আফজাল সাহেবের জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সবকিছুই তাঁর আয়ত্তে। বড় পদ, মোটা বেতন, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি সবই আছে। কিন্তু এই বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা। অফিসে সবার কাছে তাঁর সম্মান আছে, কিন্তু ঘরে ফিরে সেই হাসি বা উষ্ণতার পরশ নেই। স্ত্রী সীমা সব সময় ব্যস্ত, কথাবার্তাও কেমন যেন মলিন হয়ে গেছে। একমাত্র ছেলে নাবিল, বিদেশে পড়াশোনার সূত্রে বাবার থেকে দূরে।
সময়ের পরিবর্তনে আফজাল সাহেবের অজান্তে কখন যেন পরিবারের সঙ্গে তাঁর সংযোগ হারিয়ে গেল। ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা হয়, কিন্তু সেই আগের মতো আন্তরিকতা নেই।
এক বিকেলে অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত মনে তিনি নদীর পাড়ে হাঁটতে বের হলেন। হালকা বাতাস বইছে, নদীর পানির শব্দে চারদিকে প্রকৃতির এক শান্ত সুর। হাঁটতে হাঁটতে বেঞ্চিতে বসলেন।
এমন সময় তাঁর চোখ পড়ল কিছুটা দূরে এক ভিখারি পরিবারের ওপর। পরনে ময়লা ছেঁড়া কাপড়; বাবা পরম যত্নে ছেলেকে খাবার খাওয়াচ্ছেন আর মজার মজার কথা বলছে। সেগুলো শুনে ছেলেটির মুখে ফুটে উঠছে খিলখিল হাসি। সেই হাসি বাতাসে প্রতিধ্বনি হয়ে বারবার ফিরে আসছে। দুজনের মধ্যকার ভালোবাসার বন্ধন যেন প্রকৃতির শান্তির সঙ্গেও মিশে যাচ্ছে।
আফজাল সাহেবের ভাবনা থেমে গেল। একটা গভীর আলোড়ন হলো তাঁর ভেতরে। মনে পড়ল ছেলে নাবিলের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। একদিন নাবিল পার্কে তাঁর আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলেছিল, ‘আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। ভালোবাসি, বাবা।’
গভীর দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল আফজাল সাহের চোখ থেকে। ভিখারি বাবা আর ছেলের হাসি, তাদের সেই সহজ-সরল ভালোবাসা তাঁর হৃদয় ছুঁয়ে গেল। সেদিন বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে মনের জমানো সব কথা খুলে বললেন তিনি।
পরদিন সকালে আফজাল সাহেব প্রথমেই ছেলেকে ফোন করলেন। নাবিল ফোন ধরে অবাক হয়ে গেল। বাবার এমন আবেগপূর্ণ কণ্ঠ সে অনেক দিন শোনেনি। আফজাল সাহেব বললেন, ‘বাবা, তুই কেমন আছিস? অনেক দিন হলো তোর সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলিনি। তোকে অনেক মিস করি।’ নাবিল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘বাবা, আমিও আপনাকে মিস করি। আপনি কেমন আছেন?’
বাবা-ছেলের সেই কথোপকথন যেন সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা বরফ গলিয়ে দিল। আফজাল সাহেব উপলব্ধি করলেন, আসল সুখ কখনো বাইরের বাহারি জীবনে নয়, বরং মনের গভীরে লুকানো সম্পর্কের ভালোবাসায়।
এর পর থেকে আফজাল সাহেব আর আগের মতো কাজের চাপে হারিয়ে যান না। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে ভালোবাসায় ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা