বারান্দাটা বেশ বড়, ১১ তলা বাসা। আশপাশে সব বাসাই ৫ তলা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে নিজেকে কেমন নিঃসঙ্গ লাগে। অনেক দেখেশুনেই বাসাটা ভাড়া নিয়েছি। পুরো পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার হাস্যকর চেষ্টা। নেটওয়ার্কের বাইরে যেতে পারলে আরও ভালো হতো। মাঝেমধ্যে মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছা করে। অনেক টাকা হলে হয়তো একদিন কোনো দ্বীপে চলে যাব। সঙ্গে থাকবে এক ট্রাক বই। দু–চারটা কুকুর-বিড়াল-পাখি সঙ্গী হিসেবে নিলে খারাপ হয় না। এখন এটা করা সম্ভব নয়।
১০-৫টার চাকরিতে মাস না ঠেকলে পকেটে টাকা আসার অন্য কোনো সুযোগ নেই। অগত্যা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে এই ফ্ল্যাটটাই শেষ ভরসা। নিঃসঙ্গতা উপভোগ করার জন্য যা যা প্রয়োজন জোগাড় করে ফেলেছি। শুধু বাদ সেধেছে ইরা! মেয়েটা কোথা থেকে আমার খোঁজ জোগাড় করে চলে এসেছে। বলে আমার সঙ্গে থাকবে। কোনো মানে হয়?
বারান্দাটায় গ্রিলের তেমন বালাই নেই। থাই খুলে দিলে যেকোনো সময় নিচে ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে। ইরার জন্যই ভয়ে জানালায় তালা মেরে রাখি। মাথা খারাপ মেয়েদের সঙ্গে থাকার যন্ত্রণা আলাদা।
একটা সিঙ্গেল গ্যাসের চুলা কিনে বারান্দায় রেখেছি। এটায় শুধু শখের বসে চা বানানো হয়। রাতের বেলা রান্নাঘরে যেতে ইচ্ছা করে না। এখানেই চা বানিয়ে জানালা খুলে বারান্দায় বসে থাকি। একটা সাউন্ড বক্স রেখেছি। অঞ্জন দত্ত করুণ গলায় গেয়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে ভেসে আসে পিয়ানোর করুণ সুর। এমন জীবন-ই তো চেয়েছিলাম।
এখন ঘড়িতে রাত ৩টা। বারান্দায় বেশ হাওয়া দিচ্ছে। একটু ঠান্ডাও পড়েছে। বারান্দার জানালা খুলে দাঁড়িয়ে আছি। আকাশভরা তারা যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে। চুলায় চা তুলে দিয়ে পা তুলে সোফায় বসলাম। বারান্দার নীল আলো ঘরের ভেতর যাচ্ছে না। তবু ইরাকে দেখতে পাচ্ছি। এলোমেলো নিঃসঙ্গ একটা মেয়ে। প্রায় রাতেই ইরা ঘুমের মধ্যে কাঁদে। আমার বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। আমি জীবনকে উপভোগ করতে পারি, ইরা পারে না। যেন একটা ছোট্ট শিশু পৃথিবীতে এসে দিশেহারা হয়ে পড়েছে, মাকে ছাড়া কোথায় যাবে!
ইরার গায়ে কাঁথা টেনে দেওয়া দরকার। ইচ্ছা করছে না। থাক আপাতত। ওকে শক্ত করে কিছু কথা বলা দরকার। মনে হচ্ছে এখনই ঘুম থেকে তুলে বলি—
শোনো যথেষ্ট হয়েছে। এবার মানে মানে কেটে পড়ো।
কেটে পড়ো মানে কী?
মানে বিদায় হও।
এত রাতে কোথায় যাব? আমার যাওয়ার জায়গা আছে নাকি?
ঠিক। ইরার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। অথচ একসময় ও নিজেই একটা মানুষের ঘর ছিল। মানুষ ঘর ফেলে চলে গেলে সব নোংরা করে রেখে যায়। কিন্তু ইরার মানুষ সব ভেঙে চুড়ে নিয়ে গেছে।
বিজ্ঞানকে আরও উন্নত হতে হবে, শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনের রোগ নিরাময়েরও ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভবত একদিন এটাও আবিষ্কার হবে, ততদিনে হয়তো আমি থাকব না। ইরার দুঃখের সমাধানও আমার দেখা হবে না।
‘সংশপ্তক’ বই নিয়ে বসে আছি। বেশ ক’দিন হলো লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছি। বই জমা দেওয়ার সময় এসে যাচ্ছে, অথচ কাজের চাপে বই পড়াই হচ্ছে না।
আমার জন্য চা বসাসনি?
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ইরা চোখ বুজে দরজায় হেলান দিয়ে আছে। অন্যমনস্ক হয়ে ছিলাম বলেই হয়তো চমকে উঠেছি।
আয়, এখানে বস।
চা দে। চা খেয়ে ঘুমাব।
মরার মতোই তো ঘুমাচ্ছিলি। উঠলি কীভাবে?
একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল।
চা খেলে আর ঘুম হবে?
হবে। কী স্বপ্ন জানতে চাইবি না?
জানতে চাচ্ছি না। মানুষের স্বপ্ন নিয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই।
আমি তো আর মানুষ না, আমার স্বপ্ন শুনতে সমস্যা কই?
রাতের বেলা কানের কাছে প্যান প্যান করিস না ইরা।
দিনের বেলা তো তুই অফিসে থাকিস। রাত ছাড়া উপায় কী!
আজ থেকে নো প্যান প্যান। খাতায় লিখে রাখবি আমি এসে পড়ে রিটার্ন উত্তর লিখে রাখব।
এটা আবার কেমন নিয়ম! কথা বললে সমস্যা কোথায়?
তুই কথা বললে ঘণ্টার আগে থামিস না। আমার মাথা ধরে যায়। সারা দিন অফিসে থেকে বাসাতেও শান্তি পাব না নাকি!
আমি তাহলে কোথায় শান্তি পাব?
তোর শান্তির খোঁজ আমি কি জানি! আমার শান্তির খোঁজ তুই জানিস?
জানি। আমি যখন তোর কাছে থাকি, তখন তুই সবচেয়ে শান্তিতে থাকিস।
কথাটা বলেই ইরা চট করে উঠে গেল।
চায়ের চমৎকার গন্ধ বের হয়েছে। যেহেতু শুধু আমার জন্যই চা তুলে দিয়েছি, ইরা পুরো চা একাই খেয়ে নেবে। স্বার্থপরতায় এই মেয়ের জুড়ি মেলা ভার। আমি বইয়ে মন দিলাম। বইটা আগামী চার দিনের মধ্যে শেষ করতেই হবে।
নে একটা চুমুক দে।
ইরা চায়ের কাপ বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বই থেকে মুখ তুলছি না। ও পুরো কাপ একা খেয়ে ফেললেই সম্ভবত আমার জন্য সুবিধা হতো। ওকে বকাঝকা করা যেত। সত্য চোখের সামনেই থাকে, অথচ প্রায়ই আমরা মানতে চাই না। আমি জানি, একটু ভালোবাসা পেলেই ও কেমন চাদনি পসর রাইতের মতো গায়ে গলে গলে পড়ে। তারপরেও মেয়েটাকে দুঃখ দিই। ভালোবাসলেই যে দুঃখ পায়, তাকে ভালোবেসে দুঃখ বাড়াব কেন?
নতুন বাজার, গাইবান্ধা