গিয়ে খুলতে হবে যেকোনো একটি দরজা। এক দরজার ওপাশে আছে এক পরমা সুন্দরী নারী এবং অন্যটির ওপাশে এক ক্ষুধার্ত বাঘ। ভাগ্যক্রমে নারীর দরজাটি খুললে সে তার জীবনসঙ্গী হবে। কিন্তু ভুলক্রমে বাঘের দরজাটি খুললেই তার পেটে চালান হবে। এমতাবস্থায় রাজকন্যার মধ্যে শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। সে চায় না অপরাধী অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করুক, আবার এটাও চায় না সে বাঘের পেটে যাক। রাজকন্যা গোপনে খবর নিয়েছে কোন দরজার পেছনে কে আছে। অপরাধী দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় রাজকন্যা গ্যালারি থেকে সবার অগোচরে একটি বিশেষ ইঙ্গিত দেয়। এই ইঙ্গিতেই নির্ভর করছে তার বাঁচা-মরা। এখানেই গল্প শেষ হয়ে যায়। জানা যায় না, অপরাধী কি নারীকে পেয়েছিল নাকি বাঘের পেটে গিয়েছিল। রাজকন্যা কি তার মৃত্যু কামনা করেছিল, নাকি সে কামনা করেছিল নিজেরই মৃত্যু (অন্য নারীর সঙ্গে প্রেমিকের বিবাহ তো তার মৃত্যুরই সমান)? এক উত্তরহীন ধাঁধাই গল্পটিকে অমরত্ব দান করেছে।

প্রতীকী ছবি। মডেল: মারিয়া নূর।
ছবি: প্রথম আলো

সংকটমোচনের ব্যাপারটি শিল্পকৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্যায়ে এসে পাঠকের কৌতূহলের নিরসন হয়। দম ফাটা অবস্থা থেকে মুক্তি পান তিনি। লেখক কীভাবে পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবেন এবং পথের শেষে পাঠকের সামনে কোন সত্যের উদ্ভাসন ঘটবে, এটি এক জরুরি প্রশ্ন। অনেকে এর জন্য ব্যবহার করেন আয়রনি, বাংলায় যাকে বলে ব্যাজস্তুতি বা বক্রাঘাত। অর্থাৎ পাঠক যা প্রত্যাশা করেন কাহিনিতে ঘটে তার বিপরীত। ব্যাপারটি তার জন্য দারুণ শকিং, ফলে এটি তাঁর মনে দাগ কেটে থাকে বহুকাল। যেমন, মপাসাঁর ‘দ্য ডায়মন্ড নেকলেস’ গল্পের নায়িকা ধার করা হীরার হার হারিয়ে ফেলে এবং তার বদলে বহুমূল্য অন্য একটি হীরার হার ফেরত দেয়। এর জন্য তাকে অনেক টাকা ঋণ করতে হয় এবং ঋণ পরিশোধের জন্য সে দীর্ঘ ১০ বছর অমানবিক পরিশ্রম করে। কিন্তু কাহিনির শেষে জানা যায়, ধার করা হারটি ছিল নকল হীরার, সস্তা। দরিদ্র ম্যাথিলডের জীবনের ১০টি বছর অপচয় হয়, পাঠকের হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। এই মর্মস্পর্শী আয়রনির জন্যই দ্য ডায়মন্ড নেকলেস বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প।

ঘটনার ঘনঘটার সঙ্গে সঙ্গে ভাবতে থাকো চরিত্র নিয়ে। চরিত্রচিত্রণ ঘটনা বর্ণনার অপরিহার্য অঙ্গ। থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘটনার জন্য উপযুক্ত চরিত্র তৈরি করতে হবে। হিসাব করতে হবে প্লটের জন্য কতগুলো চরিত্র লাগবে। কোনটি হবে প্রধান চরিত্র, আর কোনটি গৌণ। চরিত্রসমূহের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে হবে। তারা কি ডিন্যামিক/রাউন্ড হবে, নাকি স্ট্যাটিক/ফ্ল্যাট হবে। ডিন্যামিক/রাউন্ড ক্যারেকটার পূর্ণ বিকশিত জটিল চরিত্র যে ঘটনাক্রমে আচরণ বদলায় বা উপলব্ধির নতুন দিগন্তে হাজির হয়, আর স্ট্যাটিক/ফ্ল্যাট ক্যারেকটার অপেক্ষাকৃত সাদামাটা চরিত্র যে আগাগোড়া একই রকম থাকে। চরিত্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক-সংঘাত নিরূপণ করতে হবে। সম্ভব হলে ঘটনা ও চরিত্রের একটি ডায়াগ্রাম এঁকে ফেলো। কাহিনি সেই নকশা ধরে চলবে। ফলে লেখার সময় কোথাও আটকাতে হবে না। তবে মনে রাখতে হবে ডায়াগ্রাম অপরিবর্তনীয় নয়; লেখার সময় প্রয়োজনমতো এর পরিবর্তন হতে পারে। লেখকের মাথায় অনেক নতুন আইডিয়া আসে সৃষ্টিকর্মকালে। আর তা সৃষ্টিকে দেয় নতুন মাত্রা। পাঠক ঘটনা যেমন রাখে, চরিত্রও মনে রাখে। শরৎচন্দ্রের গফুর আর মহেশকে কে কবে ভুলতে পেরেছে?

এরপর চিন্তা করো স্থানকাল নিয়ে। স্থানকালকে ইংরেজিতে বলে সেটিং। এটি প্লট ও চরিত্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ ঘটনাগুলো কোথায় ও কখন ঘটছে, তার আভাস থাকতে হবে কাহিনিতে। ঘটনার স্থান হতে পারে খোলা মাঠ, ডাইনিং টেবিল, নদীর মাঝখানে বা পর্বতশিখরে। ঘটনার কাল হতে পারে বর্ষা বা গ্রীষ্ম, সকাল বা সন্ধ্যা, পরাধীনতা বা যুদ্ধের সময়। ঘটনা বর্ণনার সময় স্থানকাল প্রকারান্তরে চলে আসে। অনেক সময় স্পষ্ট উল্লিখিত হয় না। হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব, মূল ঘটনাটি ঘটে সাগরে এবং দৈত্যকার মার্লিন মাছের সঙ্গে সংগ্রাম চলে দুই দিন দুই রাত ধরে। হেমিংওয়ে কিছুতেই ঘটনাটি পুকুরে বা নদীতে ঘটাতে পারতেন না, তাতে উপন্যাসের থিম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতো। ‘মানুষকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু পরাজিত করা যায় না’—সান্তিয়াগোকে এই উপলব্ধিতে আনার জন্য স্থানকাল এক বড় নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে।

প্রতীকী ছবি। মডেল: আয়েশা
ছবি: প্রথম আলো

স্থানকালের পাশাপাশি চিন্তা করো দৃষ্টিকোণ বা পয়েন্ট অব ভিউ নিয়ে। দৃষ্টিকোণ বলতে বোঝায় ঘটনার বয়ান কীভাবে সংঘটিত হচ্ছে। এটি কি তৃতীয় পুরুষ, প্রথম পুরুষ, নাকি দ্বিতীয় পুরুষে হচ্ছে। যার চোখ দিয়ে ঘটনা দেখা হচ্ছে সে কি সর্বদ্রষ্টা নাকি স্বল্পদ্রষ্টা। একই প্লট কেবল দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের কারণে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদে হাজির হতে পারে। পৃথিবীর বেশির ভাগ কথাসাহিত্য তৃতীয় পুরুষের দৃষ্টিকোণে রচিত। এতে কথক চিত্রিত চরিত্রের বাইরে থাকে, কিন্তু কথকের মধ্যে লেখকের ব্যক্তিত্ব উঁকি মারে। অর্থাৎ তখন লেখকই বনে যান কথক। তিনি একপ্রকার ঈশ্বরের মতো সর্বজ্ঞ। তিনি তার আপন বিচারে, আপন প্রজ্ঞায়, আত্মসন্তুষ্টিতে সম্পন্ন করেন তার সৃষ্টি। প্রথম বা উত্তম পুরুষের দৃষ্টিকোণেও অনেক মহৎ সাহিত্য রচিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে শার্লোট ব্রন্টির ‘জেন আয়ার’ এবং এফ স্কট ফিটজেরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’র কথা। দ্বিতীয় পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে অপেক্ষাকৃত কত কথাসাহিত্য রচিত হয়েছে। এটি বরং উপদেশমূলক প্রবন্ধের জন্য বেশি উপযোগী।

আমাদের তালিকার শেষ উপাদানটি হলো কথোপকথন। ঘটনা পরম্পরায় স্থানে স্থানে প্রয়োজনমতো জুড়ে দাও কথাবার্তা। এতে কাহিনি প্রাণবন্ত হয়, বাস্তবসম্মত মনে হয়। বর্ণনার একঘেয়েমি থেকেও পাঠক কিছুটা রক্ষা পায়। কথোপকথন তৈরি করতে লাগে বাস্তবজ্ঞান, ভাষাবৈচিত্র্য। চরিত্র অনুযায়ী তাদের মুখ থেকে কথা বের করতে হয়। কথোপকথনে মুদ্রাদোষের সংশ্লেষ ঘটালে হাস্যরস তৈরি হয়। কথোপকথন তৈরির সময় বক্তাদের মধ্যে সম্পর্কটি মাথায় রাখতে হবে। পিতা–পুত্রের মধ্যে যে রকম সংলাপ হবে, নিশ্চয়ই প্রেমিক–প্রেমিকার মধ্যে সে রকম হবে না। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের কাহিনি হলে, চরিত্রদের মুখ দিয়ে বের করে আনো আঞ্চলিক ভাষা। তবে তা যেন বোধগম্য পর্যায়ে থাকে। অনেক সময় সংলাপের বিশেষ কোনো শব্দগুচ্ছই হয়ে ওঠে বাজওয়ার্ড, দীর্ঘকাল ধরে উচ্চারিত হয় পাঠকের মুখে মুখে। বাঁচিয়ে রাখে লেখককে। যেমন এখনো পর্যন্ত ‘তুই রাজাকার’ শুনলেই আমাদের চোখের সামনে হাজির হয় ‘বহুব্রীহি’র হুমায়ূন আহমেদের মুখ।

প্রতীকী ছবি
প্রথম আলো

কথাসাহিত্য রচনার নানা রকম নিয়মকানুন আছে। একেক বিশেষজ্ঞের একেক রকম উপদেশ। মার্কিন ঔপন্যাসিক টেডি ওয়েন মোটা দাগে কথাসাহিত্য রচনার আটটি নিয়ম বাতলেছেন, যেগুলো অনুসরণ করলে তোমরা তরুণ পাঠক-লেখকেরা উপকৃত হবে:

১. বলার চেষ্টা না করে দেখানোর চেষ্টা করো। অর্থাৎ বিবৃতি দিয়ো না। শব্দ দিয়ে চিত্র আঁকো, চরিত্রের কর্মকাণ্ডের দিকে মনোযোগ দাও।

২. ত্রিমাত্রিক চরিত্র তৈরি করো। চরিত্রগুলোর শারীরিক, মানসিক ও পারিবেশিক অবস্থা তুলে ধরো।

৩. একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ বেছে নাও। বয়ান দাও তৃতীয় বা উত্তম পুরুষে, কাহিনির জন্য যেটি বেশি উপযোগী।

৪. চরিত্রগুলোতে প্রেষণা সঞ্চার করো। তারা যে কাজে লিপ্ত হচ্ছে তার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করো।

৫. তোমার জানার পরিধির মধ্যে লেখার চেষ্টা করো। জানার বাইরে গেলে বিষয় উপস্থাপনে জটিলতা ও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

৬. সম্ভব হলে কাহিনিকে করুণরসে সিক্ত করো। লেখার সময় তুমি কাঁদবে, আর পড়ার সময় পাঠক কাঁদবে।

৭. বারবার পাণ্ডুলিপি পড়ো এবং সংশোধন করো। লেখাকে যথাসম্ভব নিখুঁত করো, উচ্চ মানে আসীন করো।

৮. নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। ভাবো তোমার লেখার ক্ষমতা আছে। তোমার মাথা থেকেও কোনো মাস্টারপিস বের হবে।

তরুণ পাঠক, তোমরা জানলে কথাসাহিত্যের উপাদানগুলো সম্পর্কে, নিয়মকানুন সম্পর্কে। প্রণয় সম্পন্ন হয়েছে। এবার প্রণয়নের আয়োজন করো। মনে রাখবে লিখনদক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না। এর জন্য সময় লাগে। ধীরে ধীরে নিজেকে লেখক হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। কথাসাহিত্যের কলাকৌশল জানা থাকলে নিজেকে গড়ে নেওয়া সহজ হয়। অবিরাম পাঠের মাধ্যমে কলাকৌশলের জ্ঞানলাভ হয়। অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সহায়তা নেন। আর সহায়তা দেওয়ার জন্যও অনেকে প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। যেমন বরেণ্য কানাডিয়ান লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেন তার ‘ফিকশন রাইটিং মাস্টারক্লাস’-এর মাধ্যমে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ নিশ্চয়ই কাজে লাগে। কিন্তু আমার বিচারে আত্মপ্রশিক্ষণই শ্রেয়। চোখ–কান খোলা রেখে পাঠ এবং তার সঙ্গে লেখালেখি। নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে অনবরত শাণিত করা, পড়ায়-লেখায় নিজেকে ঋদ্ধ করা। কেবল কথাসাহিত্য নয়, যেকোনো ক্ষেত্রে লেখক হতে হলে এর চেয়ে ভালো তরিকা আর নেই।