বর্ষা এসেছে এ বছর একটু আগেই। চারপাশে থই থই পানি। মাঠঘাট, পথঘাট—সব জলমগ্ন। গাছের পাতায় ঝরে পড়ে টুপটাপ জল, আর টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে, শোনা যায় রিনরিন শব্দ।
নতুন বউ ঝুমা, এ বাড়িতে এসেছে মাত্র মাস চারেক হলো। এখনো সবকিছুর সঙ্গে পুরোপুরি মিশে উঠতে পারেনি। বুকের ভেতর কেমন একটা টান লেগে থাকে শৈশব ও বেড়ে ওঠার প্রিয় জন্মভূমির দিকে। সেই কবে বিয়ের পর গিয়েছিল মাত্র দুই দিনের জন্য। এরপর আর যাওয়া হয়নি বাবার বাড়ি। মা বারবার বলেছে, ‘আষাঢ় এলে পাঠাব তোমার ভাইকে, নিয়ে যাবে তোমায়।’
বর্ষার আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে আছে, বাতাসে ভেসে আসছে দূরের বাঁশি—মাঝিরা হয়তো গান ধরেছে। ঝুমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, দিগন্তে চোখ মেলে। চোখে–মুখে ভাবনা—হয়তো তার ভাই আসছে নৌকা নিয়ে তাকে নাইয়র নিতে। এভাবে অপেক্ষা করতে করতে কেটে যায় দিন, সপ্তাহ, মাস।
হঠাৎ একদিন দূরে দেখা যায় একটা লম্বা নৌকা, সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন—ছোট ভাই রাজিব। গায়ে নীল চেক লুঙ্গি, মাথায় গামছা। হাতে একটি প্লাস্টিকের ঝুড়ি। ঝুড়িভর্তি ধানের খই, চিড়া, মিঠাই ও হাতে বানানো ঘি। নৌকা থামল বাড়ির ঘাটে। রাজিব এসে বলে, ‘বুবু, নেমে এসো, মা অনেক অপেক্ষা করছে।’
চারপাশে পানিভরা গ্রামে সাধারণত কেউ ঘর থেকে বের হয় না। কিন্তু রাজিব এসেছে নদীপথে, মাঝির সাহায্য না নিয়ে নিজেই দাঁড় টেনে। তার বোনের নাইয়রের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ভাইয়ের এই যাত্রা যেন শুধু ভাই–বোনের সম্পর্ক নয়, বর্ষার জলজ শৈল্পিকতার এক মোহনীয় দৃশ্য।
ঝুমা তড়িঘড়ি করে বর শামীম ও শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিল। ননদ শর্মিলাকেও সঙ্গে নিয়ে চোখ মুছে ধীরে ধীরে সাঁকো বেয়ে নৌকায় ওঠে। পেছন থেকে শাশুড়ি বলে ওঠেন, ‘সামনের বুধবার ছেলে যাবে, বৃহস্পতিবার চলে এসো।’
নৌকা ভাসে, পেছনে পড়ে থাকে ভেজা উঠান, আর সামনে এগিয়ে চলে নতুন বউ, পুরোনো মায়ায়। এটা শুধু নাইয়র নয়, এটা এক ঋতুর কোলে স্মৃতির ভাসমান গান।
উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা