হে নৈঃশব্দ্য
প্রথমবারের মতো অনলাইনে চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। এতে অসংখ্য চিঠি এসে জমা হয়। প্রতিযোগিতায় সমন্বয়ক ছিলেন ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর হাসান। বিচারকদের যাচাই বাছাইয়ের পর সেরা চিঠিগুলো প্রকাশ করা হলো।
হে নৈঃশব্দ্য,
‘যে কথা বলা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি সত্য সেই কথা, যা সারা জীবন বলা হয় না।’
এই পত্র তোমার জন্য নয়; আমার দীর্ঘ নীরবতার সাক্ষ্য হিসেবে রেখে যাওয়া। কারণ, কিছু অনুভূতি মানুষের কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল সময়ের কাছে। সময়ই তাদের একমাত্র বিশ্বস্ত পাঠক।
অনেক দিন হলো বুঝেছি, পৃথিবীতে সব মানুষ আমাদের জীবনে আসে না থাকার জন্য। কেউ কেউ আসে, যেন অস্তগামী সূর্যের শেষ আলোর মতো—অল্পক্ষণ থাকে, অথচ চলে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় আকাশে তার আভা লেগে থাকে। তুমি আমার জীবনে তেমনই এক অস্তরাগ, যার অনুপস্থিতিও একধরনের উপস্থিতি। তোমাকে নিয়ে আমার কোনো দাবি ছিল না, নেইও। অধিকার যতটা মানুষকে কাছে আনে, তার চেয়ে বেশি দূরে সরিয়ে দেয়। আমি তোমাকে চাইনি; চেয়েছি তুমি থাকো—যেমন নদীর পাশে আকাশ থাকে; ছুঁতে পারে না, তবু প্রতিটি ঢেউ তারই প্রতিবিম্ব বহন করে।
জানো, মানুষের ভেতরে একটি বন থাকে। বাইরে থেকে যার কোনো শব্দ শোনা যায় না। সেই বনে বহু বছর ধরে ঝরে পড়ছে পাতা, ভেঙে পড়ছে বৃক্ষ, শুকিয়ে যাচ্ছে নদী। কিছু ধ্বংস কখনো দর্শকের সামনে ঘটে না; তারা ঘটে আত্মার অন্তঃপুরে, যেখানে কান্নারও কোনো প্রতিধ্বনি থাকে না।
আমি বহুবার ভেবেছি, তোমাকে লিখব—‘থেকো’। তারপর কলম থেমে গেছে। যে মানুষকে ধরে রাখার জন্য শব্দের আশ্রয় লাগে, তাকে ধরে রাখা যায় না। আর যে মানুষ থেকে যায়, সে কোনো বাক্যের ভরসায় থাকে না। আজ বুঝি, অপ্রাপ্তিই মানুষের সবচেয়ে দীর্ঘ আশ্রয়। যে ফুল হাতে আসে, সে একদিন শুকিয়ে যায়; যে ফুল স্পর্শের আগেই ঝরে পড়ে, সে আজীবন সুবাস হয়ে থাকে। তুমি আমার জীবনের সেই অদেখা ফুল—যার জন্য কোনো শোক নেই, অথচ যার অভাব প্রতিটি ঋতুতে নতুন করে জন্ম নেয়। যদি কোনো দিন হেমন্তের বিকেলে ঝরাপাতার ওপর হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হয়, কোনো এক নামহীন বিষণ্নতা তোমার কাঁধে হাত রেখেছে, তবে ফিরে তাকিয়ো না। মানুষের স্মৃতি কখনো পেছন থেকে ডাকে না; সে ডাকে হৃদয়ের গভীরতম প্রকোষ্ঠ থেকে।
আমি চাই না তুমি আমাকে মনে রাখো। শুধু এটুকু থাক—পৃথিবীর ভিড়ে একজন মানুষ ছিল, যে তোমার প্রাপ্তিকে নয়, বরং অস্তিত্বকেই নীরব আশীর্বাদ বলে বিশ্বাস করেছিল। শেষে আর কিছু লিখছি না। প্রতিটি গভীর অনুভূতিরই একসময় ভাষার মৃত্যু ঘটে। তারপর যা বেঁচে থাকে, তা আর বাক্য নয়, প্রার্থনা।
ইতি,
এক অনুলিখিত ঋতু
রাজারহাট, কুড়িগ্রাম