আমার আম্মু এবং সমাবর্তন

মায়ের সঙ্গে লেখকছবি: লেখকের সৌজন্যে

ফেনী ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি। ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সমাবর্তন। রেজিস্ট্রেশন করলাম আম্মুসহ। তার পর থেকে উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা একসঙ্গে কাজ করছিল।

২০ তারিখ সকালে হালকা বৃষ্টি। কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছি। ঘুম ভাঙল আম্মুর চিৎকার শুনে। দৌড়ে বাইরে গেলাম, আম্মু পড়ে আছেন ঘরের সামনে। হালকা বৃষ্টিতে পানি জমেছিল, বেখেয়ালে পানিতে পা পড়তেই পিছলে পড়ে যান। আপুসহ ধরাধরি করে কোনোরকমে ঘরে নিয়ে গেলাম। ব্যথায় আম্মুর আর্তনাদ দেখে অস্থির লাগছিল খুব। হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। এক্স-রে রিপোর্টে বুঝলাম, বাঁ হাতের কবজি নড়ে গেছে এবং হাড় সামান্য ফেটে গেছে। ৪৫ দিনের জন্য প্লাস্টার করে দিলেন ডাক্তার।

বাড়ি নিয়ে এলাম। যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। খাওয়াদাওয়ার পর আম্মুকে ওষুধ দিলাম। আর আম্মুকে আস্তে করে বললাম, ‘আম্মু, আমার ভার্সিটির অনুষ্ঠানে কিন্তু যেতেই হবে’, বলে একটু হেসে দিলাম। তিনি বললেন, ‘কী বলিস, এই অবস্থায় কীভাবে যাব!’ বললাম, ‘ধরে নিয়ে যাব, সমস্যা নেই।’ আপুও সায় দিল।

অনুষ্ঠানের দিন সকালে পরিচিত এক অটো ড্রাইভারকে কল দিলাম। এরপর দুজনে তৈরি হয়ে চলে গেলাম ভার্সিটিতে। সুবিধাজনক চেয়ারে আম্মুকে বসালাম। পরিচিত আয়া-খালাদের বলে দিলাম, আম্মুর যেন একটু খেয়াল রাখেন। স্বেচ্ছাসেবী জুনিয়রদেরও বলে দিলাম। আম্মুকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, পানি খাওয়ানো থেকে শুরু করে সবটাই ওনারা খুব যত্ন নিয়ে করলেন। শিক্ষকেরাও আম্মুর সঙ্গে এসে কথা বললেন। দেখে খুব ভালো লাগছিল।

সমাবর্তনের প্রধান অতিথি ছিলেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ও তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। তিনি পদকপ্রাপ্তদের হাতে পদক তুলে দেন। আমি কোনো পদক পাইনি। পেলে সেটা আম্মুর গলায় পরিয়ে দিতে পারতাম। তবে সেটা না পারলেও মাথার চারকোনা টুপিটা আম্মুকে পরিয়ে দিলাম। জানি না, আম্মুর তখন কেমন লাগছিল; তবে ওই মুহূর্তে আমি ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ এবং গর্বিত সন্তান।

এদিন বাবা-মা দুজনকে একসঙ্গে পেলে আরও ভালো লাগত। সেটা সম্ভব হয়নি। ২০২০ সালে আব্বুকে হারাই। আম্মুকে এই দিন দেখাতে পেরেছি, এটাও কম আনন্দের নয়। এ অর্জন যে পুরোটাই আম্মুর। ওনার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি।