মেয়েটা অদ্ভুত সুন্দর করে বলত, ‘জীবন নিয়ে কিসের এত চিন্তা! এক জীবন তো ভালোবেসেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।’
রাফির ওপর দিয়ে ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত বয়ে যাচ্ছে। ঘটনা গুরুতর। ইরিন আর থাকবে না। এবার মনে হয় সত্যিই বিচ্ছেদ হতে চলেছে। কথার ঝাঁজ শুনেই বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি, ‘রাফি, সম্পর্ক শেষ মানে শেষ। কোনো যোগাযোগ রাখবা না আর। একটার পর একটা বিয়ে আটকিয়ে যাচ্ছি। তুমি কী করছ? ঘোড়ার ডিম…’
রাফি চুপচাপ শুনে যাচ্ছে আর ভাবছে, ঘোড়ার ডিমের কথা। একটা চাকরির জন্য আর কত কথা শুনবে! এমনটা নয় যে সে বসে থেকে সময় নষ্ট করছে। একটার পর একটা চেষ্টা করেই যাচ্ছে। না হলে সে কী করতে পারে। এসব ভাবনার মধ্যেই ইরিন সেখান থেকে উঠে চলে যায়। আজকে আর পেছন পেছন গিয়ে আটকাতে ইচ্ছা করছে না।
একই জায়গায় বসে থাকে রাফি। তার বড় মাথায় সমাজব্যবস্থার রহস্য ঢোকে না। মেজাজ খারাপ হয়। ছেলে বলেই চাকরির দায়িত্ব তার ঘাড়ে চাপবে কেন? ইরিনও তো একই সঙ্গে ভার্সিটি থেকে বের হয়েছে। সে কেন দায়িত্ব নিচ্ছে না? বড় অদ্ভুত ও রহস্যময় লাগে মানবজীবন। এসব সে আর ভাবতে চায় না। পকেট থেকে সিগারেট বের করে। অভিমান, বিষণ্নতার ধোঁয়ায় ওড়ে জীবনের দীর্ঘশ্বাস।
চাকরি তার জীবনে এভাবে প্রভাব ফেলবে, বুঝতে পারেনি কখনো। কয়েক দিন আগেও তার জন্য যে পাগল ছিল, সে পর্যন্ত কল ধরছে না। বদলে গেছে। অথচ এই মেয়েকে নিয়ে সে এমন কিছু কল্পনাও করেনি। বেকারদের জীবনের যে এক নির্মম শূন্যতা, সেটা রাফি এখন পুরোপুরি টের পাচ্ছে। এই শূন্যতার ঠিক কোনো নাম দিতে পারছে না। তার কথা শোনার সত্যিই কি কেউ আছে?
এত কিছুর পরেও ঘুরেফিরে রাফির চোখের সামনে ভাসে পুরোনো দিনের কথা। কত সুন্দর স্মৃতি তাদের। সুমধুর হাসি। কত স্মৃতিচিহ্ন পড়ে আছে শহরের আনাচকানাচে। চাইলেই জীবন থেকে মানুষ চলে যেতে পারে। কিন্তু স্মৃতিরা? স্মৃতিদের থেকে পালিয়ে বাঁচা যায় না। রাফিও বাঁচতে পারেনি। স্মৃতিরা তার কাছে ফিরে আসে নানাভাবে, নানা বাহানায়। চায়ের কাপে শতসহস্র স্মৃতি থেকেও সেই মুগ্ধ চাহনির দৃশ্যপট অকপটে ভেসে ওঠে মনের আয়নায়। ফেলে আসা দিনগুলো কোনোভাবেই আড়াল করতে পারে না।
মেয়েটা অদ্ভুত সুন্দর করে বলত, ‘জীবন নিয়ে কিসের এত চিন্তা! এক জীবন তো ভালোবেসেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।’
রাফি নিজেকে আবার গুটিয়ে ফেলে। ব্যাপারটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়। একটা চাকরির জন্যই তো এত কিছু! প্রেম না পেলেও চাকরি পেতেই হবে। রাত–দিন এক করে পড়াশোনায় মনোযোগী হয় সে। একটার পর একটা চাকরির পরীক্ষা দিতে থাকে। একটা পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে এক পিচ্চি বকুলের মালা নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। খাবারের কথা বলে ফুলের মালাটা তার সামনে ধরে টাকা চায়। সেই হাতকে ফেরাতে পারেনি। টাকা দিয়ে মালাটা নেয়। বাসায় এনে টেবিলের এক কোনায় ফেলে রাখে। ফুলটা ইরিনের পছন্দের।
দিনের পর দিন চলে যায়। সেদিন বাইরে থেকে এসে মোবাইলটা টেবিলের ওপর রাখে। হঠাৎ ফুলের মালার দিকে চোখ যায়। এই কয় দিনে মালাটা শুকিয়ে গেছে। নাকের কাছে নিয়ে দেখে ঘ্রাণ তখনো আছে। যেন তরতাজা সুবাস। ইরিনের কথা আবার মনে পড়ে। টেবিলে মোবাইলের পাশেই মালাটা রেখে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাসার নিচে একটা হুডতোলা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। রুমের ভেতর মোবাইলটা বেজে ওঠে। সে ব্যালকনিতেই দাঁড়িয়ে থাকে। কল ধরতে ইচ্ছা করছে না। বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগছে। একটার পর একটা কল আসতেই থাকে। শেষে বিরক্ত হয়ে মোবাইলের কাছে যায়। একটা অচেনা নম্বর:
হ্যালো।
বাসায় আছ?
তুমি? এবার কী চাও?
তোমাকে। রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি নিচে। নেমে আসো।
মনের মধ্যে তখন অনেক কিছুই চলতে থাকে। আনমনে সিঁড়ি ভেঙে ছয়তলা থেকে নিচে নামতে থাকে। ইরিন ছাতা এগিয়ে দেয়। তাদের নিয়ে রিকশা চলতে শুরু করে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। অনেক কথার ফাঁকে একটা কথা যেন বৃষ্টিতে মিশে যেতে থাকে, ‘আমি একটা চাকরি পেয়েছি। তুমি তোমার মতো চেষ্টা করে যাও। না পেলেও সমস্যা নেই। আমারটা দিয়েই চলে যাবে দুজনের।’