অয়নের দিনলিপি

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
বৃষ্টি নেমেছে। বাবা অন্যমনস্ক। ‘বৃষ্টির মধ্যে এত বড় মাছ এনে কি ভুল করলাম! কাল সমিতির কিস্তি দিতে হবে। মাছটা যেন বিক্রি হয়ে যায়।’ ভেবে মনে মনে প্রার্থনা করলেন।

তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে পৌর ভবনের পেছনের পুকুরটা প্রায় ভেসে গেছে। পাশের জলাবদ্ধ মাঠে ছোট-বড় মাছ উঠে যাচ্ছে। অয়ন পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়েছিল। কিন্তু বেশি সময় থাকতে পারেনি। মা কান ধরে বাড়ি নিয়ে এসে পড়তে বসিয়েছেন। কাল অঙ্ক পরীক্ষা। অয়ন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। বাবার মাছের ব্যবসা। বাবা রাগী নন। মা খুব রাগী। অয়ন লেখাপড়ায় ভালো। পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়। মাঝেমধ্যে চিন্তা করে কূল-কিনারা পান না মা। এত অল্প পড়ালেখা করেও অয়ন কীভাবে ফার্স্ট হয়ে যায়! সেবার সিক্স থেকে যখন সেভেনে উঠল। মা স্কুলে গিয়ে হেড স্যারকে বলেছিলেন, ‘অয়ন তো বাড়িতে বেশি পড়ালেখা করে না। ও কীভাবে ফার্স্ট হতে পারে! আমার অনুরোধ, আপনি আবার ওর পরীক্ষা নেন।’ স্যার বাধ্য হয়ে ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষা নিয়েছিলেন। অয়ন ১০০-তে ৯২ পেয়েছিল। তবু মা মানতে নারাজ। তাঁর এক কথা, প্রচুর পড়তে হবে।

অন্যদিন হলে মাকে লুকিয়ে আবারও মাছ ধরতে চলে যেত অয়ন। পরে কতক বেলনের বাড়ি যদিও পিঠে পড়ত! কিন্তু আজ হাটবার। মাকে রাগানো যাবে না। হাটবারে বড় বড় মাছ বিক্রি করেন বাবা। মাছ দেখতে অয়নের ভালো লাগে। তা ছাড়া আজ একটা ঘড়ি কিনে দেওয়ারও কথা আছে। না পড়লে মা বাবাকে কিনে দিতে বারণ করবেন।

জোর বৃষ্টি নামতে পারে। টান পায়ে হেঁটে বরফকলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় অয়ন। বেশ ভিড়। আড়তে মাছের ডাক হচ্ছে। ‘চিংড়ি ৭৭০, ৭৮০, ৭৯০’। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই বাবা ডাক দিলেন। সামনে যেতেই বসতে বললেন। অয়ন পাশের ছোট্ট টুলে গিয়ে বসল। সামনে ঝুড়িতে হরেক রকমের মাছ সাজিয়ে রাখা। বড় পাতাড়ি (ভেটকি) মাছটার দিকে চোখ পড়তেই অয়ন প্রার্থনা করতে শুরু করল, ‘পাতাড়ি মাছটা যেন বিক্রি না হয়।’ যে মাছগুলো বিক্রি হয় না, বাবা সেগুলো খাওয়ার জন্য বাড়িতে নিয়ে যান। যদিও কোনো দিনই তেমন কোনো মাছ থাকে না। সবই বিক্রি হয়ে যায়। আগেও অনেকবার খুব করে চেয়েছে সে। কিন্তু প্রতিবারই পছন্দের মাছ বিক্রি হয়ে গেছে। বাবাকে বললে, দাম যতই হোক না কেন, বাড়ি নিয়ে যাবেন। কিন্তু মায়ের নিষেধ আছে, মাছ বাড়ি নেওয়ার জন্য বাবাকে বলা যাবে না। অয়ন কথাটা মেনে চলে। ‘কি রে বাবা, এমন মনমরা দেখাচ্ছে কেন? ঘড়ি কিনব তো আজ।’ বাবা জিজ্ঞেস করলে ‘কিছু না, বাবা’ বলে হাসে অয়ন।

বৃষ্টি নেমেছে। বাবা অন্যমনস্ক। ‘বৃষ্টির মধ্যে এত বড় মাছ এনে কি ভুল করলাম! কাল সমিতির কিস্তি দিতে হবে। মাছটা যেন বিক্রি হয়ে যায়।’ ভেবে মনে মনে প্রার্থনা করলেন।

ছাতা মাথায় মিত্তির জেঠু হেঁটে আসছেন। অয়নের বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠল। জেঠু শহরের ধনাঢ্যদের একজন। বাবার থেকে মাছ কেনেন। মিত্তির বাড়িতে অয়নের যাতায়াত আছে। ও বাড়ির সবাই তাকে পছন্দ করে। মাঝেমধ্যে অয়ন জেঠুর ব্যবসার হিসাব দেখে দেয়।

বাবার মুখে হাসি। ‘মাছটা বিক্রি হয়ে যাবে। মিত্তির বাবু পাতাড়ি মাছ পছন্দ করেন,’ ভাবলেন বাবা। ‘জেঠু মাছটা যেন না কেনেন,’ বলে চোখ বন্ধ করে অয়ন প্রার্থনা শুরু করে। কোনো শব্দ কানে যাচ্ছে না। ‘অয়ন, জেঠু ডাকে’, বাবার কথায় থতমত খেয়ে চোখ খোলে অয়ন। মাছটা জেঠুর হাতে দেখে বুক ভেঙে কান্না আসে। ‘কি রে এদিকে আয়, মাছটা নে। তোর জন্য তো।’ কথাটা জেঠুর মুখে শুনে বিস্মিত হয় অয়ন। বাবাও স্তম্ভিত। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করেন না। মাছটা হাতে নিতেই অয়নের মনে পড়ে, কিছুদিন আগে ব্যবসার হিসাব দেখার সময় জেঠু জেঠিমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘অয়ন প্রায় হিসাব-পত্তর দেখে দিচ্ছে। ওকে কী উপহার দিই বলো দেখি?’ জেঠিমা জবাবে বলেছিলেন, ‘অয়ন তো পাতাড়ি মাছ খুব পছন্দ করে। ওকে বড় দেখে একটা মাছ কিনে দিয়ো।’

কেশবপুর, যশোর