প্রকৃতির পালাবদলের ডাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রেমের গল্প ‘প্রিয় কমলা’

শাহরিয়ার নাজিম জয়ের পরিচালনায় ‘প্রিয় কমলা’ ছবিতে অভিনয় করেছেন অপু বিশ্বাস ও বাপ্পী চৌধুরীছবি: চ্যানেল আইয়ের সৌজন্যে

প্রেম-প্রকৃতি-যুদ্ধ, অন্তর্জাগরণ-বহির্জাগরণ শূন্যের অতলে ঢেউ, মানবিক সংবহনতন্ত্র—সবই এসে মিশেছে সমান্তরাল রেখায় শাহরিয়ার নাজিম জয়ের সুন্দর কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং দক্ষ পরিচালনায় নির্মিত ‘প্রিয় কমলা’ চলচ্চিত্রে। দেখলেই বোঝা যায়, জয় একজন প্রগতিশীল ধারার মননশীল পরিচালক। একজন অন্তর্মুখী দার্শনিক চিন্তক। ভেতরে তিনি প্রাচীনপন্থী, ইতিহাসপন্থী জাতিসত্তার গাম্ভীর্য ভাবধারা বহন করেন। আবার সমকালীন তরুণ প্রজন্মের মতো নিজেকে সময়ের স্রোতে চির নতুন রাখতে চান। তাঁর গল্প এবং চলচ্চিত্র নির্মাণদর্শন খুব বেশি জটিল কিছু নয়। খুবই সহজ-সরল ও সাধারণ। কিন্তু যে বার্তাটি দিতে চান, তা অসাধারণের মধ্যে অসাধারণ।

‘প্রিয় কমলা’ চলচ্চিত্রটি প্রিয়তমা প্রাণপ্রিয়া কমলার প্রতি একধরনের স্মৃতি তর্পণ বলা যেতে পারে। আবার গল্পের বাঁধুনিতে প্রিয় এবং কমলা নামের দুটি চরিত্রের ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রেমকাহিনিও বটে। বাবা ঋণ শোধ করতে না পেরে কমলাকে গ্রামের এক নারীলোলুপ রাজাকার মহাজনের হাতে তুলে দিয়েছে। কলমা পড়ে সেই ব্যক্তি কমলাকে বিয়ে করে। মানে, ধর্মীয় আচার-আচরণ মেনে চলার ভান আছে। কিন্তু অন্তরে জাগ্রত যে ধর্মবোধ মানুষে মানুষে বিভেদ ঘুচিয়ে সহনশীল করে তোলে, মানবিক মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করে, সেই পথে সে চলে না। মানুষকে বোঝায়, শেখ মুজিব পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। পাকিস্তান হলো মহান আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্র। শেখ মুজিব সেই মুসলমানদের দেশটাকে হিন্দুর দেশ বানাতে চাচ্ছে। তিনি ভালো মানুষ নন। একজন বাঙালি হয়ে নিজেদের দেশের মাটিতে পাকিস্তানিদের কাছে শোষণ, নিপীড়ন, অত্যাচারের পরাধীনতার যে দীর্ঘ ইতিহাস, তা তার ভেতরে জ্বালাপোড়া বা ঘেন্নার সৃষ্টি করে না। স্বদেশি মরছে মরুক, সে গোলামি খেটে পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে চায়।

অন্যদিকে অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে যাকে ঘরে এনে দাসী করে রেখেছে, সেই কমলা কিন্তু কলমাও পড়েনি, কবুলও বলেনি। রাজাকার স্বামীকে সরাসরি বলে, রাতে যদি কখনো শরীর ছুঁতে আসে, তবে কুপিয়ে খুন করবে আর নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে মরবে। এখান থেকে বোঝা যায়, গৃহবন্দী নারীরাও ঘরে-বাইরে প্রতিবাদী সত্তা হয়ে নিয়ত যুদ্ধ করে স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দিতে প্রস্তুত। পরিচালক প্রথমেই আমাদের জানিয়ে দেন, একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। সুতরাং ইতিহাস এই চলচ্চিত্রের পরতে পরতে ছায়া ফেলে যাবে।

একজন বর্ষীয়ান লেখক মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়, নিজের জীবনের কাহিনি নিয়ে বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে যার দীর্ঘ আড়াল যাপন থেকে জনসমক্ষে আসা। টিভি চ্যানেলের লেখকের মুখোমুখি অনুষ্ঠানের শুরুতে একদল সাংবাদিক ঘিরে থাকেন। বোঝা যায়, জনপ্রিয়তার নিরিখে আড়ালে থাকা মানুষটিও কম কিছু নন। অনুষ্ঠান চলাকালে নিরুত্তর থাকা মানুষটির নিজেকে উন্মোচন। সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যদি গল্পের প্রিয় হয়ে থাকেন, তাহলে তো আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু আপনি যে একজন মুক্তিযোদ্ধা, সবাই তো তা জানে না।’ বোঝা যায়, মুক্তিযোদ্ধারা কিছু পাওয়ার জন্য, নেতা-মন্ত্রী বা ভবিষ্যতের জনপ্রিয় তারকা হওয়ার জন্য দেশ স্বাধীন করেননি।

অপু বিশ্বাসকে কমলা চরিত্রে বীরাঙ্গনা বলা হচ্ছে। কিন্তু গল্পের ভেতরে সেই বীরাঙ্গনার সরাসরি যুদ্ধের একটা অংশ নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো। এই বীরাঙ্গনা যেন অবলা প্রকৃতির ফোঁস করে জ্বলে উঠেও আগুন ধরে রাখতে পারছে না।

প্রিয় চরিত্রে বাপ্পি চৌধুরীর গাম্ভীর্য, কথা বলার ভঙ্গিমা একজন জীবনপোড়া লেখকের ভেতরের সত্তা স্বমহিমায় প্রকাশিত হয়। তরুণ দামাল প্রকৃতির ডাক শোনা বাপ্পি, আর বয়স পেরিয়ে আসা বাপ্পি—দুটি চরিত্রের মধ্যে অনেক তফাত। আবার নিজের ভেতরে মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলে চলা দুটি চরিত্র একই জায়গায় এসে যেন মিলে যায়। বাপ্পির অন্তর্নিহিত ভেতরের জগৎ হলো প্রকৃতির ডাকের আধ্যাত্মিক জগৎ, আর বাইরের জগৎ হলো প্রকৃতির পালাবদলের মুক্তির ডাকের উন্মুক্ত স্বাধীনতার জগৎ। ভেতর আর বাইরের মিলনে আত্মজাগরণে সে জনতার জাগরণের কান্ডারি হয়ে ওঠে, মুক্তির ডাকে হাতে যুদ্ধের অস্ত্র তুলে নেয়। স্বাধীনতার ৫০ বছর বয়সে এসে আবার তার লেখকসত্তা গোটা জীবনের দগ্ধ দহনের পুরোনো স্মৃতিকে তুলে এনে নিজেকে উন্মুক্ত করতে চায়। এখানেই গল্পটির এবং চরিত্রটির অন্তর্নিহিত মাহাত্ম্য পরিস্ফুটিত হয়।

অপু বিশ্বাসকে কমলা চরিত্রে বীরাঙ্গনা বলা হচ্ছে। কিন্তু গল্পের ভেতরে সেই বীরাঙ্গনার সরাসরি যুদ্ধের একটা অংশ নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো। এই বীরাঙ্গনা যেন অবলা প্রকৃতির ফোঁস করে জ্বলে উঠেও আগুন ধরে রাখতে পারছে না। গল্পের সেই জায়গা নেই। সে ধর্ষিতা হচ্ছে, সেই সময়ে ফাঁদে ফেলে পাকিস্তানি সেনা কর্তাকে কেন হত্যা করতে পারল না? স্বামীর আনা বাজারে পাকিস্তানি সেনা কর্তাকে খাওয়ানোর জন্য রান্না করা খাবার মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ায়। পরম আদরে বাপ্পির মুখেও বরাবরের মতো মুখে খাবার তুলে দেয়। আমাদের মমতাময়ী নারীরা চিরকালই এই কাজগুলো করে এসেছে। মুক্তিযোদ্ধার পাশে থেকে যুদ্ধে সেবা করা, অনুপ্রেরণা দেওয়া—এসবও কম কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া নারীকেও তো আমরা দেখেছি। বীরাঙ্গনা সত্তাটি আরও একটু বড় আকারে মেলে ধরার প্রয়োজন ছিল। সে নিজে হাতে অস্ত্র তুলে নিল না কেন?

এমন তো হতে পারত, মুক্তিযোদ্ধাদের খেতে দেওয়া খাবারের কিছু অংশে সে বিষ মিশিয়ে নিয়ে গিয়ে সেনা কর্তাকে খেতে দিচ্ছে। পরে ধরা পড়ে অত্যাচারিত হওয়ার আগে বিপ্লবী প্রীতিলতার মতো পটাশিয়াম সাইনাইডের মোড়ক খুলে নিজে খেয়ে নিচ্ছে। এমনও হতে পারত, সেনা ক্যাম্পে ঢুকে সে কোমর থেকে মানববোমা উন্মোচিত করে গোটা ক্যাম্প বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিচ্ছে, যেভাবে ‘গেরিলা’ জয়া আহসান করেছিল। কিংবা গ্রামের এই সাধারণ বধূ হাতের কাছে এত কিছু না পেয়ে কোমরে গুঁজে একটা ধারালো ছুরি নিয়ে যাচ্ছে হত্যা করার জন্য। অবশ্য নিজের স্বামী তাকে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে ক্যাম্পে সেনা কর্তার হাতে তুলে দিচ্ছে। এত কিছু করার উপায়ও তার ছিল না।

আবার পরিচালক নিজেও আসলে গল্পকে এতটা জটিল করে না তুলে খুব বেশি খুনখারাবির দিকে না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নিটোল একটা প্রেমের গল্প দাঁড় করাতে চেয়েছেন। প্রিয় চরিত্রটির ওপর বেশি আলোকপাত করে গল্পটিকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। এই অহিংস আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে সহিংস যুদ্ধে আবির্ভাব—এখানেও যে গভীর প্রেমের লীলাখেলা। বুকের ভেতরে প্রেম ছিল বলেই না মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য অস্ত্র ধরেছেন। মানবিক রক্ত মাংসের কাম-মোহের নর-নারীর প্রেম, এখানে আরও বৃহত্তর অর্থে মা-মাটি ও মানুষের মুক্তির জন্য দেশপ্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে।

প্রকৃতির কথা শুনতে পাওয়ার বিষয়টি এই চলচ্চিত্রের কাব্যিক এবং আকর্ষণীয় দিক। তবে প্রেমিকা যখন প্রেমিকের মুখে আহার তুলে দিচ্ছে, তখনো চোখ বন্ধ করে প্রেমিক প্রকৃতির বার্তা শুনতে পাচ্ছে—বিষয়টা একটু অন্য রকম হতে পারত। ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে…’ রবীন্দ্রসংগীতের অনবদ্য চিত্রায়ণ খুবই ভালো লাগে। অপুর হাতে পিতলের আলোক বাতিটি তাকে শুধু সুন্দরী নয়, ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ মুক্তিযুদ্ধের নারী জাগরণের এবং ভবিষ্যতের আলোক স্তম্ভ করে তোলে। সুন্দরী অভিনেত্রী অপু সংলাপ বলার মধ্য দিয়েও আকর্ষণীয়া, হৃদয়গ্রাহী। দর্শকের হৃদয়ে মোচড় কাটতে পারেন। অভিনেত্রীদের সব সময় নিজের গ্ল্যামার দেখাতে হবে, এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নই। গ্রামবাংলার সবুজ-সতেজ প্রকৃতি এবং সিনেমার সেট নির্মাণ অপূর্ব। চোখের আর মনের আরাম এনে দেয়। ইউসুফ আলী খোকন এবং হোসাইন মোহাম্মদ বেলালের শিল্প নির্দেশনা ভালো লাগে। শহীদুল্লাহ শোভনের চিত্রগ্রহণ মনোমুগ্ধকর। পলাশ মাহমুদের রূপসজ্জা নজর কাড়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চিরকালীন গান এবং ফরিদুর রেজা সাগরের লেখা সুন্দর একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সামিনা চৌধুরী, আগুন ও অনিমা রায়।

আজম বাবু, সুজন আরিফের আবহ সংগীত যথাযথ। অপু বিশ্বাস, বাপ্পি চৌধুরী ছাড়াও অভিনয় করেছেন সোহেল খান, মালা খন্দকার, সেহাঙ্গল বিপ্লব, পারভেজ সুমন, আশরাফ কবীর, অধরা প্রিয়া, রাইহান হোসাইন আজান, শাহিন মৃধা, সাফি আহমেদ। শিশুশিল্পী আজানের কণ্ঠে বারবার শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ মুগ্ধ করে। এই ঐতিহাসিক ভাষণের মহিমা প্রকৃত অর্থেই পরিস্ফুটিত হয়। এই শিশুশিল্পী স্মৃতিতে লেখকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে বারবার। বলে, ‘প্রিয় বাবা, তুমি তো বুড়ো হয়ে গেছ, কিন্তু আমি এখনো একই রকম আছি..’। কারণ, শিশু মুক্তিযোদ্ধাটি এখন বেহেশতের ফুল। তার বাবা রাজাকার ছিল, সে দেশের জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে। রাজাকারের সন্তান যে রাজাকার হবে, তারও কোনো মানে নেই, লেখক-পরিচালক বুঝিয়ে দেন। শিশুকণ্ঠে সতর্কবার্তাও ধ্বনিত হয়, ‘আমার বাবা কিন্তু এখনো বেঁচে আছে। ওরা কিন্তু এখনো অনেক শক্তিশালী।’

ইতিহাসটা একাত্তর সালের হলেও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না।

হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত