বস্তির ঝুপড়ি ঘর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। গৃহকর্মী সালেহা বুবুর মেয়ে অর্পিতা কাঁদছে। অন্ধ ভিক্ষুককে এক শ টাকার নোট দিয়ে হাতের ইশারায় অর্পিতা বলেছিল, দশ টাকা রেখে নব্বই টাকা ফেরত দিতে। ভিক্ষুক ইশারা বুঝতে পারেনি। পুরো টাকাটা নিয়েই চলে গেছে। তা ছাড়া আগে নতুন জামার জন্য বায়না ধরেছিল। দুই অপরাধের জন্য সালেহা তাকে মেরেছে।
অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালায় সালেহা। বিকেলে রান্না করে ডাক্তার করিমের বাসায়। স্বামী জামাল রিকশা চালায়। তাদের ভালোবাসার বিয়ে। পালিয়ে বিয়ে করেছিল দুজনে। তাই আর বাড়িতে তোলেনি জামালের পরিবার। ৪০ বছরের সংসার তাদের। বাসায় লোক বলতে আগে ছিল তারা দুজন আর একটা বিড়ালছানা। কাজ করে সালেহা যে খাবার পায়, ঝুপড়িতে নিয়ে দুজনে ভাগাভাগি করে খায়। গল্প করে, একে অন্যকে খাইয়ে দেয়। ভালোবাসার কথামালা ফুরোয় না। মনে হয় ওরা যেন এ যুগের লাইলি-মজনু। আনন্দের পাশাপাশি একটা চাপা কষ্টও ছিল দুজনের। সন্তান নেই বলে পরিচিতদের কাছে সালেহাকে অনেক বিষবাক্য হজম করতে হয়েছে। কিন্তু এক বিবাহবার্ষিকীতে ফকিরদের খিচুড়ি খাওয়াতে গিয়েছিল দুজনে। ফেরার পথে নবজাতকের কান্নার শব্দ শুনতে পায়। জামাল দেখে ডাস্টবিনের ময়লার মধ্যে দুটো কুকুর একটা পলিব্যাগের পোঁটলা টানাটানি করছে। পোঁটলার ভেতর থেকে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। ফুটফুটে ফুলের মতো সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু। কুকুরকে তাড়িয়ে দিয়ে শিশুটিকে বুকে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে চলে আসে দুজনে। কুড়িয়ে পাওয়া অর্পিতা কথা বলতে পারে না ছোটবেলা থেকে।
অর্পিতা কাঁদতে দেখে ডাক্তার করিম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সালেহা, তোমার মেয়ে কাঁদছে কেন?’ ‘স্যার, বইলেন না, জন্মদিনে নতুন জামার জন্য বায়না ধরেছে। এক শ টাকা দিয়েছিলাম কলেজে যাওয়ার জন্য, সেই টাকা ফকিরকে দিয়ে দিছে। ওর বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে বসে আছে দুবছর। কত কষ্ট করে সংসারের ঘানি টানছি স্যার, আমি জানি আর আমার খোদা জানে।’ বলে সালেহা।
অর্পিতা এসএসসিতে জিপিএ–৫ পেয়েছিল। এখন অর্পিতা দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছে সরকারি মহিলা কলেজে। অর্পিতা জলরং দিয়ে ভালো ছবি আঁকতে পারে। জেলা পর্যায়ে ছবি আঁকা ও কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। ডাক্তার করিম সালেহাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘অর্পিতাকে আর কখনো মারবে না। সে তো মানবিক কাজ করেছে, কোনো অপরাধ করেনি।’ সালেহা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে দিল। ডাক্তার করিম সালেহাকে দুই হাজার টাকা দিয়ে বললেন, ‘মেয়েকে একটা জামা কিনে দিয়ো।’
এর বেশ কিছুদিন পর এক বিকেলে বস্তি থেকে দৌড়ে ডাক্তার করিমের বাসায় এসে হাঁপাতে থাকে অর্পিতা। সালেহা চিৎকার করে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করে, ‘ কী হয়েছে?’ হাতের ইশারায় অর্পিতা বোঝানোর চেষ্টা করে। বুঝতে না পেরে মেয়ের সঙ্গে কাঁদতে শুরু করে সালেহা। ডাক্তার করিম দৃশ্যটা দেখে উপলব্ধি করেন, কিছু একটা ঘটেছে। বস্তিতে ইদানীং উটকো ছেলেদের উৎপাত বেড়েছে। তাদের একজন অর্পিতাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বলেছে রাজি না হলে তুলে নিয়ে যাবে। অর্পিতার চোখেমুখে আতঙ্ক। দরজায় ঠক ঠক করলে সে ভয় পায়। চিন্তায় ঘুম হয় না সালেহার।
সব শুনে ডাক্তার করিম সালেহাকে বলেন, ‘চিন্তা কোরো না। আমি বিষয়টা দেখছি।’ বিষয়টা নিয়ে থানায় অভিযোগ করেন তিনি। পরদিন থানা থেকে পুলিশ এসে তাদের ধরে নিয়ে যায়। সেদিনই ডাক্তার করিম সালেহাকে অর্পিতাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। বিনা পয়সায় অর্পিতার চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। অর্পিতা মোটামুটি কথা বলতে পারে এখন। এইচএসসিতেও জিপিএ–৫ পেয়েছে সে। তার দুচোখে অগণিত স্বপ্ন। সে স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলেছে।