ভাঁজা গাই

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

হাম্বা হাম্বা হাঁক তুলছে পাশের বাড়ির শিংওয়ালা লাল ভাঁজা গাই। সাতসকালে ঘুমটা ভেঙে গেল।

সুবর্ণ এক্সপ্রেসটা লেট করায় গভীর রাতে বাড়িতে ফেরা। আকাশে মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। দৈত্যাকার শুভ্র মেঘরাশিকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন একেকটা বরফের পর্বত। জানালার ফাঁক দিয়ে শান্ত সকালের মৃদু সমীরণ শিরশির করে বইছে। মাঝেমধ্যে দোয়েল পাখি শিস তুলছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি, পাশের বাড়িতে অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে। সাতসকালে গন্ডগোল কিসের, বুঝলাম না। র‍্যাব, পুলিশ, টিভি-ক্যামেরাও দেখা যাচ্ছে।
ঘুম থেকে উঠে কাজের ছেলে বার্মা হাবিবকে ডাকলাম, ‘কী রে হাবিব, কী হয়েছে?’
হাবিব বলল, ‘স্যার, ওই যে কুরা আব্বই (মুরগি আবু) আছে না, ওর কোরবানির গাইটা মারা গেছে।’
বাসার বুয়া খালা কানে কম শোনে। ‘মারা গেছে’ শুনে সে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে চিৎকার দিয়ে, ‘আল্লাহ গো, আম্মাকে বলে আসি’ বলে দৌড় দিল।
কে মারা গেছে, বুয়া খালা বিস্তারিত শোনেনি। কিছুটা হাসি পেল।
খালা আম্মাকে গিয়ে বলেছে, পাশের বাড়ির কুরা আবু ভাই মারা গেছে।
পরে আম্মাকে ডেকে বললাম, না না, আবুর কোরবানি ঈদের গরু মারা গেছে।
বুয়া খালা খিলখিল করে হেসে বলল, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ। মুই কানে কম হুনি তো আম্মা, ভুল হুনইছি।’

কুরা আবুর ‘বন্যা এগ্রো ফার্ম’ নামে বিশাল খামার আছে। একদিন হাবিবকে বললাম, ‘হাবিব, সবাই কুরা আবু কেন ডাকে ওকে?’
হাবিব বলল, ‘স্যার, মেলা কাহিনি। কুরা আবু নামকরণেরও একটা গল্প আছে। কুরা আবু ছোটবেলা থেকে মুরগি চুরি করত। সেই থেকে তার নাম কুরা আবু।’

কুরা আবু বছর দুয়েক আগে শখ করে কোরবানি ঈদের জন্য ভাঁজা গরু কিনেছে। এটাকে মোটা–তাজাকরণ করে বড় করে হাটে বিক্রি করা হবে। কুরা আবুর ম্যানেজার কালা বাবুল ইদানীং ভাঁজা গাইয়ের পেছনে পড়ে থাকে। ভাঁজার পেছনে যে সময় দিচ্ছে, বিয়ে করা নতুন বউকেও এত সময় দেয় না।
কালা বাবুল ভাঁজা গাইকে উকুননাশক শ্যাম্পু দিয়ে মাথা ও লেজ পরিষ্কার করে। স্ত্রীর ব্যবহৃত বিদেশি খুশবু সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে দেয়। নিজের স্ত্রীর হেয়ার ড্রাই মেশিন দিয়ে ভাঁজা গাইয়ের লোম শুকিয়ে দেয়। ভাঁজার ওলানে তিব্বত কদুর তেল মেখে টিপাটিপি করে। কালা বাবুলের শরীরে শিহরণ হয়। গরুর সারা শরীরে পারফিউমও দেয়। চিরুনি দিয়ে লোম আঁচড়ে দেয়, গলায় কাঁচা ফুলের মালা পরায়।
ভাঁজা গরুর যত্ন করার দৃশ্য দূর থেকে দেখে ফেলে কালা বাবুলের স্ত্রী। ওমনি রেগে অগ্নিশর্মা কালা বাবুলের স্ত্রী, ‘বেডা পারে না আমার পরার শাড়ি–ব্লাউজ, অন্তর্বাস, ভাঁজা গাইরে পরাইতে! পারলে সেটাও করত।’ এরপর ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ানি দেয় কালা বাবুলকে।

কুরা আবু কালা বাবুলকে বলে দিয়েছে, ভাঁজা গাইকে মোটাতাজা করার ডোজটা বাড়িয়ে দিতে। এরপরই সে খামারের সব গরু-মহিষের বিদেশি কেমিক্যাল ইনজেকশনের ডোজ বাড়িয়ে দিল।
এক রাতে কালা বাবুল তার স্ত্রীর সঙ্গে পান চিবুতে চিবুতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বচন আবৃত্তি করল, ‘চিতা বিতা ভাঁজা গাই, ধমক আছে চউন্যা নাই। কুরা আবুর ভাঁজা গাই, কোরবানের আগে বিয়ন চাই।’
হঠাৎ হাম্বা–হাম্বা চিৎকার। স্ত্রীসহ দৌড়ে খামারে গিয়ে কালা বাবুল দেখে, ভাঁজা গাইটার পেট কেমন যেন ফুলে গেছে। একেবারে পোয়াতি গাভির মতো। স্ত্রী কালা বাবুলের দিকে সন্দেহের তির ছোড়ে।
‘কিরে, কুরা আবুর ভাঁজা গাই গর্ভবতী হয়েছে। ভাঁজা গাইয়ের সন্তান মনে হয় তোমার ওরশে।’
কালা বাবুল বলে, ‘বউ এসব কও কী তুমি! ছি ছি! আস্তাগফিরুল্লাহ!’ তওবা করে। ভাঁজা গাই হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে।

সোনা মিয়া ডাক্তারকে ফোন করল কালা বাবুল। কয়েকবার ফোন করার পর সোনা মিয়া ফোন রিসিভ করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করল। বেচারা সবেমাত্র বউকে নিয়ে ঘুমাতে গেছে। রাত দুটো বাজে কেউ ফোন করে? কালা বাবুল বলে, ‘ডাক্তার সাব, কোরবানির ভাঁজা গরু প্রেগনেন্ট।’
সোনা মিয়া বলল, ‘এই আকামটা কেডা করল? নিশ্চয়ই তুমি করেছ!’

আরও পড়ুন

সোনা মিয়া ডাক্তার ভাঁজা গাইকে পেট টিপে টিপে দেখল। দেখা শেষে বলল, ‘মোটা–তাজাকরণের ট্যাবলেট ইচ্ছামতো খাওয়াইছ। গরু তো বাঁচবে না।’
বাবুলের স্ত্রী বিলাপ করে কাঁদছে। ‘কই গো, কুরা আবু ভাইরে খবর দাও।’
‘ওরে আল্লারে’ বলে কালা বাবুলও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
শেষ রাতে ভাঁজা গাইটা মারা গেল।

পরদিন সকালে কুরা আবুর এগ্রো ফার্মে র‍্যাব-পুলিশ-সাংবাদিক জড়ো হলো। কালা বাবুল পুলিশ দেখে ভয়ে অজ্ঞান হওয়ার ভাণ করল। পুলিশ লাঠি দিয়ে সজোর বাড়ি দিতেই কালা বাবুল পরিধানের কাপড়ে জলবিয়োগ করে দিল।
‘ওরে বাবা রে—আব্বা, আমারে মাইরেন না। স্যার, আমারে ছেড়ে দেন।’
গরুকে অবৈধ উপায়ে মোটা–তাজাকরণ করার অভিযোগে কুরা আবু ও কালা বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হলো।
কুরা আবু বলল, ‘জীবনে চার শ বিশগিরি কখনো করব না। বুঝতে পেরেছি, বেশি মুনাফার লোভ ভালো না। জীবনে আর কখনো অবুঝ পশুকে অবৈধ উপায়ে মোটা–তাজাকরণ করব না।’
কুরা আবু গালে চড় মেরে তওবা করতে লাগল। কানে ধরে সিজদায় পড়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাইতে লাগল।

উপদেষ্টা, পটিয়া বন্ধুসভা