সারা দিন অতলান্ত অবসর। পড়ালেখা, গল্পের বই, উপন্যাস সময় আর কাটছে না। বাবা, পরিচিত কাঠমিস্ত্রি দিয়ে একটি ক্যারম বোর্ড তৈরি করে আনলেন। খারাপ সময়টা হইহুল্লোড় ও খেলাধুলার মধ্য দিয়ে কাটতে লাগল আমাদের। একদিন বিকেলের নাশতা শেষ করে ক্যারম খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কলবেল বেজে উঠল। সিসিটিভিতে দেখলাম, চারতলার কাকিমা এসেছেন। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দরজা খুললাম আমি। কাকিমার চোখে জল, কাকিমা চাপাস্বরে কাঁদছেন। বললাম—
কী হয়েছে কাকিমা, কাঁদবেন না! কী হয়েছে বলেন?
তোমার কাকুর কয়েকদিন ধরে খুব জ্বর। করোনা টেস্ট করিয়েছিলাম, রিপোর্ট এখনো আসেনি। কিন্তু ও মোটেও ভালো নেই। আজ শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কী করব, কোথায় যাব—কিছুই তো মাথায় আসছে না! এর মধ্যে সিমুর শরীরটাও ভালো না, জ্বর এসেছে।

সীমন্তিনী সিমু নামটা শুনতেই বুকের ভেতরটা এক নদী জলে ভরে উঠল। এই মেয়েটির জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটা হাসিমুখে ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। বরণ না করে সৌভাগ্যকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিদানে আমাকে সমুদ্রসম অপমান ও প্রত্যাখ্যান দিয়েছিল সিমু। আমার কি আজ শোধ নেওয়া উচিত, কাকিমাকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত? জটিল হিসাব–নিকাশের মতো স্থির চিত্তে ভাবছি আমি। বাবা, পেছন থেকে চিৎকার করে উঠলেন, ‘খোকা, দাঁড়িয়ে আছিস যে, দ্রুত যা। কাকুর অক্সিজেন লেভেল কত দেখ, সেই হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
পৃথিবীতে বাবাই একমাত্র মানুষ, যে একই সঙ্গে আমার বন্ধু ও অভিভাবক। বাবা, আমার কাছে আকাশের মতো বিশাল, নদীর মতো স্নিগ্ধ। ছোট থেকে আজ পর্যন্ত কোনোদিন বাবাকে স্বার্থপর চিন্তা করতে দেখিনি। আমার কোনো বন্ধু ছিল না কখনো, আজও নেই। বাবা একমাত্র বন্ধু, অহংকার। আমার জীবনে এমন একটিও ঘটনা নেই যা বাবাকে বলিনি। তিনি আমাকে সীমাহীন স্বাধীনতা দিয়েছেন। কখনো কোনো কিছুর জন্য জোর করেননি, চাপিয়ে দেননি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর সিমুর কাছাকাছি থাকতে পারব, এ আশা নিয়ে বাবাকে যখন বললাম, ‘বাবা, ইন্টারমিডিয়েট সিটি কলেজে পড়বে সিমু। আমি খুলনাতেই থাকি, মেডিকেল পড়ব না।’ বিনা বাক্যে সেদিন আমার আবদার মেনে নেন বাবা। বলেছিলেন, ‘গোলাপ যেখানেই থাকুক সৌরভ ছড়াবে। সৌরভ ছড়ানোর জন্যই তার জন্ম। যোগ্য লোক ও গোলাপ তাই সমার্থক। এই একটি মাত্র কারণেই পৃথিবীতে যোগ্য লোকের এত কদর। মন যা চায়, তাই করো। নিজেকে যোগ্য করে তোলো। আমি মাকে সামলে নেব।’
পরিচিত চিকিৎসকবৃন্দের সহযোগিতায় অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই কাকুর চিকিৎসার ব্যবস্থা হলো। অক্সিজেন লেভেল ও শ্বাসপ্রশ্বাসের হার স্বাভাবিক হলে নিশ্চিন্ত হলাম আমরা। কিন্তু বিপত্তি বাধল সিমুকে নিয়ে, ওর শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। কষ্ট পেতে দেখে সব অভিমান কোথায় যেন হারিয়ে গেল। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ওর কাছে গিয়ে গভীর আর্তনাদে ভেঙে পড়লাম।

দিন পনেরো পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো। আমরা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এলাম। মা-বাবা ও বোন জড়িয়ে ধরল আমাকে। পরিবার মন্দিরসম শুনেছিলাম, ঐদিনই প্রথম অনুভব করলাম। এক অসীম ভালোলাগায় পুরো শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। আমার ভাবনার আকাশে উঁকি দিল কিছু পুরোনো প্রশ্ন। জীবন কি বিচিত্রকর, মন কি ভয়ানক রকমের প্রতারক। মুহূর্তে বদলে নেয় সিদ্ধান্ত। মায়ের ড্রয়ার খোলার শব্দে স্বাভাবিক হলাম। ওয়ার্ডরোবে কাপড় গুছিয়ে রেখে মা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন— ‘খোকা, একটা কথা বললে রাখবি? আমার কথা তো কোনোদিন শুনলি না। যদি বলিস রাখবি, তাহলেই শুধু বলব। এমনি এমনি বলব না।’
এভাবে কেন বলছ, মা! বল, কী বলবে।
সিমুর মা এসেছিলেন। সিমুর বাবা এ বছর রিটায়ারমেন্টে যাচ্ছেন। তার আগেই সিমুর বিয়েটা সেরে ফেলতে চান। তোকে খুব পছন্দ ওদের। আর আমারও সিমুকে তোর জন্য খুব পছন্দ। তোর বাবাকে এখনো কিছু জানাইনি। তুই কথা দিলে বলব।
তোমার বেকার ছেলেকে মেডিকেল পড়ুয়া মেয়ের জন্য তাঁদের কেন পছন্দ মা? বিপদের দিনে নিজেদের কথা না ভেবে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম বলে।
বাপের মতো যুক্তিতর্ক দিস নে খোকা। ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বল।
‘না’ বললে তুমি কি খুব কষ্ট পাবে মা?
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা তো পূরণ করলি না। ভর্তি হয়েও বাপ-বেটা যুক্তি করে ভর্তি বাতিল করে এলি। জীবনে কি পেলাম বল! সারাটা জীবন দাসীর মতো কেবল তোদের জন্যে খেটেই গেলাম। তোরা আমার কথা কেউ ভাবলি না। এক ফোঁটাও গুরুত্ব দিলি না কেউ আমারে।
এ জন্য বুঝি ডাক্তার বউমা চাও!
কথা পেঁচাস না খোকা। তোর পছন্দের কেউ থাকলে বল। আমি জোর করব না। আর না থাকলে সিমুকেই বিয়ে করতে হবে।

নির্নিমেষ চোখে মায়ের দিকে চেয়ে রইলাম। কিছু বললাম না।
তোর জন্য সিমুকে আমার ভীষণ পছন্দ। তুই আমার কথাটা রাখ খোকা। সিমুকে বিয়ে করায় মত দে। তোর বাবার সঙ্গে কথা বলে ওদেরকে জানিয়ে দিই আমি।
‘তুমি যা চাও, তাই হবে মা।’ বললাম আমি।
মাথায় হাত রেখে বল। নইলে বাপ-ছেলেতে যুক্তি করে শেষে সব ভেস্তে দিবি। ওদের কাছে আমি আর মুখ দেখাতে পারব না। তোদের মোটেও বিশ্বাস করি না আমি।
বিয়ে প্রসঙ্গে বাবার সঙ্গে খুব সংক্ষিপ্ত একটি আলোচনা হলো আমার। বাবা সিমুকে বিয়ে করতে নিষেধ করলেন আমাকে। বললেন, ‘একপক্ষীয় কোনো কিছুই বেশি দিন টেকে না খোকা। তোর এতবড় ক্ষতি কি করে মেনে নিই বল! আমি খবর নিয়েছি, সিমুর একটা ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। ছেলেটা ওর ব্যাচমেট, ওরা একসঙ্গে মেডিকেল কলেজে পড়ে। তোর মাকে বললে কোনোমতেই বিশ্বাস করবে না। ছোট থেকেই সিমুকে চেনে, সিমুর প্রতি ওর দারুণ বিশ্বাস। ভাববে, পরিচিতর মধ্যে বিয়ে দিতে চাই না বলে আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি। তুই সীমন্তিনীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধিস না খোকা। আমার কথা শোন…’
যে মানুষটা পৃথিবীর আলো দেখাল আমাকে, মুখে ভাত তুলে দিল। সেই মমতাময়ী মায়ের জন্য কিছুটা কষ্ট সয়ে নিতে পারব। এই চিন্তা থেকেই বাবাকে উত্তরে কিছু বললাম না। শুকনো মুখে আমার পাশ থেকে উঠে গেলেন বাবা। আমাকে ভুল বুঝলেন। ভাবলেন, গোপন ভালোবাসার কাছে আমি পরাজিত। তাঁর দেওয়া শিক্ষা, দর্শন মিথ্যে আমার জীবনে। আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ তাঁর। আমি মানুষ হতে পারিনি।

সিমুর সঙ্গে যা কথা হওয়ার তা হলো বিয়ের পর। বাবার সোর্স মিথ্যে খবর দেয়নি বাবাকে। তমল নামের একটি ছেলেকে সিমু ভালোবাসে। বিয়ের আগে কাকু-কাকিমাকে তমলের কথা জানিয়েছিল সিমু। কিন্তু তমলের পরিবার রক্ষণশীল। ভালোবাসা-প্রেমে দারুণ অ্যালার্জি বয়োজ্যেষ্ঠদের। তা ছাড়া সিমুর সঙ্গে তমলের গোত্রের ব্যবধানও অনেকটা। তমলের পরিবার কোনোমতেই সিমুকে মেনে নেবে না। সিমুর কিছু করার ছিল না। অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়।
এসব কথা কাউকে বলিনি, কেউ জানে না। আজও আমার প্রতি বাবার গভীর অসন্তোষ। বাবার অভিমান কমেনি। মাকেও এসবের কিছুই বুঝতে দিইনি আমি। মা সিমু অন্তঃপ্রাণ। জানতে পারলে খুবই কষ্ট পাবেন। সিমুও আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। আমার বই, চেয়ার-টেবিল যত্ন করে গুছিয়ে রাখে। তমলের প্রতি এখনো ওর ভীষণ অভিমান। চোরের মতো সিমুর ডায়েরি পড়ে জেনেছি। এক পাতায় আমার সম্পর্কেও দুই কলম লিখেছে সিমু। ‘শুভ, মানুষটা খারাপ না। আমি ওকে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুতেই পারছি না। ওর কথা চিন্তা করতে গেলেই তমলের কথা মনে পড়ে। ঈশ্বর আমাকে শক্তি দাও।’ সিমুর প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। সিমুকে আগের মতোই ভালোবাসি। আসলে ভালোবাসা যাকে খায়, এভাবেই খায়। নিয়তির কাছে জমা আছে জীবনের সব জয় পরাজয়।

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন