ওই দ্যাখো, নগ্ন পায় হেঁটে যায় বাংলাদেশ

ওই দ্যাখো, নগ্ন পায় হেঁটে যায় বাংলাদেশ
প্রতীকী ফাইল ছবি

সন্তান আর স্বজনের চোখের জল পেছনে ফেলে
হেঁটে যাচ্ছেন পোশাকশ্রমিক হাজেরা খাতুন
হেঁটে যাচ্ছেন উত্তরবঙ্গের রফিকুল, রহিমা বানু
হেঁটে যাচ্ছেন দক্ষিণবঙ্গের মনু মুন্সি, মল্লিকা
হেঁটে যাচ্ছেন হবিগঞ্জের হরমুজ আলী, হ্যাপি রায়
হেঁটে যাচ্ছেন কিশোরগঞ্জ, নিকলি, নেত্রকোনার জলিল, জয়নাল
হেঁটে যাচ্ছেন মাদারীপুর, মাগুরা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জের রুস্তম শেখ
হেঁটে যাচ্ছেন মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুরের বিনোদ কুমার
পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ থেকে এভাবে হেঁটে যাচ্ছেন তারা সকলে—গন্তব্য অভিন্ন।
হেঁটে যাচ্ছেন তারা অনুচ্চ বেদনায়, গুচ্ছ গুচ্ছ মিছিলে
হেঁটে যাচ্ছেন দিবালোকে সন্ধ্যার অন্ধকারে জোনাক পোকার মতো।
তারা হেঁটে যাচ্ছেন বধির বদ্বীপে বানের জলে ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতো।
তারা সকলে হেঁটে যাচ্ছেন চৈত্রের তপ্ত দুপুরে পিচঢালা পথে গোপন অশ্রুবিন্দুর মতো।
বাস নেই, ট্রেন নেই, নদীতে লঞ্চ নেই, তবু তারা অবিশ্বাস্য কদমে পার হচ্ছেন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা—তেরো শত নদীর জল।

তারা হাঁটছেন করোনার কালে—যখন জলে-স্থলে-অন্তরিক্ষে পৃথিবীর সকল বাহনের চাকা আজ স্তব্ধপ্রায়—যদিও চাকার কারিগর তারাই—তবু তাদের জন্য পৃথিবীর কোথাও আজ একটি চাকাও সচল নেই।
তবু পৃথিবীর নগর থেকে নগরীর রাজপথ ধরে তারা হেঁটে চলেছেন অবিশ্রান্ত, অবিরাম—
তারা হাঁটছেন শতসহস্র বছর ধরে,
সভ্যতার উষালগ্ন থেকে অদেখা স্বেদ, অশ্রু ও রক্তধারায়।
তারা হাঁটছেন আফ্রিকা থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় শেকলবন্দী দাসযুগে, এমনকি এশিয়ায়। নীল নদের তীরে পিরামিডে চাপা পাথরে পাথরে, যমুনার তীরে তাজমহলের কালজয়ী সৌন্দর্যে, সামন্ত প্রভুদের জোয়ালের নিচে, নীল চাষের কালে, শিল্পবিপ্লবের কালে শিকাগো শহরে, ম্যানচেস্টারে, ব্রিটিশ ভারতে কলকাতায়, করাচি ও ঢাকায়—তারা ছিলেন নির্ঘুম, নিরন্ন—এখনো তাদের সকলের গন্তব্য অভিন্ন।
করোনার কালে যখন পুরো পৃথিবী লকডাউনে কপাট বন্ধ করে ঘরে
তবু তারা হাঁটছেন শ্রমের শোষণের কোরাসে—
শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি, পাষাণ প্রাসাদে প্রাসাদে সুখনিদ্রা বাঁচিয়ে রাখবে বলে জন্মজন্মান্তরের এ হেঁটে চলা—বিপন্ন বেদনায়।
কী আশ্চর্য, তারা হেঁটে চলেছেন এই মারি ও মড়কের কালেও!
ওই দ্যাখো, নিরাপদে ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় কীভাবে নগ্ন পায় হেঁটে যায়—বাংলাদেশ—সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তে।