বাইরে তীব্র শীত, ঘন কুয়াশা। গায়ে চাদর জড়িয়ে জানালা খুলে বসে আছে আনিস সাহেব। একটু হাঁটাহাঁটি করার খুব দরকার। দেহ-মনের জন্য। গেল সপ্তাহে রিটায়ার করেছেন। এই এক সপ্তাহে তিনি হাঁপিয়ে গেছেন। অলস মানুষের জীবন যে কত ভয়ংকর হতে পারে, তা তিনি মিনিটে মিনিটে টের পাচ্ছেন।
কাজের মেয়ে মর্জিনাকে ডাকলেন, ‘মর্জিনা, ও মর্জিনা?’
সে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে বলল, ‘জি খালুজান...’
‘কয়টা বাজে?’
‘আমি তো ঘড়ি চিনি না। ক্যামনে কমু কয়টা বাজে?’
‘দুই দিন আগে তোমাকে ঘড়ির সময় সম্পর্কে হাতে-কলমে শিখিয়ে দিলাম, আজই ভুলে গেছ? কী আশ্চর্য!’
মর্জিনা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘গরিব মাইনসের মন, নষ্ট ঘড়ির কাঁটার মতন। যতই নতুন ব্যাটারি দেন (যতই হাতে–কলমে শিখান) কামে আর লাগব না।’
‘নোরা কোথায়?’
‘আফামণি ছাদে গেছে। গাছদের সঙ্গে গপসপ করতে। বাড়িতে মানুষের অভাব পড়েছে!’
‘কী আশ্চর্য!’
‘বড়ই আশ্চর্য খালুজান!’
‘যাও, চা নিয়ে আসো।’
‘খালুজান, দুইটা চুলাই বন্ধ। রান্না শেষ হইলে চা দিতে পারুম।’
এই সুন্দর কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে আগুন–গরম চা খেতে খেতে কুয়াশা দেখার মজাই আলাদা। আগে জানলে চাকরি–বাকরি ছেড়ে বসে বসে কুয়াশা দেখতাম।
‘দেখেছ মর্জিনা, কুয়াশা কত সুন্দর, তাই না?’
মর্জিনা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল, ‘কুয়াশা আবার সুন্দর ক্যামনে? দুই হাত দূরের জিনিস দ্যাখন যায় না, ধরন যায় না। কুয়াশা নাকি আবার সুন্দর। কী পাগল পরিবারের কামকাজ করি, সবগুলোর মাথা আউলায়া গেছে।’
দুই.
আনিস সাহেব হাঁটতে হাঁটতে মালিবাগ–মৌচাক মোড়ে এলেন। ফুটপাতে যত্ন করে এক লোক ভাপাপিঠা বানাচ্ছেন। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সাধারণ–অসাধারণ—সবাই ভিড় করছে। তিনিও কৌতূহলবশত এগিয়ে এলেন। কাঠের আগুন, মাটির পাতিল থেকে ধোঁয়া-ওঠা সাদা-শুভ্র নরম-কোমল তুলতুলে দিলরুবা ভাপাপিঠার আয়োজন চলছে। আনিস সাহেব পরপর দুইটা মুখে পুরলেন। খেতে অমৃত। পাশেই একটা পাতলা ফিনফিনে ফ্রক গায়ে দিয়ে বসে আছে একটা শিশু। বয়স আর কত হবে, নয় কিংবা দশ। কিন্তু এই বয়সেই তার সারা শরীরে বয়সের ছাপ পড়ে গেছে। পেট ভরে দুই বেলা খাওয়ার কথা সে ভুলেই গেছে। তার বুকের পাঁজরের হাড়গুলো গোনা যায়। সেই হাড়গুলো যেন নীরবে সাক্ষী দেয়, কত দিন, কত রাত তাকে উপোস থাকতে হয়েছে। ক্ষুধার জ্বালায় যখন পেট চোঁ–চোঁ করে, তখন সে হয়তো এক গ্লাস পানি খেয়ে পেটের জ্বালা মেটানোর চেষ্টা করে।
আনিস সাহেব একটা পিঠা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘কী নাম তোমার?’
অস্পষ্ট স্বরে বলল, ‘আসমানী।’
আনিস সাহেব নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন, ‘কী সুন্দর, কী সুন্দর নাম।’
আসমানী মেয়েটার নাম যতটা উজ্জ্বল, তার জীবন ততটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন।
আনিস সাহেব বললেন, ‘তুমি এই সাতসকালে ফুল নিয়ে বসেছ?’
‘জি।’
‘ফুল বেচে তোমার সংসার চলে?’এই প্রশ্ন করে তিনি থেমে গেলেন। আবার বললেন, ‘তোমার পরিবারে আর কে কে আছে?’
আসমানী টলমল চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কেউ নাই।’
এত বড় একটা দুনিয়া, অথচ মেয়েটি বলছে তার কেউ নেই! কী ভয়ংকর নির্মম বাস্তবতা।
‘তুমি থাকো কোথায়?’
আসমানী হাত উঁচু করে ওই দিকটা ইশারা করে বলল, ‘মালিবাগ বস্তিতে।’
‘ওহ। আমার অনেকগুলো ফুলের দরকার ছিল। এখানেই কি তোমার সব ফুল আছে?’
‘না, আরও আছে ঘরে।’
‘চলো, তোমার ফুলগুলো দেখে আমি কিনে নেব।’
তিন.
রেললাইনের পাশেই আসমানীদের একটা ছোট্ট ঘর। ঠিক ঘর বলা যাচ্ছে না, কালো পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছাউনি। অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। আনিস সাহেব কোমর ভেঙে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলেন। চালের জায়গায় জায়গায় ফুটো। আকাশ দেখা যায়। আকাশ ভেঙে যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে, ঘরের ভেতর তখন আর কোনো শুকনা জায়গা থাকে না। আসমানী এক কোণে দলা হয়ে বসে থাকে, তারপরও রেহাই পায় না, ওপর থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ে গা ভিজে যায়। মাটির মেঝেটা কাদা প্যাচপ্যেচে হয়ে ওঠে। কালবৈশাখীর ঝাপটা এলে এই নড়বড়ে ঘরটি বুঝি এখনই উড়ে যাবে। খুঁটিগুলো মড়মড় করে উঠবে, ঘরের বেড়াগুলো কাঁপতে থাকবে। সেই কাঁপুনির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আসমানীদের বুকেও চলবে সমানতালে আতঙ্কের কাঁপন। সারারাত জেগে ঘরের খুঁটি ধরে বসে থাকা ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকবে না।
এই নড়বড়ে ছাদের নিচেই আসমানীরা বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে। আনিস সাহেব মনে মনে বললেন, আসমানীদের জীবন আমাদের শিখিয়ে দেয়, পৃথিবীর একপাশে যখন প্রাচুর্যের জোয়ার বয়, অন্যপাশে আসমানীদের মতো শিশুরা একবেলা খাবারের জন্য বা একটু ওষুধের জন্য ধুঁকে ধুঁকে মরে। এই জীর্ণ কুটিরে বছরের পর বছর হয়তো কোনো আসমানী বৃষ্টির শব্দে কেঁপে ওঠে, আর তার চোখের জল বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়।
আমাদের সমাজের এই বৈষম্য আর অবহেলাই আসমানীদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আসমানী শুধু একজন নয়, সে বাংলার হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর এক জীবন্ত প্রতিকৃতি।
আনিস সাহেব বললেন, ‘আসমানী, তুমি আমার সঙ্গে যাবে?’
আসমানী মুখে কিছু বলল না, তার ছোট্ট ছাউনির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। কী ভাবল কে জানে।
খানিক বাদে আসমানী আর আনিস সাহেব পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলেন। পথ চলতে চলতে তারা গল্পে মেতে উঠলেন। আনিস সাহেবের মনে হলো, মেয়েটি যেন ধীরে ধীরে পল্লিকবি জসীম উদ্দীনের সেই বিখ্যাত ‘আসমানী’ কবিতার মতোই জীবন্ত হয়ে উঠছে। কবির সেই কালজয়ী লাইনগুলো তার কানে বাজতে লাগল:
‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দীর ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা- ভেন্না পাতার ছানি, একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি। একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে, তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।’
শিক্ষার্থী, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ