নেভি ব্লু শার্ট

অলংকরণ: তুলি

রাত ৯.৩৯মিনিট। ফার্মগেট মোড়। বাস থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলালাম। ফার্মগেট সিনেমা হল লেখাটা ডিজিটাল লাল লাইটে বড়দের কাছে শোনা ছোটবেলায় ভূতের চোখের মতো লাগছে!

পরীবাগ সাংস্কৃতিক বিকাশ কেন্দ্রে আয়োজিত স্বরচিত কবিতা পাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে সিরাজগঞ্জের অজপাড়াগাঁকে ফেলে এসেছি। আমার কবিতা নাকি জীবনকেন্দ্রিক ছিল। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রকাশক লিলি হকের বলা বাক্যটা মাথায় চট করে জেগে উঠল। হ্যাঁ, বেশিরভাগ লেখাগুলো জীবনকে পুড়িয়ে তা থেকে তৈরি হওয়া আলো ও কালিতে লিখি।

ফুটপাতে ভ্যানে করে গেঞ্জি, শার্ট বিক্রি হচ্ছে। এনার্জি বাল্বের নিচে নেভি ব্লু রঙের শার্টটা ঠোঁট বাড়িয়ে ডাকছিল। এগিয়ে গেলাম। শার্টটা হাতে নিয়ে আমার তুমুল রকমের প্রেমিকের মুখ আবিষ্কার করলাম। সাদামাটা সহজ-সরল, অল্প অর্থ আর স্বল্পশিক্ষিত কালো রঙের পুরুষ প্রতিমা!

মায়ার পাহাড় যেন মুখভর্তি করে আকাশ আঁকছে। তার সঙ্গে খুব মানাবে। দাম করে জিনসের পকেটে হাত দিলাম। একটা নোট! বাড়ি ফিরতে হবে! ফুরিয়ে ফেলব? নাহ থাক! তাকে না হয় ভালোবাসি বলে দেব। একদিন সব হবে..! একদিন সব হবে হবে করে আমাদের এই ছোট্ট ডিঙি নৌকার মতো জীবন নিমিশেই তলিয়ে যাবে হয়তো! দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, পশ্চিম তেজতুরি বাজার, মজিদ মহল মৃধা হল কোন দিকে?

জিজ্ঞেস করাতেই পেছন থেকে অশনিসংকেতের কান, হাত-পা, চোখ ধান বীজের অঙ্কুরের মতো ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে গজিয়ে উঠল। বেখেয়ালে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম, রাস্তা পার হতে হবে। একজন ছিমছিমে গঠনের ফর্সা লোক বলে উঠলেন, যাবেন কোথায়? উত্তর দিলাম, ‘তেজতুরি বাজার, মজিদ মহল ছাত্রী হল।’ উনি সময় নষ্ট না করে বললেন, ‘আমি চিনি।’ আমি বললাম, ‘কোন দিকে?’ ‘এইত.. ওই ওভারব্রিজ পার হয়ে ওদিকটায়। চলুন পৌঁছে দিচ্ছি।’

আমার ভেতরে ভয় বিদ্যুতের মতো খপ করে ধরে ফেলল হৃদ্‌পিণ্ডকে। তবু চোখ–মুখ জ্বলজ্বল করছিল, উনি আস্ত শয়তান হয়েও মানুষের মুখোশ পরেছেন বুঝতে পারায়। উনি বলতে থাকলেন...
‘আমি চাকরি করি ঢাকায়, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আছি। একসময় ইংল্যান্ডে থাকতাম।’
ভাবতে থাকি, আহারে, এত কাঁচা হলে কি করে মানুষকে বরশিতে ভুয়া টোপে আটকাতে গেলে? আমি কথা না বলায় উনি আবার বললেন, ‘আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?’
সরে আসতে গেলে উনি বলে উঠলেন, ‘আরে আমরা কথা বলতে পারি, পরিচিত হতেই পারি!’
আমি তখন মেরুদণ্ড সোজা করে কণ্ঠে ঝাঁজ এনে বললাম, ‘অবশ্যই সন্দেহ করছি। আর আপনাকে চিনি না, কথার দরকার নেই।’
উনি কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন এর মধ্যে। আমি আলোর গতির চেয়েও দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করে আলো এবং বেশি লোকজনের মধ্যে এসে আবার একটা দোকানে জিজ্ঞেস করি।

হাঁটছি দ্রুততায়। হাঁটতে হাঁটতে থমকে যাই... ঝড়ের গতিতে ফিরে যাই লোকটির কাছে। গিয়ে ইচ্ছামতো কলমের ডগা বসিয়ে দিই ওনার চোখমুখে, স্টিলের স্কেল দিয়ে কোপের পর কোপ বসাই। রক্ত ঝরতে থাকে। একপর্যায়ে লাথি মেরে ফেলে দিই। কেউ এগিয়ে আসে না। টেনেহিঁচড়ে ডিভাইডার থেকে রাস্তায় নামিয়ে ফেলি। চলন্ত বাসের নিচে আবার একটা লাথি মেরে ফেলে দিই। বাস পিষে রেখে যায় তাকে। শিউরে উঠে দৌড়াতে থাকি!

সঠিক রাস্তায় এসে গলির ভেতরে প্রবেশ করার আগে কল্পনাগুলো ঝেড়ে ফেলে হাঁটা দিই। আমি যতই রেগে যাই না কেন, হিংস্র হতে পারি না বাস্তবে। কল্পনায় হিংস্র হই কিছু কিছু ক্ষেত্রে। বাস্তবে কৌশলে এড়িয়ে চলা আমার অভ্যেস। আবছায়া আঁধার আর হলুদ অল্প আলোয় গলিটা কেমন ভয়ানক লাগে। দুর্গন্ধ আসে। দু–চারজন লোক একটু পর পর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যজগতের মতো লাগছে। রাতপরিদের শহরের মতো। আমার ভয় করে উঠল। পত্রিকার খবরগুলো হিজিবিজি হয়ে ভাসতে থাকে; অমুক এলাকায় গুম কিশোরী, অমুক এলাকায় খুন, রেপ! পায়ের গতি বাড়াতে থাকি। দু–চারজন লোক একসঙ্গে হাঁটছে। সাহস করে ওনাদের দিকে এগিয়ে গিয়েও আবার ভয় জেগে ওঠে! নিরিবিলি পথ, অচেনা, উনারা তো পুরুষ!

কিছু পথ আগাতেই কসাইখানা চোখে পড়ে। মানুষগুলো কেমন যেন দেখতে অদ্ভুত চেহারার। মসৃণতা নেই, নেই লাবণ্য। দোকানে রাখা মাংসগুলো কেমন যেন আলাদা। হয়ত প্রাণী জবেহ করা হয় বলে এদিকে এত গন্ধ!

সামনে একজন মহিলাকে দেখে খুশি হয়ে তার সঙ্গে হাঁটতে থাকি। জানতে পারলাম উনিও ছাত্রী হোস্টেলে যাবেন। ভয় জাগল মহিলার শুকনা মুখ আর ঘাটতিযুক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে। এ আবার ক্ষতি করবে না তো? একপ্রকার চেতনানাশক নেমেছে শুনেছি। পৃথিবী ঘুরতে থাকে নাকি আমার মাথা বুঝি না। পায়ের দ্রুততা মেশিনের চেয়েও বেশি হলো!

গন্তব্যে পৌঁছে একাকিত্ববোধ শুরু হলো। নতুন জায়গায় এলে এমনিতেই ঘুম হয় না। রাতের খাবার খেতে গিয়ে, ছোট্ট বিছানায় ঘুমাতে গিয়ে অনুভব করলাম, হোস্টেল লাইফ খুব কষ্টের। গ্রামের বাড়িতে টানাটানির সংসারে থাকলেও পিতার হাত হয়েছে ছাতা, মায়ের আঁচল আমার জন্য বেহেস্তি রুমাল, ভাইয়ের আদর, বোনের শাসন, ঘুমাবার জায়গা—সবকিছু একেবারে আরামে ভরপুর। আমার উচ্চতার চেয়ে বিছানাকে ছোট মনে হতে লাগল। ঘুমাতে নিয়েও ছাত্রীদের লাইট জ্বালিয়ে পড়ার জন্য চোখ বন্ধ হচ্ছে না। পাশ ফিরতে গিয়ে মনে হচ্ছিল বিছানা থেকে পড়ে যাব। একবার পড়ে যেতেও নিয়েছিলাম। হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু জড়িয়ে বিড়ালের মতো না ঘুমাতে পারলে আমার ঘুম হয় না। যার বিছানায় আজ ঘুমানোর চেষ্টা করছি, সে আর আমি একসময় ইন্টারমিডিয়েটে এক কলেজে পড়তাম! জুনিয়র, নাম আকসারিন স্বর্ণ। ‘ল’ নিয়ে পড়ছে আর ঢাকা হাইকোর্টে অনুশীলন করে। বিছানার পাশেই মাথার কাছে রুটিন টানানো। কটায় খাবে, কোন সময়ে কোন বই পড়বে, কখন গোসল, কাজ ইত্যাদি। ভাবতে থাকি। কত অগোছালো আমার জীবন। কোনো টাইম বাঁধা বা স্বপ্নের স্কেচ আঁকানো ছিল না, নেইও! অথচ ওরা ঠিকই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশের সিটেই জান্নাতুল ফেরদাউস নামের মিষ্টি শান্ত মেয়েটি পড়ছে, ইডেনে আছে থার্ড ইয়ারে। মাথা তুলে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপু আসবার সময় যে গলিটা দিয়ে এলাম, সেটা অত ভয়ানক কেন!’
মেয়েটি চমকে উঠল! ‘আপনি ওই গলি দিয়ে আসছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আল্লাহ!.’
‘কেন?’
‘এপাশ দিয়েও রাস্তা ছিল।’
‘আমিতো চিনি না।’
‘যাক ভালোভাবে এসেছেন এটাই ভালো। অনেক গন্ধ না?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু কেন?’
‘ওখানে অদ্ভুত শ্রেণীর সব মানুষ থাকে। ভালো লোকজন থাকে না আপু!’

আমি যুদ্ধাহত সৈনিকের মতো মাথা নামিয়ে চোখের ওপরে ওড়নাটা বেঁধে নিই লাইটের আলো থেকে বাঁচার জন্য। আলোতে ঘুম হয় না। কিছুতেই ঘুম আসছে না। এদিকে চোখ জ্বলে যাচ্ছে, মাথা ব্যথা করছে। বাড়িতে থাকলে খুব সকাল সকাল ঘুমিয়ে যাই। আশপাশে শব্দ বা লাইট থাকে না। একবার ঘড়ির কাঁটার শব্দে ঘুম না আসায় ঘড়ির ব্যাটারি খুলে রেখে ঘুমিয়েছিলাম। ঘড়ির শব্দ মাথায় আসায় সময় দেখার ইচ্ছাতে চোখ খুলি। রাত ১.৩০ মিনিট। ওরা পড়ছে, কেউ লিখছে, কেউ আবার ফোন দেখছে! জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। কোথাও সবুজ নেই। ইট পাথর, ধুলাবালু আর গাড়ির হর্ন। ফ্লাইওভারের নিচে স্তূপ হয়ে থাকা কিছু শিশুকিশোর ও মহিলার দিকে চোখ যায়। একজন কিশোরের কথা বলি, যার হাতে পলিথিনে কিছু একটা। যেটি বারবার মুখে নিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে, নিশ্বাস ছাড়ছে। নিউজে দেখেছিলাম এসবকে ড্রাগ বলে থাকে। অবাক হই, কিশোরের কোলে একটি শিশু, নিজের মুখের পলিথিন শিশুটির মুখেও দিচ্ছে। বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠে! আহারে জীবন! জীবনের কোলে জীবন অথচ সেই জীবন মৃত্যু নিয়ে খেলছে। কেউ নেই রুখবার!

মহিলাগুলো এদিক–ওদিক পুরুষদের সঙ্গে আড়াল হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে বাকি থাকল না আমার আর!
কাপড় বিক্রি করা সেই ভ্যানটি রাস্তার একপাশ দিয়ে চলে যেতে থাকে। ভ্যানের মধ্যে থাকা সেই নেভি ব্লু শার্ট, প্রেমিকের মুখ আর পকেটে থাকা নোটটা চেতনায় জ্বলন্ত সিগারেটের মতো ধোঁয়া ছড়াতে থাকে!

বন্ধু, সিরাজগঞ্জ বন্ধুসভা