‘ভালোবাসা হলো স্বর্গ, স্বর্গই ভালোবাসা!’ লাইনটা আমার নানুর বেশ পছন্দের।
পড়াশোনার প্রতি নানুর ছিল অসম্ভব রকমের ঝোঁক! সুযোগ পেলেই পড়তেন আবার টুকটাক লিখতেনও। তাঁর সম্পর্কে যতদূর জানি, প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে ছিলেন বাল্যশিক্ষা পাস। ১২–১৩ বছর বয়সে যখন তাঁর স্কুলমাস্টারের সঙ্গে বিয়ে হয়, তখন নাকি তিনি খুব খুশি ছিলেন, আবার পড়তে পারবেন সেই সম্ভাবনায়।
বিয়ের পর যদিও স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি, তবে এতে তাঁর কোনো আফসোস ছিল না। নানাজান পড়ার পরিবেশ তাঁকে ঘরেই তৈরি করে দিয়েছিলেন। মাঝেমধ্যে নানুকে তিনি পড়াতেন। অসংখ্য ইংরেজি প্রবাদ বাক্য, কবিতা, শ্লোক আছে, যা তিনি নানুকে শিখিয়েছিলেন। নানুর প্রতি যে তিনি খুবই যত্নশীল ছিলেন, তা বুঝতাম একে অপরের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দেখে।
নানাজান গত হয়েছেন সেই কবে। অথচ তাঁর দেওয়া সব সুন্দর মুহূর্ত, শেখানো সবকিছু নানু খুব যত্নের সঙ্গে ৪০ বছর ধরে আগলে রেখেছেন। সযত্নে কখনো কখনো তিনি তাঁর স্মৃতিবটের মাটি উসকে দিতেন, পানি দিতেন। সুযোগ পেলে আমাদের দু–এক লাইন শুনিয়েও দিতেন।
নানুর টুকটাক লেখালেখির অভ্যাস ছিল। বইয়ের কোনো লাইন মনে ধরলেই কাগজে তা টুকে রাখতেন। অবশ্য এটিও তিনি নানাজানের কাছ থেকেই রপ্ত করেছিলেন। নিজের বানানো কিছু শ্লোকও লিখতেন। তবে কী লিখতেন, তা কখনোই জানতে বা দেখতে চাইতাম না।
আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে আমার নানুকে দেখতাম। দুপুরে গোসল, নামাজ, খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ করে তিনি যখন ভেজা চুল পিঠে এলিয়ে দিয়ে খাতা–কলম নিয়ে দু–চার লাইন লিখতে বসতেন, তখন তাঁকে অদ্ভুত সুন্দর লাগত। লেখা শেষ হলে বলতেন—
- রিকু, নানুর একটা কাজ করে দিতে পারবা?
আমি বুঝে ফেলতাম তিনি কী বলবেন। মুখের ওপর তাই বলেও ফেলতাম,
- বুড়ি দেখেন, আমার এখন অনেক কাজ। আমি পারব না। পরে সময় করে দেখে দেব।
একগাল হাসি দিয়ে বলতেন—
- নানুর কইলজা না তুই। একটু দেখি দেস না, বানানে কোনো ভুল আছেনি।
বুড়ির কনভিন্সিং পাওয়ার ছিল অতুলনীয়। ‘না’ করতে পারতাম না কিছুতেই। ইনিয়েবিনিয়ে কোনো না কোনোভাবে করিয়ে নিতেন।
তখন খুব বিরক্ত লাগত এ কাজটা। অথচ আজ...
কী আর করার। প্রকৃতির নিয়ম, অস্বীকার করা যায় না। তাঁকে হারালাম। আজীবনের জন্য বুড়ি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। এ যেন ঠিক নদীর তীর থেকে প্রবাহে ভেসে যাওয়ার মতো। ভেসে গিয়ে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কে জানে, তাঁর প্রতি এই গভীর বেদনাটুকুও হয়তো একসময় ভুলে যাব। বেদনা যে ক্ষণিক আর বিস্মৃতি চিরস্থায়ী!
‘ভালোবাসি’—অসংখ্যবার বলেছি...
তবে এখনকার ভালোবাসায় কেমন যেন হাহাকার...ধূসর হয়ে যায় কাছের সবকিছু।
লেখকের ঠিকানা: মালিবাগ, ঢাকা